২৭ মে ২০২৬

সংগ্রাম-স্বাধীনতা

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যেভাবে উঠে আসে একাত্তরের ২৬ মার্চ

ভয়েস ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশঃ ২৬ মার্চ, ২০২৬ ২:২০ পূর্বাহ্ন


বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসে ২৫ ও ২৬ মার্চ—দুটি তারিখ অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাত ‘কালরাত্রি’ হিসেবে পরিচিত। ওই রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ব্যাপক গণহত্যা চালায়। এর পরদিন ২৬ মার্চ, জাতির নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তান সরকার। 

২৫ মার্চের গণহত্যার ও বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের খবরের পাশাপাশি স্বাধীনতার ঘোষণার খবর দ্রুতই বিশ্ব গণমাধ্যমে গুরুত্ব পায়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংকলক অভ্রনীল যাত্রী তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, ১৯৭১ সালের ২৭ ও ২৮ মার্চের মধ্যে বিশ্বের অন্তত ৯০টি পত্রিকায় এ সংক্রান্ত বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশ হয়।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংকলন ‘মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ’-এ থাকা তথ্য অনুযায়ী, ২৭ মার্চ ‘আর্মড রেবেলিয়ন রিপোর্টেড’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউইয়র্ক টাইমস। নয়াদিল্লি থেকে পাঠানো ওই খবরে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানে প্রকাশ্য বিদ্রোহ শুরু হয়েছে এবং একটি রেডিও স্টেশন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমস। ছবি: সংগৃহিত

ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু। পরে সেই ঘোষণা চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে সম্প্রচার করা হয়। ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান। পরে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। মেজর জিয়ার এ ঘোষণার পরই স্বাধীনতার যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো ২৫ মার্চের গণহত্যা ও পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকে। ২৭ মার্চ নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তান রেডিওর তথ্য অনুযায়ী স্বাধীনতা ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার খবরও উঠে আসে।

একই দিনে পত্রিকাটির আরেক প্রতিবেদনে সাংবাদিক সিডনি এইচ শ্যানবার্গ লিখেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র মানুষের ওপর ভারী অস্ত্র ব্যবহার করছে এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে গোলাবর্ষণ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটছে। অন্য এক প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়।

পশ্চিম পাকিস্তানেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার তথ্য প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলো। রয়টার্সের উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়, লায়লপুরে (বর্তমান ফয়সালাবাদ) সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনতে কারফিউ জারি করা হয়েছে।

মার্কিন সাময়িকী টাইম জানায়, ঢাকায় ২৪ ঘণ্টার কারফিউ জারি করা হয়েছে এবং তা ভঙ্গকারীদের গুলি করা হচ্ছে। একই সময়ে ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া ‘বাংলাদেশ স্বাধীন’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে এবং শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।
দ্য আইরিশ টাইমস। ছবি: সংগৃহিত

আইরিশ টাইমস, আইরিশ ইন্ডিপেনডেন্টসহ ইউরোপের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও একই ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে স্বাধীনতার ঘোষণা, চলমান যুদ্ধ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তারের খবর গুরুত্ব পায়।

২৬ মার্চ ব্যাংকক পোস্ট ‘গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পাকিস্তান’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি দ্রুত গৃহযুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন পত্রিকায়ও একই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়। দ্য উইন্ডসর স্টার, দ্য ব্রায়ান টাইমস, দ্য বুলেটিনসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে যুদ্ধ, বোমাবর্ষণ এবং ব্যাপক প্রাণহানির খবর প্রকাশিত হয়।

২৯ মার্চ সিডনিভিত্তিক দ্য সানডে মর্নিং হেরাল্ড জানায়, পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, দ্য এজ ‘পাকিস্তান ট্র্যাজেডি’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

দ্য ইভনিং টাইমস। ছবি: সংগৃহিত


বিদেশি সম্প্রচারমাধ্যমগুলোর মধ্যেও বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বিবিসি জানায়, শেখ মুজিবুর রহমান গোপন বেতার থেকে প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়েছেন। ভয়েস অব আমেরিকা জানায়, পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকায় অভিযান শুরু করেছে এবং শেখ মুজিব আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছেন।

লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ ও দ্য গার্ডিয়ানও পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এসব প্রতিবেদনে স্বাধীনতার ঘোষণা, সামরিক অভিযান এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার চিত্র তুলে ধরা হয়।


এ ছাড়া ভারত, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ২৫ মার্চের গণহত্যার খবর প্রকাশিত হয়। আন্তর্জাতিক পরিসরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পূর্ব পাকিস্তানের সংকটের চিত্র।


শেয়ার করুনঃ

সংগ্রাম-স্বাধীনতা থেকে আরো পড়ুন

স্বাধীনতা, বাংলাদেশ, গণমাধ্যম, ২৬ মার্চ, গণহত্যা,

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ