সিলেট শিক্ষাবোর্ড
এসএসসির ইংরেজির খাতা দেখছেন অন্য বিষয়ের শিক্ষক, প্রশ্নবিদ্ধ মূল্যায়ন প্রক্রিয়া
তথ্যপ্রযুক্তি-শিক্ষা
প্রকাশঃ ১৯ মে, ২০২৬ ১০:২৪ অপরাহ্ন
ইমরান হাই সরকার। সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার বুরুঙ্গা ইকবাল আহমদ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের প্রভাষক। তিনি সিলেট শিক্ষাবোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র বিষয়ের প্রধান পরীক্ষক।
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ঝিগলী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের তথ্য ও যোগাযোগ বিষয়ের প্রভাষক সেবুল আহমদ। তিনিও এবারের এসএসসি পরীক্ষার ইংরেজি বিষয়ের খাতা মূল্যায়ন করছেন। কেবল খাতা মূল্যায়ন নয়, তিনিও এই বিষয়ে প্রধান পরীক্ষক।
ইমরান হাই সরকার ও সেবুল আহমদের মতো আরও অনেক শিক্ষক এবারের এসএসসি পরীক্ষার ইংরেজি বিষয়ের খাতা মূল্যায়ন করছেন। তাঁদের কেউ কেউ সামাজিক বিজ্ঞানেরও শিক্ষক। গত ৪ মে সিলেট শিক্ষাবোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এসএসসি ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষকের তালিকায় এরকম বেশ কয়েকজন শিক্ষক রয়েছেন, যারা মূলত অন্য বিষয়ের শিক্ষক।
বিষয়ভিত্তিক ছাড়া অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে ইংরেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতা মূল্যায়নের প্রভাব শিক্ষার্থীদের ফলাফলের পড়তে বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ও অভিভাবকরা। এতে নির্ভরযোগ্যতা ও মূল্যায়নের মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে বলেও মনে করছেন তারা।
শিক্ষাবোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের ১৯১ জন পরীক্ষকের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের মূল বিষয় ইংরেজি নয়। কেউ ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রভাষক, কেউ সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক, আবার কেউ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের শিক্ষক। তাঁদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে প্রধান পরীক্ষকের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, ইংরেজির মতো ভাষাভিত্তিক বিষয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়নে বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাকরণ, রচনাশৈলী, ভাষার ব্যবহার ও সৃজনশীল উত্তর বিশ্লেষণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষক হওয়া প্রয়োজন। অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে খাতা মূল্যায়ন করালে নম্বর প্রদানে অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক বলেন, পরীক্ষক সংকট বা প্রশাসনিক সুবিধার কারণে মাঝে মধ্যে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাব্যবস্থার জন্য নেতিবাচক বার্তা দেয়। বিশেষ করে ইংরেজির মতো বিষয়ে দক্ষতাহীন মূল্যায়ন শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা যাচাইয়ে প্রভাব ফেলতে পারে।
জাউয়া বাজার ডিগ্রী কলেজের প্রভাষক দুলাল মিয়া বলেন, ইংরেজি খাতা অন্য বিষয়ের শিক্ষকের দেখার কোন সুযোগ নেই। এমনটি করা হলে খাতা মূল্যায়ন সঠিক হবে না। শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের আইনে স্পষ্ট লিখা বিষয়ের শিক্ষকই তার বিষয় ভিত্তিক খাতা দেখতে পারেন।
তবে বিধিমালায় সুযোগ না থাকলেও নানা প্রভাব, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনেক শিক্ষক পরীক্ষক তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করে নেন বলেন তিনি। ।
পরীক্ষকের তালিকায় দুই নম্বরে রয়েছেন সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার বুরুঙ্গা ইকবাল আহমদ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের প্রভাষক ইমরান হাই জাবেদের নাম। তিনি মূলত ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের প্রভাষক। তিনি প্রধান পরীক্ষকও।
বিয়ানীবাজারের বানিগ্রাম বাহারগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক মো. তাজিম উদ্দিন। তিনিও এসএসসির ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষক। একই তালিকায় রয়েছেন সুনামগঞ্জের দিরাই উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক রোকসান আরা খাতুন। তিনি প্রধান পরীক্ষক। তার মূল বিষয় সামাজিক বিজ্ঞান। একইভাবে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কামুদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক নিরঞ্জন কৈরীও ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের খাতা মূল্যায়ন করছেন।
জানতে চাইলে বানিগ্রাম বাহারগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. তাজিম উদ্দিন বলেন, বর্তমানে তিনি বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। যোগদানের পর থেকেই সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করে আসছেন। তবে বিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান শিক্ষক নিয়োগের সময় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে ইংরেজিতে পারদর্শী প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ ছিল।
তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে যোগদানের সময় ইংরেজি বিষয়ের কোনো শিক্ষক না থাকায় শুরু থেকেই সামাজিক বিজ্ঞানের পাশাপাশি ইংরেজি বিষয়েও শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে আসছেন। দীর্ঘদিনের সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তিনি ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষক হিসেবে মনোনীত হয়েছেন।
ওসমানীনগরের বুরুঙ্গা ইকবাল আহমদ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের প্রভাষক ইমরান হাই জাবেদে বলেন, কলেজে আমি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের শিক্ষকতা করলেও মাধ্যমিকের ইংরেজি শিক্ষক না থাকায় আমিই শুরু থেকে পাঠদান করে আসছি। যার কারণে বোর্ড থেকে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শিক্ষকদের তালিকা চাওয়া হলে, সেখানে আমার নামও আসে। যার জন্য আমি ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র খাতা মূল্যায়ন সুযোগ পেয়েছি।
কামুদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিরঞ্জন কৈরী বলেন, আমি সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক হলেও পাশাপাশি ইংরেজিরও ক্লাস নিতে হয়। শিক্ষক সংকট থাকায় নিয়োগের পর থেকেই আমি ইংরেজি বিষয়ের পাঠদান করছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বোর্ড এ দায়িত্ব দিয়েছে।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ পরিমল কান্তি দে বলেন, একজন সামাজিক বিজ্ঞান বা ইসলামের ইতিহাসের শিক্ষক কীভাবে ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের উত্তরপত্র মূল্যায়ন করবেন, সেটাই বড় প্রশ্ন। এতে মূল্যায়নের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। একজন প্রকৃত শিক্ষক দিয়ে খাতা মূল্যায়ন করাতে হবে। প্রতি বছর ফল বিপর্যয়ের জন্য শুধু শিক্ষার্থীরা নয় এসব কারণও দায়ী। আমরা চাই সরকার শিক্ষায় কঠোর হোক এতে করে ভবিষ্যত প্রজন্ম বেঁচে যাবে।
মদন মোহন কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ও শিক্ষাবিদ ডক্টর আবুল ফতেহ ফাত্তাহ শিক্ষাবোর্ডের এমন কাজকে বিধির পরিপন্থী উল্লেখ করে বলেন, বোর্ড নির্ধারিত সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বাহিরে অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে খাতা দেখানোটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এমন কাজ বোর্ডের নিয়মের পরপন্থী কাজ। এতে যথাযথ ভাবে খাতা মূল্যায়ন হবে না।
তিনি আরও বলেন, যদি কোন শিক্ষক তার সংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে পারদর্শী হয় ,তাহলে তাকে যৌক্তিক কাগজপত্র দেখাতে হবে। যদি মুখের কথার উপর বিশ্বাস করে এমন কাজ করা হয় তাহলে এটায় সেটা আইনের ব্যত্যয়।
এ বিষয়ে সিলেট শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর বিলকিস ইয়াছমীন বলেন, বিষয়টি ইতোমদ্যে আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বেশ কয়েকজন পরীক্ষকের কাছ থেকে আমরা উত্তরপত্র ফেরত নিয়ে এসেছি। নতুন করে মূল্যায়নের জন্য যাদেরকে খাতা দেওয়া হচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সিলেট শিক্ষাবোর্ডের ইতিহাসে এবারই প্রথম আমরা প্রথম ইলেকট্রনিক টিচার ইনফরমেশন ফরম (ইটিআইএফ) চালু করেছি। যারা পরীক্ষ হয়েছেন, তারা অনলাইনে আবেদন করেছেন। সেই আবেদন যাচাই-বাচাই করে অনুমোদন করেছেন প্রতিষ্ঠান প্রধান। কিন্তু প্রতিষ্ঠান প্রধান এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয়ের খাতা মূল্যায়নের জন্য অনুমোদন দেওয়ায় এই সমস্যা হয়েছে।
প্রফেসর বিলকিস ইয়াছমীন আরও বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান প্রধান এই কাজ করেছেন আমরা তাদেরকে নোটিশ করবো। পরবর্তীতে আর কোনো পরীক্ষায় এরকম কিছু না ঘটে, সেজন্য পরীক্ষা শাখার সকল কর্মকর্তাদেরও সচেতন থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সিলেট শিক্ষা বোর্ড, এসএসসি পরীক্ষা, ইংরেজি খাতা মূল্যায়ন, পরীক্ষক বিতর্ক, শিক্ষা সংবাদ