ধান পচে গন্ধ, হাওরে ডুবছে স্বপ্ন: চরম দুশ্চিন্তায় জগন্নাথপুরের কৃষক
কৃষি
প্রকাশঃ ৫ জানুয়ারী, ২০২৬ ৮:৫১ অপরাহ্ন
সুনামগঞ্জের দুর্গম হাওর এলাকায় বোরো মৌসুম শুরু হলেও সরকারি সার পাচ্ছেন না কৃষকেরা। অভিযোগ রয়েছে, বরাদ্দ পাওয়া সার ডিলাররা উত্তোলন করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে কালোবাজারে বিক্রি করছেন। এতে একদিকে কৃষককে অতিরিক্ত দামে সার কিনতে হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জানা গেছে, গত ডিসেম্বর মাসে সুনামগঞ্জ জেলায় বরাদ্দ পাওয়া বিপুল পরিমাণ সার কৃষকদের মধ্যে বিতরণ না করে একটি চোরাই সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। শাল্লা উপজেলার একাধিক ডিলারের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে জানুয়ারি মাসের বরাদ্দের সার প্রায় ২০ দিন ধরে বিএডিসির নৌকাঘাটে পড়ে আছে। প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ায় ডিলার, বিএডিসি ও শ্রমিক সিন্ডিকেট সার উত্তোলনে গড়িমসি করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মওসুমে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলায় বোরো চাষী পরিবারের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ। জমি প্রস্তুতের সময় এক দফা ও জমিতে ধান লাগানোর পর আরো দুই দফা সার প্রয়োগ করতে হয়। তবে নন হাওরে তিনবার সার প্রয়োগ করেন কৃষক। সুনামগঞ্জ বিএডিসি (সার) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ডিসেম্বর মাসে জেলায় ১৯৫৮ টন টিএসপি, ৪ হাজার ৫৫৫ মে.টন ডিএপি, এমওপি ৩ হাজার ৪৫ মে.টন বরাদ্দ পাওয়া যায়। জানুয়ারি মাসের বরাদ্দ গত ১৫ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ মল্লিকপুরস্থ বিএডিসি গোডাউনের নৌকাঘাটে এসে জমা হয়ে আছে। এই মাসে ১ হাজার ৩৮৫ মে.টন টিএসপি, ২ হাজার ৯৩৮ টন ডিএপি এবং ১ হাজার ৫৪৩ টন এমওপি সার গত ১৫ ডিসেম্বর থেকে ঘাটে পড়ে আছে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কনভেয়ার বেল্ট লাগিয়ে সার গুদামে না তুলে সরাসরি ট্রাকে তোলা হচ্ছে। ডিলারের ছোট ছোট কয়েকটি নৌকাও এসে লেগেছে ঘাটে। নিয়মানুযায়ী গুদামজাত করে স্টক রেজিস্ট্রারে তুলে তারপর গাড়ি বা নৌকা করে ডিলার সার নেওয়ার কথা। কিন্তু ডিলাররা সরাসরি গাড়ি ও নৌকা করে নিয়ে যাচ্ছেন। ধর্মপাশা, মধ্যনগর, জামালগঞ্জ, শাল্লা, দিরাই, জগন্নাথপুরসহ বিভিন্ন দুর্গম উপজেলার কিছু ডিলার সার উত্তোলন করেই বিএডিসি ও কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে কালোবাজারে সার বিক্রি করে দেন এমন অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। এই সার আশুগঞ্জের একটি সিন্ডিকেট কিনে নিচ্ছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, কৃষক পর্যায়ে টিএসপি ১৩৫০ টাকা, ডিএপি ১০৫০ টাকা ও এমওপি ৯৫০ টাকা বিক্রি করার কথা। কিন্তু বাস্তবে এর চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে কৃষকদের।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামে টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। শাল্লা উপজেলার কৃষকদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক একরামুল হোসেন বলেন, ‘আমাদের এলাকায় শতভাগ বোরো আবাদ হয়। কিন্তু ডিলাররা সরকারি সার কালোবাজারে বিক্রি করায় আমরা বাধ্য হয়ে বেশি দামে সার কিনছি।’
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ চৌধুরী নান্টু বলেন, ‘প্রতিদিন কৃষকরা সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন। কেন শাল্লায় সময়মতো সার পৌঁছাচ্ছে না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।’
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, শাল্লার কয়েকজন ডিলার সরকারি বরাদ্দের সার সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করেননি। তাদের শোকজ করা হয়েছে এবং সন্তোষজনক জবাব না পাওয়ায় ডিলারশিপ বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিএডিসি, সুনামগঞ্জ, বোরো ফসল, সার কালোবাজারি