০১ জুন ২০২৬

অপরাধ-বিচার / অপরাধ

এআই ট্রাফিক মামলার নামে সিলেটে প্রতারণার ফাঁদ

গাড়ি ঢাকার গ্যারেজে, মালিক সিলেটে, তবুও এলো ট্রাফিক মামলার বার্তা

দেবকল্যাণ ধর বাপন

প্রকাশঃ ১ জুন, ২০২৬ ২:৩২ অপরাহ্ন


সিলেটে ঈদের ছুটি কাটাতে এসে অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন ঢাকার একটি আইটি কোম্পানির কর্ণধার দেবজ্যোতি দে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এক সপ্তাহের জন্য সিলেটে বেড়াতে এসেছেন তিনি। ব্যস্ত নগরজীবন থেকে একটু স্বস্তি পেতে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে উঠেছেন নগরের শাহজালাল উপশহরে এক আত্মীয়ের বাসায়।


সিলেটে আসের আগে ঢাকায় নিজের ব্যবহৃত গাড়িটি তিনি গ্যারেজেই রেখে এসেছিলেন। কিন্তু ছুটির সেই স্বস্তির মধ্যেই গত শনিবার দুপুরে তার মুঠোফোনে আসে একটি খুদে বার্তা। সেখানে লেখা—‘ইন্টেলিজেন্ট ভিডিও নজরদারি ব্যবস্থায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে’ তার গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জরিমানা পরিশোধ না করলে যানবাহন জব্দ, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং চালকের তথ্য জাতীয় ডেটাবেজে যুক্ত করার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।


বার্তাটি পড়ে প্রথমে কিছুটা বিভ্রান্ত, পরে রীতিমতো হতভম্ব হয়ে যান দেবজ্যোতি। কারণ, তাকে পাঠানো বার্তায় যেদিনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেদিন তার গাড়িটি ঢাকার গ্যারেজেই ছিল। পরিবারের সঙ্গে তিনি তখন সিলেটে অবস্থান করছিলেন। অথচ খুদে বার্তায় দাবি করা হয়েছে, ঢাকায় এআই ক্যামেরার নজরদারিতে তার গাড়ি ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করেছে।


এ ব্যাপারে দেবজ্যোতি বলেন, প্রথমে বিষয়টিকে সত্যি বলেই মনে হয়েছিল। কারণ, কয়েকদিন ধরেই সংবাদমাধ্যমে ঢাকায় এআই ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক মামলা কার্যক্রম চালুর খবর দেখছিলাম। তাই হঠাৎ মেসেজ পেয়ে ভয় পেয়ে যাই। পরে ওয়েবসাইটে ঢুকে দেখি, গাড়ির নম্বর দিলেই জরিমানার তথ্য দেখাচ্ছে। তখনই সন্দেহ হয়। পরে বিআরটিএতে যোগাযোগ করে বুঝতে পারি এটি প্রতারণা।


শুধু দেবজ্যোতি নন, সিলেটে সম্প্রতি অনেক গাড়ির মালিকের মোবাইলে এমন ভুয়া মামলা ও জরিমানার খুদে বার্তা পৌঁছেছে। প্রতারকেরা নিজেদের ‘বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ’ বা বিআরটিএ পরিচয় দিয়ে এসব বার্তা পাঠাচ্ছে। সেখানে বলা হচ্ছে, ‘ইন্টেলিজেন্ট ভিডিও নজরদারি ব্যবস্থায়’ গাড়ির বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এরপর একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে জরিমানা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।


অনেক ক্ষেত্রে ‘ইলেকট্রনিক এভিডেন্স ইমেজ’ এবং ‘প্রশাসনিক জরিমানা বিজ্ঞপ্তি’ দেখার কথাও উল্লেখ করা হচ্ছে। এমন ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে বার্তাগুলো সরকারি ও বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়।

গ্রাহকের মুঠোফোনে পাঠানো বার্তার স্ক্রিনশট

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান সিলেট নগরের ডাকবাংলো রোড এলাকার বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা গৌতম চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ঢাকায় এআই ক্যামেরা চালুর খবর দেখেছিলাম। তাই মেসেজটি দেখে প্রথমে ভয় পেয়ে যাই। মনে হচ্ছিল হয়তো সত্যিই কোনো মামলা হয়েছে। কিন্তু পরে খেয়াল করলাম, যে ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া হয়েছে, সেটি সরকারি কোনো ওয়েবসাইটের মতো না।


তিনি আরও বলেন, ওয়েবসাইটে ঢুকে গাড়ির নম্বর দিলে জরিমানার তথ্য দেখাচ্ছিল। কিন্তু পুরো বিষয়টিই ছিল অস্বাভাবিক। পরে পরিচিত একজনের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি এটি ভুয়া ওয়েবসাইট।


বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) আদলে নকল ওয়েব সাইট তৈরি করে বিভিন্ন নম্বর থেকে মামলা ও জরিমানার মেসেজ দেওয়া হচ্ছে পরিবহন মালিকদের। তাদের মধ্যে কয়েকজন পরিবহন মালিকের মোবাইলে আসা জরিমানা সংক্রান্ত মেসেজের স্ক্রিনশট এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।


অন্তত দুইজন গ্রাহকের মোবাইলে আসা মেসেজের প্রেরকের নম্বর (+639286296306 ও +639496589185)। দুটি নম্বরের আন্তর্জাতিক কলিং কোড যাচাই করে দেখা যায় (+৬৩) কোডটি ফিলিপাইনের। দুটি মেসেজের বার্তা ভিন্ন ভিন্ন।

গ্রাহকের মুঠোফোনে পাঠানো বার্তার স্ক্রিনশট

এছাড়া অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব বার্তায় যেসব ওয়েবসাইটের লিংক ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে বিআরটিএর প্রকৃত ওয়েবসাইটের কোনো মিল নেই। সরকারি ওয়েবসাইট সাধারণত ‘gov.bd’ ডোমেইনে নিবন্ধিত থাকে। অথচ প্রতারকদের ব্যবহৃত ওয়েবসাইটগুলোতে অপরিচিত ও সন্দেহজনক ডোমেইন ব্যবহার করা হচ্ছে।


এ ব্যাপারে প্রযুক্তি বিশ্লেষক খায়রুল আলম বলেন, এ ধরনের প্রতারণার বড় একটি লক্ষণ হচ্ছে নম্বর। বিআরটিএ সাধারণত নিজস্ব সরকারি নম্বর বা শর্টকোড ব্যবহার করে। কিন্তু যেসব নম্বর থেকে মেসেজ পাঠানো হচ্ছে, সেগুলোর আন্তর্জাতিক ডায়াল কোড বিদেশি। এটিই স্পষ্ট করে দেয় এটি প্রতারণার অংশ।


তিনি বলেন, বর্তমানে মানুষ এআই প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহী, আবার কিছুটা আতঙ্কিতও। প্রতারকেরা সেই মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টিকেই কাজে লাগাচ্ছে। তারা এমনভাবে মেসেজ তৈরি করছে, যাতে মানুষ দ্রুত ভয় পেয়ে লিংকে প্রবেশ করে বা টাকা পরিশোধ করে ফেলে।


খায়রুল আলম পিন্টুর ভাষ্য মতে, শুধু টাকা হাতিয়ে নেওয়াই নয়, এসব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য, মোবাইল নম্বর, ব্যাংকিং তথ্য কিংবা কার্ডের তথ্যও সংগ্রহের চেষ্টা হতে পারে। ফলে কোনো সন্দেহজনক লিংকে প্রবেশ করাও ঝুঁকিপূর্ণ।


এ বিষয়ে বিআরটিএর বক্তব্য জানার জন্য সিলেট বিভাগীয় পরিচালক মো. মাসুদ আলম ও উপপরিচালক আব্দুর রশিদের ব্যবহৃত সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাদের উভয়ের নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়। একই বিষয়ে মতামত জানতে বিআরটিএ সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের মোটরযান পরিদর্শক সফীকুল ইসলাম রাসেলকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল গ্রহণ করেননি। ফলে এ বিষয়ে বিআরটিএর কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।


সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) সুদীপ্ত রায় বলেন, ঢাকার বাইরে এখনো এআইভিত্তিক ট্রাফিক মামলা কার্যক্রম চালু হয়নি। ফলে সিলেটে এ ধরনের মামলার প্রশ্নই আসে না। প্রতারকেরা মানুষের অজ্ঞতা ও আতঙ্ককে কাজে লাগিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।


তিনি বলেন, কেউ যেন এ ধরনের বার্তায় বিভ্রান্ত না হন, সে বিষয়ে আমরা সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি। বিশেষ করে কোনো লিংকে ক্লিক করা বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর আগে অবশ্যই যাচাই করতে হবে।


আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তি নির্ভর প্রতারণার ধরন বদলেছে। আগে যেখানে লটারির পুরস্কার, চাকরি কিংবা বিকাশ অ্যাকাউন্ট বন্ধের ভয় দেখিয়ে প্রতারণা করা হতো, এখন সেখানে যুক্ত হয়েছে ‘এআই নজরদারি’, ‘ডিজিটাল মামলা’ কিংবা ‘স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম’-এর মতো আধুনিক শব্দ।


তিনি আরও জানান, এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সড়ক ও জনপদ (বিআরটিএ) কর্তৃক একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে চালকদের বিভ্রান্ত না হয়ে সতর্ক হওয়ার কথা বলা হয়েছে।


এদিকে তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি যত আধুনিক হচ্ছে, প্রতারণার কৌশলও তত বদলাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে। সরকারি কোনো বার্তা পেলে প্রথমেই প্রেরকের নম্বর, ওয়েবসাইটের ঠিকানা এবং তথ্যের সত্যতা যাচাই করা জরুরি।


শেয়ার করুনঃ

অপরাধ-বিচার থেকে আরো পড়ুন

বিআরটিএ ভুয়া মেসেজ, ভুয়া ট্রাফিক মামলা, AI ট্রাফিক মামলা, প্রতারণা, সিলেট ট্রাফিক প্রতারণা, ভুয়া জরিমানার মেসেজ

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ