উজানে বন উজাড়, ভাটিতে দখল-দূষণ: দুই দিক থেকেই মরছে হাওর
প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ
প্রকাশঃ ২১ জুলাই, ২০২৬ ৮:৫৮ অপরাহ্ন
সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জি অঞ্চলে অব্যাহত বন উজাড়, পাহাড় কাটা ও খনিজ উত্তোলনের ক্ষতিকর প্রভাব গিয়ে পড়ছে সিলেট ও সুনামগঞ্জসহ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরে। উজানের এই পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের ফলে নদীতে জমছে অস্বাভাবিক মাত্রায় পলি, যার প্রভাবে ভাটি অঞ্চলের নদ-নদী দ্রুতগতিতে হারাচ্ছে নাব্যতা। এর ফলে একদিকে যেমন বাড়ছে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা, অন্যদিকে তেমনি বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে হাওরের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য।
শুধু উজানের সংকটই নয় একই সঙ্গে ভাটি অঞ্চলেও চলছে বিপর্যয়ের আরেক ধারা। অপরিকল্পিত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ, অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন এবং নদী-খাল দখলের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উজান আর ভাটির এই দ্বিমুখী চাপে ধীরে ধীরে প্রাণহীন হয়ে পড়ছে হাওরাঞ্চলের নদ-নদী ও খাল-বিল।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও হাওর নিয়ে কাজ করা সংস্থাদের তথ্যমতে, এক সময় এই অঞ্চলে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রবহমান ছিল প্রায় ৩৫৪টি নদী। কিন্তু পলি জমা, দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের আগ্রাসনে এখন এর মধ্যে প্রায় ৩০০টি নদীই হারিয়েছে তাদের স্বাভাবিক নাব্যতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন সংকট সীমান্ত থেকে নেমে আসা ২২টি আন্তঃসীমান্ত নদীর বিভিন্ন স্থানে জেগে ওঠা চর, যা পানিপ্রবাহের পথ আরও সংকুচিত করে তুলছে।
প্রাণ-প্রকৃতি গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, মেঘালয়ে বন উজাড়, খনিজ উত্তোলন ও পাহাড় কেটে ফেলার মতো কর্মকাণ্ড নদীতে অতিরিক্ত পলি জমার অন্যতম কারণ। তিনি জানান, শুধু উজানের এই সংকটই নয়, ভাটিতেও অপরিকল্পিত সড়ক-বাঁধ নির্মাণ, অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন ও নদী-খাল দখলের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উজান-ভাটির এই দ্বিমুখী চাপেই ধীরে ধীরে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ছে হাওরাঞ্চলের নদ-নদী ও খাল-বিল।
পাভেল পার্থ আরও জানান, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে হাওরের জলজ প্রাণীজগতে। নানিদ, লোচ, মহাশোল, পিপলিশোল, তারাবাইন, রানী ও বাঘাইড়সহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছ তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারানোর মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে হিজল-করচের জলাবন এবং গভীর পানিতে জন্মানো দেশীয় ধানের জাতও। নদী ও খাল ভরাটের এই প্রক্রিয়া হাওরের সামগ্রিক প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকেই মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে।
হাওরের জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণারত কল্লোল তালুকদার চপল বলেন, নদ-নদী ও খাল ভরাটের ফলে শুধু মাছ বা জলাবনই নয়, হাওরের মাটির উর্বরতা ও প্রতিবেশও ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে। পানিপ্রবাহে বিঘ্নের প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদনেও বলে জানান তিনি। তিনি আশঙ্কা করে বলেন, চলমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আগামী দিনে এই সংকট আরও প্রকট রূপ নিতে পারে।
অন্যদিকে উজানে ভারী বৃষ্টি হলেই সীমান্তবর্তী এলাকায় পাহাড়ি ঢলের প্রভাব প্রত্যক্ষভাবে দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি এমনই এক ঢলে তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রাম ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। প্রবল স্রোতের তোড়ে ভেঙে পড়ে অনেক বসতঘর ও দোকানপাট। পাশাপাশি ঢলের পানির সঙ্গে ভেসে আসা বালুতে ভরাট হয়ে গেছে সীমান্তসংলগ্ন বিস্তীর্ণ ফসলি জমি।
স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী, এই ঢলে প্রায় দেড়শ একর ফসলি জমি, ২৫ থেকে ৩০টি বসতবাড়ি এবং এলাকার একটি মসজিদ, মাদ্রাসা ও স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলার বড়ছড়া এলাকার বাসিন্দা কৃপেশ চক্রবর্তী বলেন, পাহাড়ি ঢল এসে বড়ছড়া খাল ভরাট করে দিয়েছে। কৃষিও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন বছর আগে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৪৩টি নদীর ৯২৫ কিলোমিটার অংশ খননের একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ‘হাওর এলাকায় আগাম বন্যা প্রতিরোধ ও নিষ্কাশন প্রকল্প’-এর আওতায় রক্তি, বৌলাই, যাদুকাটা, পুরান সুরমা, চামতি ও নলজুরএই ছয়টি নদী খননের জন্য ২০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও তাতে প্রত্যাশিত ফল মেলেনি।
হাওর এরিয়া আপলিফটমেন্ট সোসাইটির (হাউস) নির্বাহী পরিচালক সালেহিন চৌধুরী শুভ বলেন, শুধু নদী নয়, হাওরের সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলোও পরিকল্পিতভাবে পুনঃখনন করতে হবে। অন্যথায় বন্যা ও জলাবদ্ধতা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
সুনামগঞ্জ, সিলেট, হাওর, পরিবেশ, নদী