০৩ মে ২০২৬

কৃষি

দেখার হাওরে দুই বাঁধে ধস, দায়সারা কাজে ফসলহানির শঙ্কা

নোহান আরেফিন নেওয়াজ, শান্তিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ৭:৩২ অপরাহ্ন


সুনামগঞ্জের বোরো ধানের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত দেখার হাওরের দু’টি ফসল রক্ষা বাঁধের তিনটি জায়গায় বড় ধস ও ফাটল দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে শান্তিগঞ্জ উপজেলার আস্তমা গ্রাম সংলগ্ন ১৭ নম্বর পিআইসিতে (ডাইক-১) দুই স্থানে এবং ১৮ নম্বর পিআইসির ‘ছাইয়া কিত্তা’ নামক স্থানে বড় ধস দেখা দিয়েছে। 

 

এছাড়া হাওরের অপর পাড়ের ৩২ নম্বর পিআইসিতে (ডাইক-২) পিআইসি নীতিমালা না মেনে চলছে দায়সারা কাজ। বাঁধ রক্ষায় অনুপযোগী বেলে মাটি দিয়ে চলছে বাঁধ সংস্কার কাজ। বাঁধের উপরিভাগের প্রস্থ ১২ ফুট থাকার নির্দেশনা থাকলেও সেটা মানছেন না এই পিআইসির সংশ্লিষ্টরা।  

 

এদিকে কাজ শেষ হওয়ার আগেই বাঁধের একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় ধস দেখা দেওয়া এবং নির্দেশনা উপেক্ষা করে দায়সারা কাজ এবং ধীরগতির কারণে ফসলহানির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকরা।

 

এ অবস্থায় বাঁধের ধস রোধ এবং কাজের মান টেকসই করতে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পুরো দেখার হাওরের ফসল হানি হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।

 

উপজেলার আসামপুর গ্রামের নুর ইসলাম বলেন, ‘দেখার হাওরের ফসলের উপর আমরা নির্ভরশীল। তাই প্রতি বছর হাওরের ফসল রক্ষার জন্য অনেক টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু বরাদ্দের তুলনায় কাজ অনেক কম হয়।’ অন্য বছরের তুলনায় এবছর কাজের মান আরো নিম্ন বলে অভিযোগ করেন তিনি। কাজের মান বৃদ্ধির জন্য প্রশাসনকে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান নুর ইসলাম। 

 

আরেক কৃষক মহিদ আলী বলেন, ‘প্রতি বছর কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয় হাওরের ফসল রক্ষায়। কিন্তু কাজ হয় নামমাত্র। এবছরও একই অবস্থা। বৃষ্টির মৌসুম চলে আসছে। কিন্তু এখনও কাজ অর্ধেকও শেষ হয়নি৷ কয়েকটি জায়গায় ভাঙ্গন দেখা গেছে। কিন্তু এখনও সেসব সংস্কার হয়নি। এভাবে গড়িমশি থাকলে পানির ঢল এলে ফসল তলিয়ে যেতে পারে।’

 

জানা গেছে, চলতি বছর শান্তিগঞ্জ উপজেলার ২৩ টি হাওরে ৬৭ টি পিআইসির আওতায় প্রায় ৪৭ কিলোমিটার বাঁধের সংস্কার কাজের অনুমোদন দেওয়া হয়। ব্যয় ধরা হয় ১২ কোটি টাকা। এরমধ্যে দেখার হাওরের আস্তমা ও আসামপুর এলাকায় ৭টি পিআইসির বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা। এরমধ্যে ১৭ নম্বর পিআইসিতে ২৬ লাখ ৩ হাজার টাকা, ১৮ নম্বর পিআইসিতে ১৮ লাখ ৭৯ হাজার টাকা এবং ৩২ নম্বর পিআইসিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। এছাড়া দেখার হাওরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উথারিয়া ক্লোজারে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় ২৬ লাখ টাকা।

 

সরেজমিনে দেখার হাওরে গিয়ে দেখা যায়, হাওরের ১৭ নম্বর পিআইসির দুই স্থানে এবং ১৮ নম্বর পিআইসির 'ছাইয়া কিত্তা' নামক স্থানে ঝূঁকিপূর্ণ ভাঙ্গা ও ধস দেখা দিলেও সেগুলোর সংস্কারে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি পিআইসি সংশ্লিষ্টরা। ভাঙ্গা ও বাঁধ ধস সংস্কারে গড়িমসির কারণ হিসেবে অর্থ সংকট এবং সংস্কার ব্যয় বৃদ্ধির কথা বলছেন পিআইসি সংশ্লিষ্টরা। 

 

১৭ নম্বর পিআইসির সভাপতি সফিকুর রহমান বলেন, 'যখন আমার বাঁধের সার্ভে করা হয় তখন এত বড় ভাঙ্গা ছিল না। এখন দুই জায়গায় যে ভাঙ্গা দেখা দিয়েছে তা সংস্কার করতে হলে বল্লি (গাছের গুঁড়ি) দিয়ে বাঁধের নিচে শক্তভাবে গার্ড বেড়া প্রস্তুত করতে হবে। এরপর মাটি ফেলতে হবে। এতে অনেক অর্থ ব্যয় হবে। অফিস থেকে এখনও আমাকে বাড়তি খরচের বিষয়ে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। তাই ভাঙ্গার কাজ করতে পারছি না। তবে বাঁধের বাকি কাজ দ্রুত গতিতে চলছে।'

 

এদিকে ১৮ নম্বর পিআইসির ছাইয়া কিত্তায় বাঁধের বড় অংশ জুড়ে ধস নামলেও সেটি সংস্কারে গড়িমসি করছেন পিআইসি সংশ্লিষ্টরা পাউবো কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে বারবার নির্দেশনা দিলেও সংস্কার কাজে দেখা যাচ্ছে না দৃশ্যমান পদক্ষেপ। 

 

গড়িমসির কারণ জানতে চাইলে পিআইসির সভাপতি দুদু মিয়া বলেন, বাঁধের কাজ করতে গিয়ে ইতিমধ্যে অনেক টাকা ব্যয় করেছি। কিন্তু কাজের বিল পেয়েছি খুবই অল্প। এখন আবার বাঁধের ধসের কাজ করতে গেলে অনেক টাকার প্রয়োজন। অফিস থেকে সহযোগীতা প্রয়োজন। সেটা পেলে দ্রুত কাজ শেষ করতে পারবো। 

 

তবে উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান বলছেন বিপরীত কথা। তিনি বলেন, ‘পিআইসির অনেকেই অনেক কথা বলে। আমি যখন সার্ভে করি তখন ভাঙ্গার পরিমান কম ছিল। সেজন্য আমি সংস্কারের জন্য বাঁশ ধরেছি, বল্লি (গাছের গুড়ি) ধরিনি। এখন বল্লি ধরলে খরচ বেড়ে যাবে। পিআইসি যে বিল পাবে তা দিয়েই শীঘ্রই এই কাজ করবে। আর প্রথম বিলের যা বরাদ্দ এসেছিল তা ইতিমধ্যে দিয়ে দিয়েছি। পরবর্তী বিল এলে সেটাও দেওয়া হবে।’

 

৩২ নম্বর পিআইসির কাজের মানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পিআইসির নির্দেশনা মেনেই কাজ করতে হবে। কাজ শেষ হলে যখন আমাদের কাজ বুঝিয়র দেওয়া হবে তখন কাজে ঘাটতি থাকলে সেটা পুনঃসংস্কার করতে হবে। গড়িমসির সুযোগ নেই।’


শেয়ার করুনঃ

কৃষি থেকে আরো পড়ুন

শান্তিগঞ্জ, পিআইছি, হাওর রক্ষা বাঁধ, দেখার হাওর

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ