১৭ জুলাই ২০২৬

অনিয়ম-দুর্নীতি

সিলেট স্টেশন ক্লাবের নেতৃত্ব নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব, পরিচালনা পর্ষদের ‘বৈধতা’ নিয়ে বিতর্ক

বিশেষ প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ১৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:১৫ পূর্বাহ্ন


সিলেটের উচ্চবিত্ত আর উচ্চ পদস্থ ব্যক্তিদের চিত্তবিনোদনের সংগঠন ‘সিলেট স্টেশন ক্লাব’। একসময় উচ্চ পদস্থ ইংরেজদের ক্লাব ছিল এটি। ১৯৪৭ সালে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলে ক্লাবের মালিকানায়ও বদল ঘটে। নেতৃত্ব আসে বাঙালির হাতে। সে ধারাবাহিকতা আজও চলছে। 

ঔপনিবেশিক আমলে প্রতিষ্ঠিত সিলেটের অভিজাত শ্রেণির সংগঠন সিলেট স্টেশন ক্লাবে নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক চলছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সভাপতি ও সহ-সভাপতির পদত্যাগের পর ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হওয়ার কথা থাকলেও সেই বিধান অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র মতবিরোধ। 

এক পক্ষ বর্তমান সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণকে বৈধ দাবি করলেও অন্য পক্ষ বলছে এটা গঠনতন্ত্র পরিপন্থি। এ অবস্থায় প্রশ্ন ওঠেছে, ক্লাবের উপদেষ্টা পরিষদের ভূমিকা নিয়েও। সংকটকালীন সময়ে দায়িত্ব পালন না করার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এই পরিস্থিতিতে সিলেট স্টেশন ক্লাবের ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠেছে। এ নিয়ে একটি পক্ষ আদালতে মামলা দায়েরও করেছে।

ক্লাব সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর সিলেট স্টেশন ক্লাবের ২০২৬ সালের পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচন ও বার্ষিক সাধারণ সভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে সভাপতি পদে সমান সংখ্যক ভোট পান অ্যাডভোকেট শাহ মো. মোসাহিদ আলী ও শাহরুখ আহমদ শাক্কু। ক্লাবের গঠনতন্ত্রের ৭১ (৫) ধারা অনুযায়ী যদি দুই বা ততোধিক প্রার্থী সমান সংখ্যক ভোট পেলে উৎক্ষেপণের মাধ্যমে অর্থাৎ লটারির মাধ্যমে ফল চূড়ান্ত করার কথা। 

কিন্তু গঠনতন্ত্র না মেনে প্রথমবারের মতো এক বছরের জন্য দুইজন সভাপতি নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। অবশ্য এদিন ক্লাবের বার্ষিক সাধারণ সভায় সমান সংখ্যক ভোট পাওয়ায় সভাপতি হিসেবে দু্ইজনকেই দায়িত্ব প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। 

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মেয়াদের প্রথম ছয়মাস সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন অ্যাডভোকেট শাহ মো. মোসাহিদ আলী এবং পরের ছয়মাস দায়িত্ব পালন করবেন শাহরুখ আহমদ শাক্কু। এরই আলোকে ২০২৫ সালে ৩০ ডিসেম্বর প্রথম সভাপতি হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করেন শাহ মো. মোসাহিদ আলী। 

ক্লাবের একটি সূত্র জানায়, নতুন কার্যকরি কমিটি দায়িত্বগ্রহণের পর থেকে মূলত অভ্যন্তরীন কোন্দল দেখা দেয়। ক্লাবের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও অন্যান্য কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে থাকে। একই সঙ্গে কার্যকরি কমিটিতে প্রকাশ্যে দুটি পক্ষের সৃষ্টি হয় এবং তাদের মধ্যে মতবিরোধ আরও প্রকট আকার ধারণ করে।  

এই পরিস্থিতিতে ক্লাবের পরিচালক (অর্থ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) এ এস সিরাজুল হক চৌধুরীর অসহযোগীতা ও পরিচালনা পর্ষদের অন্যান্য পরিচালকদের অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ তুলে গত ১০ মার্চ সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন ক্লাবের সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহ মো. মোসাহিদ আলী। ক্লাবের উপদেষ্টা পরিষদের আহ্বায়ক সামুন মাহমুদ খান তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন। 

অন্যদিকে, এর আগের দিন ৯ মার্চ পরিচালনা পর্ষদের অসহযোগীতা ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে কার্যকরি কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন সহ-সভাপতি ফারুক আহমদ। তার পদত্যাগপত্রটি গ্রহণ করেন সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহ মো. মোসাহিদ আলী।

ক্লাবের গঠনতন্ত্রের ৩৫ (১) ধারা অনুযায়ী সভাপতি ও সহ সভাপতি উভয়ের পদ একই সঙ্গে শূন্য হলে পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত হয়ে যায়। একই সঙ্গে এই পরিস্থিতিতে গঠনতন্ত্রের ৫৫ ও ৫৬ ধারা অনুযায়ী উপদেষ্টা পরিষদ ক্লাবের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের জন্য বার্ষিক সাধারণ সভা অথবা অতিরিক্ত সাধারণ সভা আহ্বান করেন। 

কিন্তু ক্লাবের একাধিক সূত্র বলছে, নেতৃত্ব সংকটের এই পরিস্থিতিতে নিরব ভূমিকা পালন করেন ক্লাবের উপদেষ্টা পরিষদের আহ্বায়ক সামুন মাহমুদ খান, সদস্য নাসিম হোসেইন ও আবুল কাহের শামীম। 

একটি পক্ষের অভিযোগ, এ পরিস্থিতিতে উপদেষ্টা পরিষদের প্রধান সামুন মাহমুদ খান কিছুটা সহযোগীতা করলেও একেবারে নিরব ছিলেন সদস্য নাসিম হোসেইন ও আবুল কাহের শামীম। এতে করে ক্লাবে দেখা দেয় এক ধরণের অচলাবস্থা। 

এদিকে, উপদেষ্টা পরিষদের নিরবতার মধ্যেই গত ১ জুলাই উপদেষ্টা পরিষদের কাছ থেকে সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন শাহরুখ আহমদ শাক্কু।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সভাপতি ও সহ সভাপতি উভয়ের পদ একই সঙ্গে শূন্য হওয়ায় পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত হওয়ার কথা। কিন্তু উপদেষ্টা পরিষদ বলছে, সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক পরবর্তী ছয়মাসের জন্য সভাপতির দায়িত্ব পালন করার কথা শাহরুখ আহমদ শাক্কুর। সে হিসেবে তিনি ১ জুলাই থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এ বিষয়ে আইনজীবিদের পরামর্শও নিয়েছেন বলে জানিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। 

পদত্যাগকারী ক্লাবের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহ মোসাহিদ আলী বলেন, ‘নির্বাচনে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী সভাপতি প্রার্থীর ভোট সমান হয়ে যায়। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভোট সমান হলে লটারির (উৎক্ষেপন) মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা থাকলেও, তখন সমঝোতা করে ছয় মাস করে সভাপতি পদ চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা আসলে গঠনতন্ত্রে স্বীকৃত নয়।’

তিনি বলেন, ‘দায়িত্বগ্রহণের পর ক্লাবের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করলেও পরিচালক সিরাজুল হক চৌধুরীর অসহযোগিতার কারণে আর্থিক লেনদেনে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। ওই সদস্য ফাইলে বা বিলে সই না করায় বিভিন্ন বিল আটকে যায়।’ এই পরিস্থিতিতে কারও সহযোগীতা পাননি বলেও জানান তিনি। 
 
শাহ মোসাহিদ আলী বলেন, ‘পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা এবং পরিচালনা পর্ষদের অন্যান্য সদস্যদের অসহযোগীতার কারণে বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করতে হয়েছে। একইভাবে পরিচালনা পর্ষদের সভায় সহ-সভাপতির সাথে একজন জুনিয়র সদস্য খারাপ ব্যবহার করায় সহ-সভাপতিও পদত্যাগ করেন।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘গঠনতন্ত্রের ৩৫ ধারা অনুযায়ী সভাপতি ও সহ-সভাপতি একসাথে পদত্যাগ করলে কমিটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এমতাবস্থায় গঠনতন্ত্রের ৫৫ ও ৫৬ ধারা অনুযায়ী উপদেষ্টা মন্ডলীর দায়িত্ব গ্রহণ করে দুই মাসের মধ্যে নির্বাচন দেওয়ার কথা থাকলেও তারা তা করেননি। পরিবর্তিতে শাহরুখ আহমদ শাক্কু আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব হস্তান্তর ছাড়াই অবৈধভাবে সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যা সম্পূর্ণ বেআইনি। এই অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হয়েছে।’

ক্লাবের সাবেক একজন সভাপতি নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিলেট ভয়েসকে বলেন, ‘গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, এটি একটি প্রেসিডেন্ট শাসিত ব্যবস্থার মতো। যদি প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস-প্রেসিডেন্ট উভয়েই পদত্যাগ করেন, তবে কার্যকরি কমিটি বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষমতা উপদেষ্টা পরিষদের কাছে চলে যায়।’

তিনি বলেন, ‘সভাপতি পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর উপদেষ্টা পরিষদের আহ্বায়ক তা গ্রহণ করলেও তারা কোনো সাধারণ সভা ডাকেননি। বর্তমানে যিনি দায়িত্ব নিয়েছেন, গঠনতন্ত্রে এমন কোনো ধারা নেই, যার মাধ্যমে তিনি সরাসরি দায়িত্ব নিতে পারেন, ফলে এই নেতৃত্ব বৈধ নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এর আগে ১/১১-এর সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তবে তখন উপদেষ্টা পরিষদ দায়িত্ব নিয়ে এজিএমের মাধ্যমে পরিস্থতি স্বাভাবিক করেন।’

তিনি বলেন, ‘সিলেট স্টেশন ক্লাব কোম্পানি আইনের অধীনে নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এ ক্ষেত্রে আইনি জটিলতার ঝুঁকি রয়েছে। বর্তমান কমিটি গঠনতন্ত্র অনুযায়ী না হওয়ায় আর্থিক লেনদেন নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠতে পারে। একই সঙ্গে বিষয়টি উচ্চআদালত বা দুদক পর্যন্তও গড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।’

সাবেক এই সভাপতি মনে করেন, ‘সিলেট স্টেশন ক্লাবের এই শূন্যতা নিরসনে একটি জরুরি সাধারণ সভা ডেকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল, যা বর্তমানে করা হয়নি।’

এ বিষয়ে ক্লাবের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নাসিম হোসেইন বলেন, ‘বর্তমান সভাপতি আনুষ্ঠানিকভাবে এবং নিয়ম অনুযায়ী সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এজিএমের সিদ্ধান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি ১ জুলাই থেকে তার কার্যক্রম শুরু করার কথা। সেই হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।’

নাসিম হোসেইন বলেন, ‘শাহ মোসাহিদ আলী পদত্যাগের ক্ষেত্রে ক্লাবের গঠনতন্ত্র বা নিয়ম সঠিকভাবে অনুসরণ করেননি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সভাপতি পদত্যাগ করতে চাইলে তাকে সহ-সভাপতি বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দিতে হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সহ-সভাপতিও একই সময়ে পদত্যাগ করেছিলেন। এই পরিস্থিতিতে নিয়ম অনুযায়ী একজন নতুন সহ-সভাপতি নিয়োগ করে তার কাছে পদত্যাগপত্র দেওয়া যেতো। অথবা একটি এজিএম ডেকে পরিস্থিতির সমাধান করা যেতো।’

নাসিম বলেন, ‘যেহেতু তারা প্রত্যক্ষ ভোটে এবং যৌথভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাই একজনের পদত্যাগে কমিটি ভেঙে যাওয়ার বিষয়ে কিছু বিতর্ক থাকতে পারে। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উপদেষ্টা পরিষদ একটি বৈঠক করে বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতের একজন ব্যারিস্টারের কাছ থেকে আইনি পরামর্শ গ্রহণ করেছে। ব্যারিস্টারের পরামর্শ হচ্ছে-এক্ষেত্রে কোনো আইনী জটিলতা নেই।’

এ বিষয়ে সিলেট স্টেশন ক্লাবের বর্তমান সভাপতি শাহরুখ আহমদ শাক্কুর বক্তব্য নিতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।


শেয়ার করুনঃ

অনিয়ম-দুর্নীতি থেকে আরো পড়ুন

সিলেট স্টেশন ক্লাব, সিলেট, নেতৃত্ব নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব, পরিচালনা পর্ষদ, বৈধতা নিয়ে বিতর্ক

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ