সংক্রমণ কমলেও মৃত্যুতে আট বিভাগের মধ্যে দ্বিতীয় সিলেট, পিছিয়ে টিকাদানেও
যাপিতজীবন
প্রকাশঃ ২২ জুলাই, ২০২৬ ১১:২১ অপরাহ্ন
সারাদেশে হামের সংক্রমণ অব্যাহত থাকলেও উদ্বেগজনক অবস্থানে রয়েছে সিলেট বিভাগ। হাম ও হাম উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুতে ঢাকার পরেই রয়েছে সিলেটের অবস্থান। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বুধবার (২২ জুলাই) পর্যন্ত মোট মৃত্যুর ১৫ শতাংশই সিলেট বিভাগের। অন্যদিকে, হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির কভারেজেও দেশের আট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে সিলেট।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের বুধবারের তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট ১ লাখ ২০ হাজার ৩৫২ জন হাম উপসর্গের রোগী ছিলেন। এর মধ্যে সিলেট বিভাগের রয়েছেন ৭ হাজার ৫২ জন। একই সময়ে দেশে ল্যাব পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে ১৪ হাজার ৮৪১ জনের। এর মধ্যে সিলেটে ৫৫৯ জনের।
অন্যদিকে, একই সময়ে উপসর্গ ও ল্যাব কনফার্ম মিলিয়ে মোট ৮০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট বিভাগেই মারা গেছেন ১০৭ জন। যা গড়ে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ আক্রান্তের অনুপাতে সিলেটে মৃত্যুর হার দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
দেশব্যাপী হাম রোগে আক্রান্তের সংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। বিভাগটিতে এ পর্যন্ত ৫৪ হাজার ৭২ জন হামে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে মারা গেছেন ৩০৭ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। এ বিভাগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২১ হাজার ৬৬৩ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৫৬ জনের।
তবে আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুতে সবচেয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে সিলেট বিভাগ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, সিলেট বিভাগে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ১০৮জন। তাদের মধ্যর উপসর্গ নিয়ে ১০৫ জন ও নিশ্চিত হামে ৩ জন।
তবে সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় বলছে, সিলেট বিভাগে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ১০৭ জন। তাদের মধ্যে হাম উপসর্গে ১০৩ জন ও ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত ৪জন।
জেলাভিত্তিক হিসাবে সিলেট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে সুনামগঞ্জে। এ জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ৪৭ জন। এরপর সিলেট জেলায় ৩৬ জন, মৌলভীবাজারে ১৩ জন এবং হবিগঞ্জে ১১ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে গেল ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে ৯০৪ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের। এর মধ্যে সিলেট বিভাগে দুইজন।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মারা যাওয়া দুই শিশুর বয়সই পাঁচ মাস। তাদের একজন মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার এবং অন্যজন হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার।
একই সময়ে ল্যাব পরীক্ষায় নতুন করে কারও হাম শনাক্ত না হলেও ৭১ জন সন্দেহজনক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ২৭ জন এবং এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৮ জন ভর্তি হয়েছেন।
অন্যদিকে বর্তমানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ২২৭ জন সন্দেহজনক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানিয়েছে বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয় । তাদের মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৮৩ জন এবং এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭৬ জন ভর্তি আছেন।
হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, জাতীয়ভাবে টিকাদানের কভারেজ ১০৩ শতাংশ হলেও সিলেট বিভাগে তা ৯৯ শতাংশ। যা দেশের আট বিভাগের মধ্যে সর্বনিম্ন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদান কভারেজ ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে।
সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন জানান, বর্তমানে মৃত্যুগুলোর পেছনে শুধুমাত্র হাম (Measles) দায়ী নয়, বরং এর সঙ্গে নিউমোনিয়া বা শ্বাসকষ্টের মতো অন্যান্য রোগও থাকতে পারে। বর্তমানে হামের প্রকোপ চলায় সব মৃত্যুই হামের কারণে হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে সিলেটে টিকাদানের কভারেজ প্রায় ৯৮ শতাংশ। আমাদের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়ে গেছে। মাঠ পর্যায়ে কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই শিশুদের খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, 'সুনামগঞ্জ একটি হাওর এলাকা হওয়ায় সেখানে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যান্য জেলার তুলনায় সেখানে ইমিউনিটি এবং টিকাদান কার্যক্রম কিছুটা পিছিয়ে থাকতে পারে, যা মৃত্যুর হার বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হতে পারে। হাওর এলাকায় টিকাদান নিশ্চিত করতে সরকারি প্রচেষ্টার পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোও কাজ করছে। মৃত্যুর হার বিবেচনায় সুনামগঞ্জের মতো এলাকাগুলোতে টিকাদানের কভারেজ বাড়াতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।'
সিলেট বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মাহবুবুল আলম বলেন, ‘টিকাদান কর্মসূচির সফলতার কারণে প্রতিদিন রোগী ভর্তির সংখ্যা অনেক কমেছে এবং মৃত্যুর হারও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘যেখানে আগে প্রতিদিন ৪-৫ জন মারা যেতো, এখন অনেক দিন কোনো মৃত্যু নেই। ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জিত হলে এর সুফল আরও ভালোভাবে পাওয়া যাবে।’
তিনি বলেন, ‘যদিও নির্দিষ্ট বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে, তবুও যেসব মা আগে টিকা নেননি, তাদের নবজাতক শিশুরা ঝুঁকির মুখে থাকছে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকা এবং সিলেটের চা বাগান অঞ্চলে শিক্ষার অভাব ও টিকাদানের হার কম হওয়ায় সেখানে সংক্রমণের প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে।’
হাম, সিলেট বিভাগ, হামে মৃত্যু, হাম-রুবেলা টিকাদান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর