১১ মে ২০২৬

যাপিতজীবন / স্বাস্থ্য

চকচকে ভবন, আধুনিক সুবিধা, তবুও অন্তরালে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র

আহমেদ জামিল

প্রকাশঃ ১১ মে, ২০২৬ ৮:১০ অপরাহ্ন

ছবিঃ সিলেট জেলা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। সিলেট ভয়েস

তিনতলা ভবন, চারপাশে ফুলের বাগান। গ্রামের নির্মল পরিবেশ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটির ভেতরে সুনশান নিরবতা। প্রবেশ করতেই চোখ কেড়ে নেয় চকচকে টাইলস। দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই এটি একটি হাসপাতাল। তাও আবার সরকারি প্রতিষ্ঠান। সিলেটের দক্ষিণসুরমা উপজেলার তেতলি ইউনিয়নের অতিরবাড়ি এলাকায় অবস্থিত এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটির নাম জেলা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র।

একসময় সিলেটে স্বাভাবিক প্রসব ও মা-শিশু স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম নির্ভরযোগ্য সরকারি প্রতিষ্ঠান ছিল এটি। নগরীর মদিনা মার্কেট এলাকায় ভাড়া বাসায় ছোট পরিসরে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটিতে প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে গর্ভবতী নারী ও শিশু রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসতেন।

বিশেষ করে ২০০২-২০০৩ সালের দিকে যখন সিজারিয়ান প্রসবের হার তুলনামূলক কম ছিল। তখন স্বাভাবিক প্রসবের জন্য সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাইরে এই কেন্দ্রটি ছিল সাধারণ মানুষের বড় ভরসা। সীমিত অবকাঠামো হলেও সেবার মান ও সহজ যাতায়াতের কারণে রোগীদের আস্থা ছিল প্রতিষ্ঠানটির প্রতি।

কিন্তু ২০০৫ সালে এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি নগরী থেকে দক্ষিণ সুরমার তেতলি ইউনিয়নের অতিরবাড়ি এলাকায় স্থানান্তর করা হলে সেই চিত্র বদলে যেতে শুরু করে। তৎকালীন সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য শফি আহমদ চৌধুরীর উদ্যোগে সেখানে নতুন ভবন ও আবাসিক কোয়ার্টার নির্মাণ করা হয়। স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে উঠলেও হাসপাতালটি কার্যত একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

সিলেট ছাড়াও সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে একটি করে জেলা মা ও শিশু কল্যান কেন্দ্র রয়েছে। সেগুলোর অবস্থান জেলা শহরেই। কিন্তু সিলেটের জেলা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র একটি উপজেলার গ্রামীন এলাকায় স্থানান্তর করে নিয়ে যাওয়ার পেছনে কারণ কী, সেই প্রশ্ন খোঁদ স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের।

তারা বলছেন, মদিনা মার্কেটে থাকা অবস্থায় নগরীসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে সহজে রোগীরা আসতে পারতেন। কিন্তু তেতলীতে স্থানান্তরের পর দূরবর্তী উপজেলার রোগীদের জন্য যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ধীরে ধীরে রোগীর চাপও কমে যায়। এই হাসপাতালটি স্থানান্তরে জনস্বার্থের বিষয়টি কম বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, কেন্দ্রটি স্থানান্তরে পরিকল্পনার চেয়ে রাজনৈতিক ‘কৃতিত্ব’কে অগ্রাধিকার বেশি দেওযা হয়েছে।

তাদের মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, হাসপাতালের অবস্থান, রোগীর যাতায়াত, জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়েই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা প্রয়োজন।

পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপে স্থায়ী ভবনে হস্তান্তরের নামে এই প্রতিষ্ঠানটি শহর থেকে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর এ বিষয়ে অসংখ্যবার স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কিন্তু এটি ফেরাতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন নির্দিষ্ট একটি এলাকার মানুষ ছাড়া এই হাসপাতালটি সম্পর্কে কেউই জানে না।

জানা গেছে, ২০০৫ সালের ২৫ জুন দক্ষিণসুরমা উপজেলার তেতলি ইউনিয়নের লক্ষিপুর অতিরবাড়ি এলাকায় প্রায় পাঁচ শতক জমির উপর জেলা মাম ও শিশু কল্যান কেন্দ্রটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য শফি আহমদ চৌধুরী। জায়গাটি দান করেন স্থানীয় আটজন ব্যক্তি।  

সরজমিনে হাসপাতালটি ঘুরে দেখা গেছে, তিনতলা ভবনের প্রতিটি তলাই খুবই পরিপাটি। রোগী কম থাকায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা হাসপাতালটিকে নিজের ঘরের মতো সাজিয়ে-ঘুচিয়ে রেখেছেন। নিচতলায় রয়েছে মেডিকেল অফিসারের কক্ষ। তার পাশেই নার্সের কক্ষ। রয়েছে কিশোর-কিশোরী সেবা কক্ষ, ব্রেস্ট ফিডিং কর্ণার, পরিবার পরিকল্পনার পরিদর্শিকার কক্ষ ও ডিসপেনসারি।

দ্বিতীয় তলায় রয়েছে ২০ শয্যার একটি কক্ষ। রোগী ভর্তি না থাকায় শয্যাগুলো খুবই পরিপাটি করে গোছানো রয়েছে। একই তলায় রয়েছে একটি অপারেশন থিয়েটার ও লেবার ওটি। এনেশথিয়াসিস্ট না থাকায় দীর্ঘদন ধরে বন্ধ অপারেশন থিয়েটার। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দামি দামি যন্ত্রপাতি। তবে পরিবার পরিকল্পনা কর্মী থাকায় স্বাভাবিক প্রসবের জন্য লেবার ওটি ব্যবহার করায় এটি সচল রয়েছে। তৃতীয় তলায় আরও কয়েকটি পরিত্যক্ত কক্ষ রয়েছে।

তিনতলা ভবনের পাশেই রয়েছে চিকিৎসক ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মীদের আবাসন ব্যবস্থা। একটি ভবনে থাকেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির মেডিকেল অফিসার ইশরাত জাহান খান। আরও একটি ভবনে থাকেন দুইজন পরিবার পরিকল্পনার পরিদর্শিকা।

সরজমিনে দেখা গেছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ঠিক পাশেই তালাবদ্ধ ঘরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে একটি অ্যাম্বুলেন্স। সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বাস্থ্য কেন্দ্রের কোনো রোগীর উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে এই অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে জেলা শহরে পাঠানো হতো। কিন্তু ২০১৩ সালের পর থেকে চালক না থাকায় অ্যাম্বুলেন্সটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন স্থাপনায় ভবন নির্মাণ হলেও দীর্ঘদিন ধরেই কেন্দ্রটিতে জনবল ও সরঞ্জাম সংকট রয়েছে। চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও ওষুধের ঘাটতিও রয়েছে। প্রায় ১০ মাস ধরে নেই ওষুধ।

স্বাস্থ্যকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে দুইজন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অনুমেদিত ১০টি পদ রয়েছে। ১০ পদের বিপরীতে ৭জন কর্মরত রয়েছেন। এর বাইরে ডেপুটেশনে দুইজন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা, একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও একজন আয়া কর্মরত রয়েছেন। এই জনবল দিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটির সেবাদান কার্যক্রম।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির মেডিকেল অফিসার ইশরাত জাহান খান বলেন, এই হাসপাতালে প্রতিদিন ৭০-৮০জন রোগী আসেন। বেশিরভাগই পরিবার পরিকল্পনার সেবা নেন। প্রতিমাসে গড়ে ১৫ থেকে ২০টি নরমাল ডেলিভারি হয়। একসময় এখানে সিজারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করা হতো। এক বছর ধরে মেডিকেল অফিসার (এনেস্থেশিয়া) অননুমোদিতভাবে অনুস্থিত। যার কারণে সিজারিয়ান সেবা বন্ধ রয়েছে।  

সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. জন্মেজয় দত্ত বলেন, মা ও শিশু কেন্দ্র সব জায়গাতে হতে পারে, শুধু শহরাঞ্চলে হবে এমন কোনো কথা নেই। তবে এটার পাবলিসিটি নিয়ে আমাদের আরও কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, মা ও শিশু কেন্দ্রগুলো সাধারণত পরিবার পরিকল্পনার অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রশাসনিক কোনো কারণে শিফট হয়েছে কিনা তা তাদের সঙ্গে আলাপ করলে ভালো হবে।

সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক মো. নিয়াজুর রহমান বলেন, ‘জেলা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলো সাধারণত শহরের ভেতরে থাকে। তবে সিলেটের ক্ষেত্রে এটি শহর থেকে কিছুটা দূরে হওয়ার কারণ কী ছিল তা আমার জানা নেই। আমি যোগদানের অনেক বছর আগেই এটি স্থানান্তর করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, জেলা পর্যায়ে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলো সাধারণত শহরের ভেতরে থাকে। তবে সিলেটের ক্ষেত্রে এটি শহর থেকে কিছুটা দূরে। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা অন্যান্য হাসপাতালের ওপর চাপ কমাতে হয়তো এটি করা হতে পারে।

যার প্রচেষ্ঠায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি জেলা শহর থেকে গ্রামের স্থানান্তর করা হয়েছিল সিলেট-৩ আসনের সেই সাবেক সংসদ সদস্য শফি আহমদ চৌধুরীর বক্তব্য নিতে তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে।


শেয়ার করুনঃ

যাপিতজীবন থেকে আরো পড়ুন

সিলেট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, দক্ষিণ সুরমা হাসপাতাল, সিলেট স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ, সিলেট হাসপাতাল সংকট

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ