সিলেট হাম উপসর্গ নিয়ে এক শিশুর মৃত্যু
যাপিতজীবন
প্রকাশঃ ২৮ এপ্রিল, ২০২৫ ৯:৩৫ পূর্বাহ্ন
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌর শহরের নলজুর নদীর তীরে ৫০টি বেদে পরিবার বছরের পর বছর ধরে মানবেতর জীবনযাপন করে আসছে। কেউ ডিঙি নৌকায়, কেউ বা নদীর পাড়ে খুঁড়ে খুঁড়ে বাঁশের তাঁবু গেড়ে দিন কাটাচ্ছেন।
উন্নতির আশার বাণী তারা অনেক শুনেছে, কিন্তু বাস্তবে তাদের জীবন থেকে কষ্ট কোনোদিন কমেনি। এক বয়োজ্যেষ্ঠ বেদে আক্ষেপ করে বললেন, "অনেক আশার কথা শুনেছি। ভালো আছি শুনিয়ে শুধু শুধু ছবি তুলে কষ্ট বাড়াবেন না!"
হতদরিদ্র এই মানুষদের তৃষ্ণা মেটায় নদীর অপরিশোধিত পানি। বিদ্যুৎ নেই, তাই রাত কাটে আঁধো অন্ধকারের সাথে। নেই কোন স্যানিটেশন ব্যবস্থা। জীবিকা যেখানে কঠিন, তখনো তারা বাপদাদার পেশা আঁকড়ে বেঁচে আছেন—শিংগা লাগানো, সাপের খেলা দেখানো, বানরের খেলা এবং তাবিজ বিক্রি। কেউ কেউ হারিয়ে যাওয়া সোনার খোজে পুকুরে ডুব দেয়ার কাজ করেন।
তবে এখন আর আগের মতো গ্রামে সাপের খেলা কিংবা তাবিজের চাহিদা নেই। সাধারণ মানুষের মধ্যে যত বেশি কুসংস্কার দূর হচ্ছে, আয় কমছে বেদেদের। তবুও যুগের পর যুগ ধরে পৈতৃক পেশা ছাড়তে পারেননি তারা। আধুনিক শিক্ষার আলো তাদের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। ফলে নতুন প্রজন্মও থেকে যাচ্ছে অজ্ঞতা, স্বাস্থ্যহীনতা আর দারিদ্র্যের চক্রে আটকে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দিনের বেলা কেউ কেউ গ্রামে সাপের খেলা কিংবা তাবিজ বিক্রির চেষ্টা করছেন। বিকেলে ফিরে সামান্য আয়ে সাদা ভাত আর সামান্য সবজি দিয়ে খাবার খাচ্ছেন। মাছ-মাংসের স্বপ্ন তাদের কাছে দূরের কোনো বাস্তবতা। শিশুদের নিয়ে দুই বেলা সামান্য আহার জোগাড় করাই তাদের দিনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
১২ বছরের রহিমা নামের এক কিশোরী বলল, "মা দিনরাত কাজ করে দুইশ থেকে তিনশ টাকা রোজগার করে। বেশিরভাগ দিন সাদা ভাত আর সবজি ছাড়া কিছুই জোটে না। লেখাপড়ার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু খাবার না থাকলে স্কুলে যাব কিভাবে?"
বেদে নারী সাথী বেগম বললেন, "আমরা চাই না আমাদের সন্তানরাও এই জীবন পাক। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো জায়গা ছাড়া সন্তানদের পড়াশোনা করানো সম্ভব না। সরকার যদি মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই দিত, তাহলে হয়তো আমাদের সন্তানেরা ভিন্ন জীবন পেত।"
বেদে সম্প্রদায় বাংলাদেশের একটি প্রাচীন যাযাবর জনগোষ্ঠী, যাদের ইতিহাস শত শত বছর পেছনে গিয়ে পৌঁছে। তারা মূলত নদীভিত্তিক জীবনযাপন করে, নৌকায় বসবাস করে এবং স্থানান্তরিত হয়ে জীবিকা নির্বাহ করে।
সাপ ধরা, সাপের খেলা দেখানো, বানরের খেলা, শিংগা লাগানো, তাবিজ বিক্রি ছাড়াও তারা ভেষজ ওষুধ বিক্রি এবং ঝাড়ফুঁক প্রয়োগ করে যা গ্রামবাংলায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে।
বেদে সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা রয়েছে, যা "ঠার" নামে পরিচিত। এই ভাষার কোনো লিখিত রূপ নেই এবং এটি শুধুমাত্র মৌখিকভাবে ব্যবহৃত হয়।
ধর্মীয় দিক থেকে, বেদে সম্প্রদায়ের অধিকাংশ সদস্য মুসলমান, তবে তাদের ধর্মীয় আচরণে হিন্দু ও মুসলিম উভয় ধর্মের প্রভাব দেখা যায়। তারা পীরের অনুসারী, আবার কেউ কেউ মনসা বা বিষহরির ভক্ত।
সুমন মিয়া নামের একদন বেদে জানান, তারা অনেকদিন ধরে সরকারি সহায়তার জন্য আবেদন করে আসছেন, কিন্তু এখনো কোনো ঘর বা জমির বরাদ্দ পাননি।
নলজুর নদীর পাড়ের বেদে সম্প্রদায়ের সর্দার আজাদ আলী (৪৫) বললেন, "আমরা শুধু জগন্নাথপুরেই নই, দেশের নানা প্রান্তে এভাবেই খোলা আকাশের নিচে বসবাস করি। বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছি, কিন্তু আমাদের কেউ দেখে না।"
নলজুর নদী, জগন্নাথপুর, বেদে সম্প্রদায়,