ধান পচে গন্ধ, হাওরে ডুবছে স্বপ্ন: চরম দুশ্চিন্তায় জগন্নাথপুরের কৃষক
কৃষি
প্রকাশঃ ৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:৫০ অপরাহ্ন
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য স্বস্তির খবর এসেছে। আকস্মিক বন্যা ও প্রজনন পর্যায়ের ঠান্ডাজনিত ক্ষতির ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ঠান্ডাসহনশীল নতুন বোরো ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। প্রস্তাবিত নাম ব্রি ধান–১১৮। গত বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) কৃষি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৫তম সভায় জাতটি চাষাবাদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অবমুক্ত করা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। এ সময় ব্রির মহাপরিচালক মোহাম্মদ খালেকুজ্জামানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। একই সভায় ব্রি ধান–১১৫, ব্রি ধান–১১৬, ব্রি ধান–১১৭, ব্রি হাইব্রিড ধান–৯ ও ব্রি হাইব্রিড ধান ১০ মোট ছয়টি নতুন জাত অবমুক্ত করা হয়। এসব জাত যুক্ত হওয়ায় ব্রি উদ্ভাবিত ধানের মোট জাতের সংখ্যা দাঁড়াল ১২৭টিতে।
ব্রি জানায়, জনপ্রিয় ব্রি ধান–২৮-এর সঙ্গে ভুটানের একটি ঠান্ডাসহনশীল ধানের সংকরায়ণের মাধ্যমে ব্রি ধান–১১৮ উদ্ভাবন করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের গবেষণা ও ধাপে ধাপে উত্তম গাছ নির্বাচন করে বিশেষ পদ্ধতিতে দ্রুত কয়েক প্রজন্ম এগিয়ে এনে এই জাতটি তৈরি করা হয়। হাওরাঞ্চলের উপযোগিতা যাচাইয়ে গাজীপুরে ব্রির গবেষণা খামার ছাড়াও হবিগঞ্জের আঞ্চলিক কার্যালয়, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে দুই বছর ধরে মাঠপর্যায়ে ফলন পরীক্ষা চালানো হয়।
২০২২–২৩ বোরো মৌসুমে ১০টি স্থানে আঞ্চলিক উপযোগিতা পরীক্ষা এবং ২০২৪–২৫ রবি মৌসুমে আরও ১০টি স্থানে ‘চাষ ও ব্যবহারযোগ্যতা পরীক্ষা’ সম্পন্ন হয়। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, ১০টি স্থানের মধ্যে চারটিতে চেক জাতের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি ফলন পাওয়া গেছে। সামগ্রিকভাবে ব্রি ধান–১১৮-এর হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৬ দশমিক ৭৭ টন, যেখানে চেক জাতের গড় ফলন ৬ দশমিক ৪১ টন। জাতটির গড় জীবনকাল ১৩৬–১৩৭ দিন, যা হাওর এলাকার জন্য তুলনামূলকভাবে স্বল্প।
বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির তত্ত্বাবধানে দুই বছর স্বাতন্ত্র্যতা, একরূপতা ও স্থায়িত্ব পরীক্ষায় চেক জাত ব্রি ধান–২৮-এর তুলনায় পাঁচটি বৈশিষ্ট্যে ভিন্নতা পাওয়া গেছে। রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণও অধিকাংশ স্থানে সহনীয় পর্যায়ে ছিল। কৃষিবিজ্ঞানীরা জানান, এটি একটি আধুনিক উচ্চ ফলনশীল জাত। গাছের গড় উচ্চতা প্রায় ১০০ সেন্টিমিটার, পাতা আধা-খাড়া ও প্রশস্ত। ধান পাকলেও ডিগপাতা সবুজ থাকে। চালের রং সাদা, আকার মাঝারি মোটা এবং ভাত ঝরঝরে। চালে অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ ও প্রোটিন ৯ দশমিক ১ শতাংশ।
ধান গবেষকদের মতে, হাওর এলাকায় আগাম বপনে প্রজনন পর্যায়ে ঠান্ডাজনিত ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তবে ব্রি ধান–১১৮ ঠান্ডাসহনশীল হওয়ায় ২৫ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বরের মধ্যে বপন করলেও গড় তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকায় হেক্টরপ্রতি প্রায় ছয় টন ফলন পাওয়া গেছে। স্বাভাবিক সময়ে বপনে ফলন ৬ দশমিক ৯ টন পর্যন্ত এবং উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় ৮ দশমিক ৫ টন পর্যন্ত হতে পারে।
কৃষিবিজ্ঞানীরা জানান, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মোট ৩৭৩টি হাওর রয়েছে, যার আয়তন প্রায় ৮০–৮৬ লাখ হেক্টর। এর মধ্যে প্রায় ৬৮ লাখ হেক্টর জমি চাষযোগ্য। এই জমির প্রায় ৮০ শতাংশে বোরো এবং ১০ শতাংশে আমন ধানের চাষ হয়। হাওর এলাকা থেকে দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ১৬ শতাংশ আসে। কিন্তু ধান পাকতে শুরু করার সময় আকস্মিক বন্যা এবং আগাম বপনে ঠান্ডাজনিত ক্ষতির কারণে কৃষকেরা বড় ঝুঁকিতে পড়েন। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই হাওরের জন্য স্বল্প জীবনকাল ও ঠান্ডাসহনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।
এদিকে, বোরো মৌসুমে বেশি ফলনের বিকল্প হিসেবে ব্রি ধান–১১৬-কেও গুরুত্ব দিচ্ছেন গবেষকেরা। এটি নাবি ও উচ্চ ফলনশীল একটি জাত, যার গড় জীবনকাল ১৫৪ দিন। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৮ দশমিক ৫৯ টন এবং উন্নত ব্যবস্থাপনায় ১০ দশমিক ৩৬ টন পর্যন্ত হতে পারে।
বিএডিসির জেনারেল ম্যানেজার (বীজ) আবীর হোসেন বলেন, হাওর এলাকার উপযোগী ধানের জাত উদ্ভাবন কৃষি উৎপাদন নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ব্রি উদ্ভিত প্রজনন বিভাগ ও গবেষণা টিমের প্রধান খোন্দকার মো. ইফতেখারুদ্দৌলা জানান, প্রায় আট বছর ধরে একাধিক টিম একসঙ্গে কাজ করে এই ছয়টি নতুন জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। নতুন জাতগুলো মাঠপর্যায়ে গেলে কৃষকেরা সরাসরি উপকৃত হবেন।
বোরো ধান, বীজ, কৃষি, চাষাবাদ, হাওর