০৩ মে ২০২৬

কৃষি / চাষাবাদ

বোরো রক্ষায় গোপাট উন্নয়ন: হাওরে শুরু হলো স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ১ জানুয়ারী, ২০২৬ ৯:৫৮ অপরাহ্ন


দুর্গম হাওরের কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদিত ফসল পরিবহনের একমাত্র ভরসা ‘গোপাট’। কর্দমাক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এই গোপাট দিয়েই প্রতিবছর বৈশাখে দূরবর্তী হাওর থেকে কৃষকরা বোরো ধান পরিবহন করেন। তবে আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কারণে অনেক সময় দ্রুত ফসল পরিবহন সম্ভব হয় না। ফলে কাটা ধান নষ্ট হয়ে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষকরা।

এই দীর্ঘদিনের সমস্যার আংশিক সমাধানে এবার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। হাওরের গুরুত্বপূর্ণ গোপাট পাকাকরণসহ থ্রেসিং ফ্লোর (ধান মাড়াইয়ের স্থান) ও সানিং ফ্লোর (মাড়াই করা ধান শুকানোর স্থান) নির্মাণকাজ শুরু করেছে সংস্থাটি। চলতি অর্থবছর থেকেই সুনামগঞ্জসহ সিলেট বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ হাওরে এসব কাজ শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সুনামগঞ্জ বিএডিসি সূত্র জানায়, ‘সিলেট বিভাগে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’ শীর্ষক প্রায় ৫শ’ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত। এই প্রকল্পের আওতায় হাওরের গোপাট উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

প্রকল্প কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ—এই চার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমে পতিত জমি চাষের আওতায় আনা, খাল ও পাহাড়ি নালা খনন, গোপাট পাকাকরণ, কৃষক প্রশিক্ষণসহ বহুমুখী কৃষি উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চার জেলায় ১৭ হাজার ১৯ হেক্টর পতিত জমি সেচ সুবিধার আওতায় আসবে এবং প্রায় ৫১ হাজার ৫৮ মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রকল্পের আওতায় হাওরে প্রায় ১০ কিলোমিটার গোপাট স্থায়ীভাবে পাকা করা হবে। প্রথম বছরে সুনামগঞ্জ জেলায় প্রায় ৪ কিলোমিটার গোপাট পাকাকরণের কাজ শুরু হবে। পাশাপাশি দুর্গম হাওরে ২টি করে থ্রেসিং ফ্লোর ও সানিং ফ্লোর নির্মাণ করা হবে। এসব গোপাট ৮ ফুট প্রশস্ত করে আরসিসি ঢালাইয়ের মাধ্যমে নির্মাণ করা হবে। বর্তমানে এসব কাজের নকশা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গোপাট পাকাকরণ হলে কৃষকরা দ্রুত ও নিরাপদে কাটা ধান পরিবহন করতে পারবেন। থ্রেসিং ও সানিং ফ্লোর থাকায় পাহাড়ি ঢল বা আকস্মিক দুর্যোগের সময় হাওরেই ধান মাড়াই ও শুকানোর সুযোগ তৈরি হবে। এতে ফসল নষ্টের ঝুঁকি কমবে, সময় ও ব্যয় সাশ্রয় হবে।

হাওর আন্দোলনের নেতা ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, “এই প্রথম সরকার হাওরের গোপাটকে একটি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এনেছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে গোপাট পাকাকরণ ও গোপাটের পাশের জলাধার প্রবহমান রাখার দাবি জানিয়ে আসছিলাম। এতে সড়ক ও নৌ—দুই পথেই ধান পরিবহন সম্ভব হবে।”

তিনি আরও বলেন, কাজ শুরু হওয়াটা ইতিবাচক। তবে পর্যায়ক্রমে জেলার সব গুরুত্বপূর্ণ হাওরে গোপাট উন্নয়ন করতে হবে। কারণ প্রতিটি হাওরের নিজস্ব গোপাট রয়েছে।

হাওর, নদী ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, “গোপাট, থ্রেসিং ও সানিং ফ্লোর নির্মাণ প্রকল্পটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। তবে এটি জলবায়ু সহিষ্ণু ও টেকসই করতে হবে। হাওরের অভিজ্ঞ কৃষক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে কাজ যেন দুর্নীতি ও অনিয়মমুক্ত হয়, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।”

প্রকল্প পরিচালক প্রণজিত কুমার দেব বলেন, “বিএডিসির পাঁচ বছরের এই প্রকল্পটি হাওরের কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। বিশেষ করে গোপাট পাকাকরণ এবং থ্রেসিং ও সানিং ফ্লোর নির্মাণ হাওরের উৎপাদিত ফসল পরিবহন, মাড়াই ও শুকানোর ক্ষেত্রে বড় ধরনের সুফল দেবে। জরুরি পরিস্থিতিতে এসব অবকাঠামো কৃষকদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে।”


শেয়ার করুনঃ

কৃষি থেকে আরো পড়ুন

হাওর, কৃষি, সুনামগঞ্জ

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ