০৩ মে ২০২৬

কৃষি / চাষাবাদ

একমুঠো মাটি না ফেলেই হাওরে ‘নতুন’ বাঁধ, বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ২১ জানুয়ারী, ২০২৬ ৭:০৪ অপরাহ্ন

ছবিঃ দেখার হাওর

সুনামগঞ্জের অন্যতম দেখার হাওরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উথারিয়া ফসলরক্ষা বাঁধে এখনো নতুন করে মাটি ফেলার কোনো কাজ শুরু হয়নি। পুরো বাঁধটিই আগের মতো অক্ষত রয়েছে। তবে সরেজমিনে গেলে চোখে পড়ে ভিন্ন দৃশ্য—এস্কেভেটর দিয়ে পুরোনো বাঁধ খুঁড়ে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন নতুন করে মাটি ফেলা হয়েছে। এতে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে সরকারি বরাদ্দের অপচয় ও অনিয়মের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


দেখার হাওরের আস্তমা এলাকায় মহাসিং নদীর দুই তীরে ডাইক–১ ও ডাইক–২ মিলিয়ে ৫ হাজার ৬৯৫ মিটার দীর্ঘ অক্ষত বাঁধে চলতি মৌসুমে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৪১ লাখ টাকা। অথচ কোথাও মাটি কাটার স্তূপ বা নতুন মাটি ফেলার কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি।


শান্তিগঞ্জ উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাব ডিভিশনাল অফিস সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ সদর, শান্তিগঞ্জ, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত দেখার হাওরে প্রায় ২৪ হাজার ২১৪ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়। এই হাওরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁধগুলোর একটি উথারিয়া বাঁধ ও ক্লোজার। চলতি মৌসুমে শান্তিগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৭টি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উথারিয়া এলাকায় মহাসিং নদীর তীরে ৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে সাতটি পিআইসি।


সরকারি নথিতে তিনটি ক্লোজারকে বড় ভাঙন হিসেবে উল্লেখ করা হলেও সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ভাঙনগুলো ছোট এবং ঝুঁকিমুক্ত। বাঁধগুলোও প্রায় অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, সামান্য ড্রেসিং করলেই কাজ শেষ করা যেত। কিন্তু তার বদলে পুরোনো বাঁধ খুঁড়ে ‘নতুন’ রূপ দেখানো হচ্ছে, যাতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ খরচ দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়।

হাওরে কাজ করা একাধিক কৃষক জানান, গত সপ্তাহে পিআইসি সংশ্লিষ্টরা এস্কেভেটর নিয়ে এসে অক্ষত বাঁধ খুঁড়েছেন। এতে মাটি ছোট ছোট চাকায় পরিণত হয়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় নতুন মাটি ফেলা হয়েছে। কৃষকদের প্রশ্ন এক মুঠো মাটি না ফেলে শুধু ঘষামাজা করে কীভাবে এত বরাদ্দের কাজ দেখানো হবে?


আস্তমা গ্রামের কৃষক আজির উদ্দিন বলেন, উথারিয়া বাঁধে এখনো কাজ শুরু হয় নাই। গত সপ্তাহে মেশিন দিয়া পুরান বাঁধ কুইরা গেছে। তাই দেখতে নয়া লাগে। কেন করছে বুঝতাছি না।” তাঁর মতে, বাঁধগুলো এমনিতেই ভালো অবস্থায় আছে, সামান্য কাজ করলেই টেকসই হতো।


ইসলামপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল হেকিম বলেন, উথারিয়া বাঁধ ভেঙে গেলে পুরো দেখার হাওর পানিতে ডুবে যাবে। কিন্তু এবার এখনো কোনো মাটি ফেলা হয়নি। শুধু পুরোনো বাঁধ খুঁড়ে কাজ দেখানো হচ্ছে।


আস্তমা গ্রামের আরেক কৃষক ফরহাদ হোসেন বলেন, উথারিয়া বাঁধ দেখার হাওরের প্রাণকেন্দ্র। কয়েক দিন আগে এসে বাঁধ খুঁড়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে পিআইসি সদস্যরা বলেছিলেন, গাড়ি চলাচলের সুবিধার জন্য এটি করা হচ্ছে।


হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, কয়েক দশক ধরে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ হলেও আগে কখনো এমন পদ্ধতি দেখা যায়নি। তাঁর অভিযোগ, নতুন মাটি না ফেলে পুরোনো বাঁধ খুঁড়ে প্রকল্প দেখানো হচ্ছে, যাতে সরকারি বরাদ্দ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হয়।


তবে অনিয়মের অভিযোগ নাকচ করেছেন শান্তিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাব ডিভিশনাল অফিসার কামরুজ্জামান মোহন। তিনি বলেন, উথারিয়া এলাকায় সাতটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে এবং তিনটি ক্লোজারে কাজ শুরু হয়েছে। তাঁর দাবি, বাঁধ টেকসই করতেই পুরোনো মাটি খুঁড়ে কাজ করা হয়। যথাযথ প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ হচ্ছে, কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়নি।


শেয়ার করুনঃ

কৃষি থেকে আরো পড়ুন

সুনামগঞ্জ, হাওর, অনিয়ম, দেখার হাওর

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ