জকিগঞ্জে ৫ কোটি টাকার আধুনিক ফ্লাড সেন্টারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন
দৈনন্দিন
প্রকাশঃ ২১ জুলাই, ২০২৬ ৫:১৭ অপরাহ্ন
বর্ষা এলেই সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের অধিকাংশ সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায়। তখন গ্রাম থেকে বিদ্যালয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ হয়ে ওঠে নৌকা। কিন্তু নৌকার অভাবে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করে, আবার অনেকের উপস্থিতি কমে যায়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার ১৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য নৌকা দেওয়া হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির আওতায় সুনামগঞ্জ-১ (জামালগঞ্জ-ধর্মপাশা-মধ্যনগর-তাহিরপুর) আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের বরাদ্দ থেকে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে এসব নৌকা তৈরি করা হয়। পরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও প্রতিনিধিদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে নৌকাগুলো তুলে দেওয়া হয়।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের জীবন-জীবিকা প্রকৃতিনির্ভর। বছরের প্রায় ছয় মাস বর্ষাকালে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে থাকে। কৃষি ও মৎস্যনির্ভর এ জনপদের মানুষের দৈনন্দিন চলাচলও তখন নৌকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। শিক্ষা ব্যবস্থাও এর বাইরে নয়। অনেক বিদ্যালয়ে যেতে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন নৌকায় নদী বা হাওর পাড়ি দিতে হয়।
মধ্যনগর উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ৮৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৪৫টিতে বর্ষা মৌসুমে শিক্ষার্থীদের নৌকায় যাতায়াত করতে হয়। প্রতিকূল আবহাওয়া ও নিরাপদ নৌযানের অভাবে অনেক শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে উপস্থিতি কমে যায়।
এ বাস্তবতা থেকে শালীয়ানী, জামালপুর, কামাউড়া, খালিশাকান্দা, গলইখালী, ইটাউরি, দুগনই, বলরামপুর, মাছুয়াকান্দা, দৌলতপুর, দোয়াদুর রহমান, আলীপুর, সাতুর, বীরসিংহপাড়া, চাপাইতি এবং আটাইশা মাছিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নৌকা দেওয়া হয়েছে।
মধ্যনগরের বাসিন্দা মানিক মিয়া বলেন, বর্ষা মৌসুমে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। নৌকা দেওয়ার ফলে এখন উপস্থিতি বাড়বে বলে তিনি আশা করছেন।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বর্ষাকালে উপজেলার প্রায় অর্ধেক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নৌকায় চলাচল করতে হয়। এর আগে একটি বিদ্যালয়ে নৌকা দেওয়া হয়েছিল। এবার আরও ১৬টি বিদ্যালয়ে নৌকা দেওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হারও বাড়বে।
খালিশাকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাশিদ আলম বলেন, নৌকা পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা এখন অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে বিদ্যালয়ে আসতে পারবে। এতে অভিভাবকদের উদ্বেগও কমবে।
উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক রমা রঞ্জন সরকার বলেন, বর্ষার সময় বিদ্যালয়ে এসে অনেক সময় দেখা যায় শিক্ষার্থীরা আসতে পারেনি। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের মধ্যেই হতাশা তৈরি হয়। নতুন এই উদ্যোগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক দুই পক্ষই আনন্দিত।
সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, তিনি নিজেও হাওরাঞ্চলের মানুষ। তাই বর্ষাকালে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির বিষয়টি তার জানা। নৌকার অভাবে যাতে কোনো শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যেতে না পারার কারণে পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে না পড়ে, সে লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, যেসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নৌকায় পারাপার ছাড়া বিকল্প নেই, পর্যায়ক্রমে সেসব বিদ্যালয়েও নৌকার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি হাওরাঞ্চলের শিক্ষা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, নৌকাগুলো শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে এটি বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ঝরে পড়ার হার কমাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
হাওরাঞ্চলে বর্ষা মানেই বিচ্ছিন্নতা। সেখানে বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা শুধু একটি পরিবহন সুবিধা নয়, বরং শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। মধ্যনগরের এই উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে হাওরাঞ্চলের আরও অনেক বিদ্যালয়ে একই ধরনের ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষকেরা।
সুনামগঞ্জ, মধ্যনগর, হাওরাঞ্চল, হাওরের শিক্ষা, স্কুল নৌকা, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিক্ষার্থীদের নৌকা, সুনামগঞ্জ-১ আসন, কামরুজ্জামান কামরুল, হাওরের শিক্ষার্থী, বর্ষাকাল, বিদ্যালয়ে যাতায়াত