শ্রীমঙ্গলে প্রশাসনের নির্দেশে ৩ দিন পর ফের শুরু সড়ক নির্মাণকাজ
অনিয়ম-দুর্নীতি
প্রকাশঃ ২ জুলাই, ২০২৬ ১:১৬ অপরাহ্ন
রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দ্রুত, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করতে নেওয়া 'সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন' প্রকল্পের বাস্তবায়নে বড় ধরনের ধীরগতি ও কাঠামোগত দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায়।
১৬ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও প্রকল্প মেয়াদের প্রায় ৮৯ শতাংশ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ভৌত অগ্রগতি মাত্র ২১ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকার কাঁচপুর থেকে সিলেট পর্যন্ত ২০৯.৩২৮ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, সার্ভিস লেন নির্মাণ, সেতু, কালভার্ট ও ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধান কাজগুলোর মধ্যে মূল সড়কের অগ্রগতি ১১.৫০ শতাংশ, সার্ভিস লেনের ১৬.৩৩ শতাংশ, সেতুর ৩১.১৪ শতাংশ এবং কালভার্টের ৫৮.৭৯ শতাংশ বলে জানিয়েছে আইএমইডি।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভূমি অধিগ্রহণ ও অবমুক্তির হার মাত্র ৩৭.৬১ শতাংশ হওয়ায় এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস লাইন স্থানান্তরের ধীরগতির কারণে ঠিকাদাররা পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না। তিতাস গ্যাস পাইপলাইন স্থানান্তরের অগ্রগতি মাত্র ০.৭৮ শতাংশ এবং জালালাবাদ গ্যাস লাইনের অগ্রগতি ১৫.৬৮ শতাংশ, যা প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট শাখায় জনবল সংকট, কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বদলি, জমির মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধ এবং ক্ষতিপূরণ নিয়ে আপত্তির কারণে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া বারবার বিলম্বিত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন ও মামলা-মোকদ্দমার কারণে চূড়ান্ত জমি হস্তান্তর দীর্ঘায়িত হচ্ছে, যা ঠিকাদারদের কাজ শুরু বা সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করছে।
অন্যদিকে কিছু লটে পর্যাপ্ত সাইট হস্তান্তর হওয়া সত্ত্বেও কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। এর পেছনে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের আর্থিক সক্ষমতার ঘাটতি, সাইট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং কার্যকর পরিকল্পনার অভাব রয়েছে বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে প্রকল্প বিলম্বের আরেকটি বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে নকশা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা। সাত বছর আগের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সঙ্গে বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতির অসামঞ্জস্যের কারণে নতুন ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাস সংযোজন, সড়কের অ্যালাইনমেন্ট পরিবর্তন এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার পুনঃনকশা করতে হচ্ছে। এসব পরিবর্তনের বহুমাত্রিক অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট অংশে নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
মহাসড়কটিকে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপদ করিডোরে রূপান্তরের লক্ষ্যে নতুন করে ব্যাপক 'সেফটি ইন্টারভেনশন' যুক্ত করায়ও নির্মাণকাজে ধীরগতি দেখা দিয়েছে বলে সমীক্ষায় বলা হয়েছে। প্রাথমিক নকশায় বাদ পড়া ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাস পুনরায় সংযোজনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বর্তমানে ৯টি ফ্লাইওভার, ৪২টি লাইট ভেহিকুলার আন্ডারপাস, ২২টি ভেহিকুলার আন্ডারপাস এবং ৭৭টি ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা যুক্ত হয়েছে।
প্রকল্পের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে দুর্বল ভূগর্ভস্থ মাটি। বিশেষ করে কিছু অংশে মাটির ভারবহন ক্ষমতা অত্যন্ত কম হওয়ায় ব্যাপক গ্রাউন্ড ইমপ্রুভমেন্ট, সাবগ্রেড পরিবর্তন এবং নকশা সংশোধনের প্রয়োজন হচ্ছে, যা অতিরিক্ত কারিগরি প্রক্রিয়া ও অনুমোদনে সময় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের ১৩টি লটের দরপত্র প্রক্রিয়া বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দরপত্র আহ্বান থেকে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর পর্যন্ত প্রতিটি লটেই অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় লেগেছে ১১ থেকে ১৯ মাস। সমীক্ষা অনুযায়ী, কারিগরি দরপত্র মূল্যায়ন বা টেকনিক্যাল বিড ইভালুয়েশন রিপোর্ট (টিবিইআর) অনুমোদনে ২১ দিন থেকে সর্বোচ্চ ১১৩ দিন এবং আর্থিক মূল্যায়ন বা ফিন্যান্সিয়াল বিড ইভালুয়েশন রিপোর্ট (এফবিইআর) অনুমোদনে ১০ দিন থেকে ৭৬ দিন পর্যন্ত সময় লেগেছে। ফলে শুধু এই দুই ধাপেই কিছু লটে তিন থেকে সাড়ে ছয় মাস পর্যন্ত সময় অতিবাহিত হয়েছে।
এই বিলম্বের কারণে দরপত্রের বৈধতার মেয়াদও একাধিকবার বাড়াতে হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বিড ভ্যালিডিটি ২৪০ থেকে ৩৪৫ দিন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপ্রস্তাবের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
প্রতিকূল আবহাওয়া ও তীব্র যানজটও প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে আইএমইডি। বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার কারণে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে হয়। একই সঙ্গে দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই মহাসড়কে যানজটের কারণে নির্মাণসামগ্রী পরিবহন ও যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সঙ্গে বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতির অসামঞ্জস্য বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করেছে। মাঠ পর্যায়ে নতুন করে উদ্ভূত কারিগরি সমস্যার সমাধানে অতিরিক্ত সমীক্ষা ও নকশা সংশোধন করতে হচ্ছে, যা সামগ্রিক বাস্তবায়ন সময় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান করা না গেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে এবং এর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুফলও বিলম্বিত হবে।
ঢাকা-সিলেট করিডোর, সাসেক প্রকল্প, সড়ক উন্নয়ন, ধীরগতি, ভূমি অধিগ্রহণ, এডিবির অর্থায়ন