শাবিপ্রবিতে লুঙ্গি-গামছা পরে ভাইভা পরীক্ষায় এক শিক্ষার্থী
তথ্যপ্রযুক্তি-শিক্ষা
প্রকাশঃ ২৩ অক্টোবর, ২০২৫ ৯:১৫ অপরাহ্ন
সম্প্রতি দ্য টেলিগ্রাফে এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, ‘আমার শাসনামলে দেখেছি, লন্ডনের কিছু অংশে বাংলাদেশি কমিউনিটির দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্ম ইংরেজিতে কথা বলতে পারে না। সেটা ছিল লজ্জাজনক।’
এই বক্তব্যের সত্যতা মিলছে দ্বিতীয় লন্ডন খ্যাত সিলেটে। কেবল ইংরেজিতে দুর্বলতার কারণেই সিলেটের অসংখ্যা শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপে যেতে পারছেন না। ভিসা প্রাপ্তির সাক্ষাৎকারে গিয়ে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ‘ইংরেজি দুর্বলতা। সদ্য প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলেও তারই প্রতিফলন দেখা গেছে। এবছর এইচএসসিতে সিলেট শিক্ষাবোর্ডে ইংরেজি বিষয়ে ফেল করেছে ৩৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী। যার প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক পাসের হারে। গত বছরের তুলনায় এবছর পাসের হার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এবছর সিলেট বোর্ডে পাসের হার ৫১ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
সিলেটের প্রায় প্রতিটি উপজেলার গ্রামাঞ্চলেই এখন শিক্ষার্থীদের ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। কেউ ইতালির ভিসার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ আবার যুক্তরাজ্য, জার্মানি কিংবা পর্তুগালে পড়াশোনার স্বপ্নে নিচ্ছেন প্রস্তুতি। কিন্তু তাদের অনেকেই মৌলিক ইংরেজি ব্যাকরণ, শব্দচয়ন কিংবা যোগাযোগ দক্ষতায় দুর্বল।
সিলেট নগরীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, বিদ্যালয় থেকে কলেজ জীবন পর্যন্ত বাধ্যতামূলক ইংরেজি পড়ানো হলেও প্রতিবছরই এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ইংরেজিতে ফলাফল নিম্নমুখী। অনেক শিক্ষার্থীই ইংরেজি শেখাকে কেবল পরীক্ষার বিষয় হিসেবে দেখেন। একইভাবে শিক্ষকরাও সিলেবাসের বাইরে পাঠদান করান না । যার কারণে শ্রেণিকক্ষে ‘স্পোকেন ইংলিশ’ বা যোগাযোগমূলক ইংরেজির চর্চা সুযোগ পায় না শিক্ষার্থীরা।
অনেকেই আইইএলটিএস বা ‘স্পোকেন ইংলিশ’ কোর্সে ভর্তি হলেও নিয়মিত চর্চা না করার কারণে প্রত্যাশিত উন্নতি হয় না। তার মধ্যে সবচেয়ে করুণ অবস্থা হাওরাঞ্চল খ্যাত সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের শিক্ষার্থীদের।
এবার ইংরেজিতে বি গ্রেড পাওয়া সুনামগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী লুবাবা আক্তার বলেন, ‘আমি পরীক্ষা ভালো দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার গ্রেড খারাপ আসছে ইংরেজিতে। এর পেছনে শিক্ষকদেরও কিছুটা দায় আছে। কারণ তারা ক্লাসে বেশি ইংরেজি পড়ান না। আবার ইংরেজি পড়ালেও বেশিরভাগই বাংলায় বলেন। যার কারণে বাংলা আমরা সবকিছুতেই মিলিয়ে নেই। ইংরেজিটা ততোটা মনে থাকে না। যেহেতু এখন ইংরেজিতে খারাপ করেছি তাই এখন আইইএলটিএস দিয়ে ইউরোপে চলে যাবো।’
একই ইচ্ছে সুনামগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী চারুলতার। তিনি বলেন, ‘দেশে পড়াশুনার অবস্থা ভালো না, শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক সবাই এখন রাজনীতিতে ব্যস্ত, পরীক্ষা বা পড়াশুনা তা ঐচ্ছিকের বিষয়ের মতো। তারা এখন শ্রেণিকক্ষে না পড়িয়ে বাসায় পড়াতে চান। তাই ফলাফল যেমনই হোক আমি এখন আইইএলটিএস এর প্রিপারেশন নিয়ে ফিনল্যান্ড বা ইউকে যাওয়ার চেষ্টা করবো।
আইইএলটিএস সেন্টার সিলেটের পরিচালক মো. রিয়াদ মাহমুদ বলেন, ‘বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরেজিকে কেবল কাগজে কলমে রাখা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার্থীরা ইংরেজিটা শিখতে পারে না। শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভিতটা অধিক দুর্বল থাকে। এ অবস্থায় তারা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যেতে ইংরেজি শিখে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বা প্রকৃতভাবে যারা আইইএলটিএস দিয়ে ইংরেজি শিখে বিদেশ যায় তারা দেশের সুনাম বয়ে আনে। আমরা দেখি আইইএলটিএস ছাড়াও বিভিন্ন মাধ্যমে ইউরোপ আমেরিকা যাচ্ছেন এতে করে প্রকৃতপক্ষে ইংরেজিটা শিখে যেতে পারছেন কি না প্রশ্ন থেকে যায়। উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশ যেতে আগ্রহী যারা ইংরেজি শিখতে আসেন তাদের ভিত্তিটা অত্যন্ত দুর্বল। এটা আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থারই বাস্তব চিত্র। ইংরেজি শিক্ষার ৪ টি পদ্ধতির দুটিই বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নেই। তা হলো শোনা (লিসেনিং) ও বলা ( স্পিকিং)। আমাদের দেশে ইংরেজিকে কেবল পড়া ও লেখানো হয় যা অতোটা কার্যকরী নয়।’
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক পান্না মজুমদার অবশ্য এসবের জন্য দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাকেই দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, ‘এবছর সিলেটে এইচএসসি ও এসএসসিতে যে ইংরেজিতে খারাপ ফলাফল এসেছে আমার কাছে এটাই বাস্তব চিত্র মনে হচ্ছে। কারণ এখানে শিক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। আপনি সিলেবাস দেন কিন্তু সেই সিলেবাস কি আদৌ শেষ হয়, সিলেবাস শেষ না করে পরীক্ষা আয়োজন এতে শিক্ষার্থীদের কেমন উপকার হয়, এছাড়া নতুন ক্লাসে উঠে সেই একই জিনিস বার বার শিখতেছে প্রাথমিকের শিক্ষায় সে যে ব্যাকরণ নিয়ে পড়তেছে সেটাই সে কলেজ জীবন পর্যন্ত পড়ে যাচ্ছে এতে করে একজন শিক্ষার্থীর ইংরেজি পড়ার আগ্রহ কমে যাচ্ছে, এছাড়া শিক্ষকরা কতটুকু দক্ষ সেটাও দেখবে। এছাড়া শিক্ষকদের সম্মানীটা যদি তার বর্তমান বাজার ব্যবস্থার হিসেবে করা হয় তাহলে শিক্ষকরাও পড়াতে উৎসাহী হতেন।
তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে ব্যাকরণের ধারাবাহিকতার প্রয়োজন আছে কিন্তু তা করতে হবে শিক্ষার্থীর শ্রেণি বাস্তবতাই । সমন্বয় করাটা খুব জরুরি শ্রেণি মান দেখে। একই পড়া বার বার গতানুগতিক ধারায় হলে শিক্ষার্থীরা কখনও আনন্দ পাবে না।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও শিক্ষাবিদ পরিমল কান্তি দে বলেন, সিলেট বিভাগের এবারের ফলাফল বিপর্যয়ে আমি খুবই হতাশ। এই ফল থেকেই আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত। এই ফলাফল বিপর্যয়ে কারণে আমি মনে করি সকল প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা উচিত। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এবং আন্তজার্তিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি সকলের জানা প্রয়োজন, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের। তবে আমাদের শিক্ষার্থীরা ইংরেজিতে এতো পিছিয়ে যেটি আসলেই খারাপ লাগে তাই আমার মতে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উচিত ইংরেজির প্রতি বিশেষ নজর দেয়া।
বিদেশমুখী প্রবণতার বিষয়ে তিনি বলেন, বিদেশে যাওয়ার জন্য ইংরেজিতে দক্ষ হওয়া খুব প্রয়োজন, ইংরেজি না জেনে বিদেশে গেলে ওই দেশের মানুষরা অন্যদের শ্রমিক হিসেবে গণ্য করে। সেজন্য যারা বিদেশে যাবেন, তারা যেনো এই একটা বিষয়ে অন্তত্য দক্ষ হয়ে যান। এতে দেশের সম্মান এবং মর্যাদা দুইয়ে বজায় থাকবে।
সিলেট, ইউরোপ, শিক্ষার্থী, ইংরেজি, দুর্বল ভিত