অফিসের ফাইল থেকে সন্তানের খাতা, ক্লান্তির মাঝেও ভালোবাসার গল্প
দৈনন্দিন
প্রকাশঃ ১০ মে, ২০২৬ ১:৫২ অপরাহ্ন
সকালবেলা হাওরের দূরে কোথাও নৌকার বৈঠার শব্দ, আর মাঝেমধ্যে ভেসে আসছে পাখির ডাক। সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার লংকাপাথারিয়া প্রত্যন্ত গ্রামের ঘাটে দাঁড়িয়ে আছেন সালেহা বেগম। হাতে একটি ছোট পাত্র, তাতে আলুভর্তা, ভাত আর শুকনো মরিচ। পাশেই তাঁর আট বছরের ছেলে। স্কুলে যাওয়ার আগে ছেলেকে খাইয়ে দিতে হবে। তারপর নিজে নামতে হবে পানিতে কখনো মাছ ধরতে, কখনো অন্যের জমিতে কাজ করতে।
মা দিবসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে যখন নানা শুভেচ্ছা আর আবেগঘন বার্তার ছড়াছড়ি, তখন হাওর অঞ্চলের অনেক মায়ের জীবন কাটে এক ভিন্ন বাস্তবতায়। বন্যা, ফসলহানি, নদীভাঙন আর দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই করেই তাঁরা সন্তানদের মানুষ করার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখেন।
সালেহা বেগম বলেন, 'আমরা তো কষ্ট কইরাই বাঁচি। কিন্তু চাই আমার পোলাডা যেন আমার মতো কষ্ট না করে। সারাটা বছর আমরার কাজ আর দুর্ভোগের উপর দিয়া যাইতে হয় পুরুষ মানুষ হাওরে ক্ষেতে কাজ করে আর তার পুরা সংসার আমার দেখিয়া রাখা লাগে। তারপর নিজের ছেলেটার দিকে নজর রাখতে হয়, আমার ছেলেটা অনেক বড় হোক। '
হাওর অঞ্চলে বছরের বড় একটি অংশ পানিবন্দী অবস্থায় কাটে। বর্ষা এলেই অনেক গ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, নৌকাই তখন একমাত্র ভরসা। দুর্যোগের সময়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন নারী ও শিশুরা। সন্তানদের নিরাপদ রাখা, খাবারের ব্যবস্থা করা, অসুস্থ হলে চিকিৎসা করানো সবকিছুর ভার এসে পড়ে মায়ের কাঁধে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বন্যার সময় অনেক মা নিজেদের খাবার কমিয়ে সন্তানদের জন্য রেখে দেন। কেউ কেউ দিনের পর দিন না খেয়ে থেকেও শিশুদের মুখে খাবার তুলে দেন। অনেক পরিবারে পুরুষ সদস্যরা কাজের জন্য শহরে চলে যান, তখন পুরো সংসার সামলানোর দায়িত্ব একাই পালন করেন নারীরা।
দোয়ারাবাজার উপজেলার দক্ষিণ বংশীকুণ্ডা এলাকার স্বপ্না বেগম দুই মেয়েকে নিয়ে থাকেন। তার স্বামী ঢাকায় রিকশা চালান। স্বপ্না বেগম বলেন, নিজে খাই আর খাই নিজের মেয়ে দুইটারে ঠিকমতো খাওয়াই। আমার মেয়ে দুইটা আল্লাহ দিলে পড়াশুনায় ভালা আছে, তারার সপ্ন বড় অইয়া ডাক্তার উকিল অইতো। কিন্তু জানিনা তারার স্বপ্ন পূরণ করতে পারমু কি না, তবে আমি তার বাবায় মিলিয়া শেষ চেষ্টা করিয়া যাইমু ।
হাওরের নারীদের জীবনে শিক্ষার অভাবও বড় একটি সমস্যা। অনেক মা নিজেরা স্কুলে যেতে পারেননি, কিন্তু সন্তানদের পড়াশোনা করানোর ব্যাপারে তাঁরা আপসহীন। স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষক জানান, অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও অনেক মা সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর জন্য অন্যের বাড়িতে কাজ করেন।
জাউয়া বাজার কলেজের প্রভাষক দুলাল মিয়া বলেন, এখানে মায়েরা খুব সংগ্রামী। শুধু সংগ্রামী বললেও কম বলা হয়। আমি বহু বছর ধরে এই অঞ্চলে আছি, দেখেছি কীভাবে একজন মা নিজে না খেয়ে সন্তানের বইখাতার টাকা জোগাড় করেন। অনেক সময় দেখা যায়, বাবা আগ্রহী না হলেও মা সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে চান। বাবা হয়তো বলেন, পড়াশোনায় কী লাভ, মাঠে কাজ করলেই পেট চলবে। কিন্তু মা থেমে যান না। রাত জেগে সন্তানের পড়া দেখেন, নিজে অক্ষর না চিনলেও। হাওরের এই মায়েরা হয়তো কখনো পুরস্কার পাবেন না, কেউ তাঁদের নিয়ে বড় করে লিখবে না। কিন্তু এই অঞ্চলে যে ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করে মানুষ হয়েছে, তাদের পেছনে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই একজন জেদি মায়ের গল্প আছে।'
হাওরের অনেক মা হয়তো কখনো মা দিবসের কথা শোনেননি। কিন্তু প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে সন্তানকে নিয়ে তাঁদের যে লড়াই, সেটিই মাতৃত্বের সবচেয়ে গভীর রূপ।
হাওর, সুনামগঞ্জ, মা দিবস, মা