২০ এপ্রিল ২০২৬

অনিয়ম-দুর্নীতি

সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল

স্টোর রুমেই মেয়াদোত্তীর্ণ আড়াই কোটি টাকার ওষুধ

প্রতিনিধি, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ৯:১৬ অপরাহ্ন


হাওরের জেলা সুনামগঞ্জের ২৬ লাখ মানুষের একমাত্র ভরসা ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতাল। অথচ এই হাসপাতালে অব্যবস্থাপনার কারণে স্টোর রুমেই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি টাকার ওষুধ। এতে শুধু সরকারি অর্থের অপচয়ই নয়, বরং রোগীদের প্রাপ্য চিকিৎসাসেবারও ঘাটতি তৈরি করেছে। 

 

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হেফাজতে থাকাবস্থায় বিপুল পরিমাণ ওষুধ কীভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ হলো, বিষয়টি তদন্ত করতে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

 

সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে প্রতিদিন সেবা নিতে আসেন হাজারো মানুষ। শুধু বহির্বিভাগেই ভিড় লেগে থাকে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। ভর্তি রোগীর সংখ্যা থাকে তিনশ থেকে পাঁচশর মধ্যে। এত মানুষ চিকিৎসা নিলেও তাদের অধিকাংশকেই প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। অথচ প্রতিবছর সরকারি অর্থে কোটি কোটি টাকার ওষুধ কেনা হয় এই হাসপাতালের জন্য। কিন্তু সেই ওষুধ রোগীদের হাতে পৌঁছায় না। ফলে রোগীরা যেমন ভোগান্তিতে পড়ছেন, তেমনি সরকারও পড়ছে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতিতে।

 

সম্প্রতি জানা গেছে, রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ না করার কারণে হাসপাতালের গুদামে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ টাকার ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। অর্থাৎ সরকারি অর্থ ব্যয় করে কেনা বিপুল পরিমাণ ওষুধ কাগজে-কলমে গুদামেই থেকে গেছে, রোগীদের কাজে লাগেনি একেবারেই।

 

এ বিষয়ে তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করতে সদর হাসপাতালে গেলে সংশ্লিষ্টদের কাছে স্পষ্ট জবাব মেলেনি। বরং নানা অজুহাত দেখিয়ে প্রতিবেদককে বিদায় করার চেষ্টা করা হয়েছে। 

 

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রফিকুল ইসলাম নিজেও এমন চেষ্টা করতে থাকলেন। ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. সুমন বণিকের অনুমতি ছাড়া কোনো ছবি নেওয়ার অনুমতি দেওয়া যাবে না বলে জানালেন তিনি। তবে তিনি স্বীকার করেছেন হাসপাতালের স্টোর রুমে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রয়েছে। 

 

হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. সুমন বণিক অফিসের কাজে ঢাকা থাকায় দায়িত্বে থাকা সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. বিষ্ণু প্রসাদ চন্দের কাছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের ছবি ও তথ্য চাইলে, তিনিও অপারগতা জানালেন।

 

পরে এই প্রতিবেদকের হাতে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে এবং এ নিয়ে অভ্যন্তরীণ সভা হয়েছে এমন তথ্য আছে জানানো হলে তিনি স্টোর রুম খুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে সহযোগিতা করেন। 

 

সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রফিকুল ইসলামের অফিসের পাশেই স্টোর রুমে পাওয়া যায় কার্টুনে কার্টুন মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বক্স। এসব বক্স ভর্তি ওষুধ। কোনোটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ৬ মাস আগে। আবার কোনোটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে। এসব ওষুধের ছবি তুলার সময় হঠাৎ স্টোর রুমে এসে হাজির হন আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রফিকুল ইসলাম। দায়িত্বে থাকা স্টোর কিপার রাজন দে’র কাছে জানতে চান, কার অনুমতি নিয়ে স্টোর রুমের তালা খোলা হয়েছে। স্টোর কিপার রাজন দে’র উত্তরে ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. বিষ্ণু প্রসাদ চন্দের কথা শুনে চলে যান আবাসিক মেডিকেল অফিসার।


এরপর হাসপাতালের পুরাতন ভবনের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে মিললো এরচেয়ে দ্বিগুণ  মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। এসব ওষুধের মেয়াদও এক বছর আগে থেকে দুইদিন আগেও কোন কোনটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। 


স্টোর কিপারের দায়িত্বে থাকা রাজন দে জানান, তিনি মূলত এনেসথেসিয়া  টেকনিশিয়ান (মেডিকেল টেকনিশিয়ান)। তিনি স্টোরের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। 


খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালের স্টোরের দায়িত্বে রাজন দে’সহ আরও ৭ জন রয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন সিনিয়র স্টাফ নার্স  সোহেল আহমেদ, আতিক আহমদ, মুবিন আনসারী, মেডিকেল টেকনিশিয়ান সাদেক আহমদ, রুম্মান মিয়া ও পিযুষ দেবনাথ। 


তবে হাসপাতালের স্টোর কিপার রুপম কুমার দাস জানালেন, তিনি চলতি বছরের মার্চ মাসে হাসপাতালে যোগদান করেছেন। তিনি হাসপাতালের আসার পর দায়িত্ব সমঝে দেওয়া হয় নি। তার দায়িত্ব পালন করছেন হাসপাতালের অন্য দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।


হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীরা বলছেন, হাসপাতালে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ভর্তি হলেও, বেশিরভাগ ঔষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে তাদের। জীবন রক্ষাকারী এসব ওষুধ দেওয়া হলে অতিরিক্ত টাকা খরচ ও বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হতো না তাদের।


সুনামগঞ্জ পৌর শহরের বড়পাড়ার বাসিন্দা হোসনে খা বলেন, হাড় ব্যাথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। হাসপাতাল থেকে দুই রকমের ওষুধ দিয়ে বলেছে তিনটি স্যালাইন বাইরের ফার্মেসী থেকে কিনে আনতে। পরে তিনশ’ টাকা দিয়ে তিনটি স্যালাইন কিনতে হয়েছে।

 

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার নীলপুর গ্রামের বাসিন্দা সাফতেরা বেগম বলেন, হাসপাতালে ভর্তি থেকেও বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। হাসপাতালে আসার পর একটি ক্যানুলা দিয়েছে। আর প্রতি ওয়াক্ত একটি করে প্যারাসিটামল দিচ্ছে। বাকী ১২শ’ টাকার ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়েছে।  

 

শান্তিগঞ্জ উপজেলার  পাগলা গ্রামের বাসিন্দা আবু হুরায়রা  বলেন, হাসপাতাল থেকে স্যালাইন কিনে আনতে বলেছে। আমরা বলেছি হাসপাতাল থেকে দিতে। তারা বলেছে হাসপাতালে নেই, বাইরে থেকে কিনতে হবে।

 

ফার্মেসি মালিক মুজাহিদুল ইসলাম মজনু নামের একজন বললেন, স্টোরে কোটি টাকার ওষুধের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। অবহেলিত একটি এলাকা সুনামগঞ্জ। এখানে প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড় হাজার রোগী আউটডোরে সেবা নেন। হাসপাতালে ভর্তি থেকেও সেবা নেন বহুরোগী। এতো এতো রোগী আসার পরেও কেনো কোটি কোটি টাকার ওষুধের মেয়াদোত্তীর্ণ হলো তা উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে খোঁজে বের করার দাবি জানাচ্ছি। 

 

ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. বিষ্ণু প্রসাদ চন্দ বলেন, এটি অস্বাভাবিক ঘটনা, এতো টাকার ওষুধ কিভাবে নষ্ট হলো, কিভাবে এলো প্রশ্ন রয়েছে। এবিষয়ে হাতপাতালের তত্ত্বাবধায়ক তদন্ত কমিটি  করেছেন। 


তিনি আরও বলেন, স্টোর কিপারকে এবিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, স্টোর কিপার জানিয়েছে, ‘স্টোরের এসব ওষুধের কোনো ডকুমেন্টস নেই। ডকুমেন্টস না থাকলে এগুলো স্টোরের বাইরে কিভাবে নেবে? এবিষয়টি তত্ত্বাবধায়কে জানানো হয়েছে। স্টোরের বাইরে ওষুধগুলো রোগীদের দেওয়ার জন্য কোনো নির্দেশ দেওয়া হয় নি।’ 

 

তার মতে (ডা. বিষ্ণু প্রসাদের মতে) এগুলো দেওয়া হলে রোগীদের উপকারে আসতো, নষ্টও হতো না এতোগুলো ওষুধ।হাসপাতালের স্টোর কিপার পদে একজন থাকলেও কেনো দায়িত্ব হস্তান্তর না করে  মেডিকেল টেকনেশিয়ান, সিনিয়র স্টাফ নার্স পদের ৭ জন দায়িত্ব পালন করছেন এবিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগের তত্ত্বাবধায়ক কাজের বিকেন্দ্রীকরণের জন্য ওদের (এই সাতজন) দায়িত্ব দিয়েছিলেন, এর বাইরে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

 

হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. সুমন বণিক বললেন, আগের তত্ত্বাবধায়ক বদলি ও নতুন তত্ত্বাবধায়ক যোগদান না করায় আমি ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্বে রয়েছি। ওষুধগুলো অনেক আগে কেনা হয়েছে। এবিষয়ে একটি কমিটি করা হয়েছে। এখন করণীয় বিষয়ে কমিটি সিদ্ধান্ত দেবে।

 

হাসপাতালের সদ্য বদলি (১০ আগস্ট’ ২০২৫) হওয়া তত্বাবধায়ক ডা. মাহবুবুর রহমান বললেন, মেয়াদোত্তীর্ণ যে ওষুধ নিয়ে কমিটি হয়েছে। সেগুলো ২০২৪’এর মে মাসে আমি যোগদানের সময় বুঝিয়ে দেওয়া হয় নি। আমি আসার আগে সেগুলো কেনা হয়েছিল। আমি দায়িত্ব নেবার পর নানা ঝামেলায় কাটাতে হয়েছে। আমি যখন ব্যবস্থা নেবার জন্য কমিটি করতে উদ্যোগ নিয়েছিলাম, তখনই আমার বদলির আদেশ হওয়ায়, এ নিয়ে আমি কিছুই করতে পারিনি।

 

এর আগের তত্বাবধায়ক (বর্তমানে স্বাস্থ্য বিভাগের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক) ডা. আনিসুর রহমানের সরকারি ও ব্যক্তিগত মোবাইলে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া না দেওয়ায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


শেয়ার করুনঃ

অনিয়ম-দুর্নীতি থেকে আরো পড়ুন

সুনামগঞ্জ জেলা হাসপাতাল, ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ