২০ বছরেও নির্মাণ হয়নি সেতুর সংযোগ সড়ক
অনিয়ম-দুর্নীতি
প্রকাশঃ ২১ আগস্ট, ২০২৫ ৬:২৪ পূর্বাহ্ন
দৃষ্টিসীমায় পাহাড় আর স্বচ্ছ পানির নদী মধ্যে সাদা পাথরের স্তুপ ছিল– সিলেটের অন্যতম পর্যটকপ্রিয় স্পট সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জের ‘সাদা পাথর’ এর নান্দনিকতার উৎস। কিন্তু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এই স্থান থেকে দিনেদুপুরে শতশত কোটি টাকা মূল্যের পাথর লুটের ঘটনায় প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দেশব্যাপী চলছে তুলকালাম কাণ্ড।
আর এরই মধ্যে এই পাথর লুটের ঘটনায় প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুদকের এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সম্পদ লুটে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সুবিধাভোগী সরকারি দপ্তর, কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা ও সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ব্যবসায়ীদের তথ্য।
দুদকের এ প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই সিলেটের প্রশাসনে রদবদল হয়েছে– বদলী হয়েছেন সিলেটের ডেপুটি কমিশনার ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ বাকি কর্মকর্তারা রয়ে গেছেন বহাল তবিয়তে। আর রাজনীতিবিদরা চরম প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন এ প্রতিবেদনের বিষয়ে।
সিলেট ভয়েস এর হাতে আসা এ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে কীভাবে প্রশাসন, পুলিশ, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা মিলেমিশে দীর্ঘদিন ধরে লুট করেছেন রাষ্ট্রীয় পাথর সম্পদ, ধ্বংস করেছেন সিলেটের পরিবেশ।
গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরপরই সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাসহ সর্বত্র শুরু হয় পাথর লুটের মচ্ছব। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি আগস্ট মাসের গোড়া থেকেই পাথর লুটেরাদের চোখ পড়ে পর্যটন স্পট হিসেবে বিখ্যাত সাদা পাথরের দিকে। শুরু হয় দিনেদুপুরে চুরি।
আগস্টে ১০ তারিখ নাগাদ বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন তুললে কিছুটা নড়েচড়ে বসার ভান করেন প্রশাসন ও পুলিশ। এরই মধ্যে বেশ কিছু জাতীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়, সিলেটের জেলা প্রশাসক একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেন।
এরই মধ্যে ১৩ আগস্ট ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর পরিদর্শনে যান দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সিলেট সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রাফী মো. নাজমুস সা’দাৎ-এর নেতৃত্বে গঠিত ৫ সদস্যের একটি দল। তারপর ধারাবাহিক অনুসন্ধান শেষে সম্প্রতি একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন দুদক সদরদপ্তরে জমা দেয় জেলা কার্যালয়।
দুদক অভিযান পরিচালনা ও তদন্ত করে দেখতে পায় স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ইন্ধন ও সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করা হয়েছে। গতবছরের ৫ আগস্ট থেকে শুরু হয় এ লুট, গত তিন মাসে তা চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। সাদা পাথরের পর্যটন স্পট সংরক্ষিত এলাকা হওয়ার পরও এখান থেকে অন্তত ৮০ ভাগ পাথর অপসারণ করে লুট করা হয়েছে।
দুদকের প্রতিবেদনে প্রথমেই অভিযুক্ত করা হয়েছে খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোকে। এরপর আছেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী ও সিলেটের সদ্য বদলী হওয়া জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ।
এরপরেই অভিযুক্ত গতবছরের ১১ জুলাই থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা– আবিদা সুলতানা, ঊর্মি রায়, মোহাম্মদ আবুল হাছনাত ও আজিজুন্নাহার।
এরপরে অভিযুক্ত করা হয়েছে সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ও কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উজায়ের আল মাহমুদ আদনান। এছাড়াও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-কেও অভিযুক্ত করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি ও দপ্তরের পরেই তালিকায় আছেন ৪২ জন রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী। এছাড়াও কয়েকজন সাংবাদিক ও অন্যান্য পেশার ব্যক্তিবর্গ জড়িত আছেন উল্লেখ করে তা যাচাই বাছাই করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ৪২ জন রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীর মধ্যে আছেন বিএনপির সিলেট মহানগর কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগরীর আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম মো. ফখরুল ইসলাম, সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন, নবগঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপির সিলেট জেলার প্রধান সমন্বয়কারী নাজিম উদ্দিন ও মহানগরের প্রধান সমন্বয়কারী আবু সাদেক মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী।
প্রতিবেদনের প্রথমেই খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোকে দায়িত্বে অবহেলার কারণে অভিযুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খনি ও খনিজসম্পদ বিধিমালা ২০১২ এর বিধি ৯১ ও ৯৩ অনুযায়ী খনিজসম্পদ সমৃদ্ধ এলাকায় অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা ও অবৈধভাবে সম্পদ উত্তোলন করা যাবে না। কেউ করলে ব্যুরো তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা রাখে। কিন্তু সাদাপাথরে ধারাবাহিকভাবে লুটপাট চললেও ব্যুরো কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী রাষ্ট্রীয় সম্পদ নয় বরং পাথর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক ও রাজনৈতিক নেতাদের অবৈধ স্বার্থরক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন বলে প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে। প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয় গত ৮ জুলাই বিভাগীয় কমিশনারের সাথে পাথর ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও রাজনৈতিক নেতাদের বৈঠকের প্রসঙ্গ। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘সারা দেশে পাথর উত্তোলন করা গেলে সিলেটে যাবে না কেন? এর সঙ্গে মানুষের জীবন ও জীবিকা জড়িত।’ তার এ বক্তব্য সাদা পাথর লুটে উৎসাহ জুগিয়েছেন যেখানে পাথর উত্তোলন সরকারিভাবে নিষিদ্ধ।
দুদক সিলেটের সদ্যসাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদকে দায়ী করে উল্লেখ করে, সিলেট জেলায় অবস্থিত সাদাপাথর, জাফলং, বিছনাকান্দি ও উৎমাছড়া পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে স্বীকৃত। এ স্থান থেকে পাথর, বালি ও অন্যান্য খনিজসম্পদ উত্তোলন সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। সরকারি বিধি অনুযায়ী বিদ্যমান পর্যটন স্পটগুলোর নান্দনিক সৌন্দর্য বজার রাখাসহ পরিবেশ সংরক্ষণে যথাযথ উদ্যোগ বা কার্যক্রম গ্রহণ করা জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব।
প্রতিবেদনে উল্লেখ, পাথর লুটপাট ঠেকাতে শের মাহবুব মুরাদের সদিচ্ছার অভাব, অবহেলা, ব্যর্থতা ও নিষ্ক্রিয়তা স্পষ্ট। তিনি তার অধীন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনকে সাদাপাথর পর্যটন স্পট রক্ষায় সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। সাদাপাথর পর্যটন স্পটের বর্তমান অবস্থা একদিনে হয়নি। এটি বিগত ৭-৮ মাস ধরে চললেও জেলা প্রশাসক ও তার অধীন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে চরম ব্যর্থ হয়েছেন।
সিলেট জেলা পুলিশের সুপার মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ২৭ এপ্রিল অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন ও পরিবহণ বন্ধের জন্য পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিলেও সিলেট জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান আলোচ্য সাদা পাথর লুটপাটের বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।
প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যোগদানকারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সদ্যবিদায় নেয়া ইউএনওকে অভিযুক্ত করে বলা হয়েছে, গত এক বছরে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় বিশেষ করে সাদাপাথর পর্যটন এলাকায় দৃশ্যমানভাবে দিনে দুপুরে উপজেলা প্রশাসনের গোচরেই উক্ত পাথর লুটপাট হয়েছে। ওই সময়ে কোম্পানীগঞ্জে উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসাবে আজিজুন্নাহার, মোহাম্মদ আবুল হাছনাত, ঊর্মি রায় ও আবিদা সুলতানা কর্মরত ছিলেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা নামমাত্র ও লোক দেখানো কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া পাথর লুট বন্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।
কোম্পানীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ উজায়ের আল মাহমুদ আদনান সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনিসহ সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ সদস্যরা অবৈধ পাথর ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের কমিশন গ্রহণ করে সাদা পাথর লুটপাটে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অবৈধভাবে উত্তোলিত পাথর প্রতি ট্রাকে প্রায় ৫০০ ঘনফুট করে লোড করা হয়। পরিবহণ ভাড়া ছাড়া প্রতি ট্রাকের পাথরের দাম ধরা হয় ৯১ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রতি ট্রাক থেকে দশ হাজার টাকা পুলিশ ও প্রশাসনের জন্য আলাদা করা হয়। বাকি ৮১ হাজার টাকা অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকারীরা নিজেদের মাঝে বণ্টন করে নেয়। এছাড়া প্রতি ট্রাক থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে পুলিশের জন্য ৫ হাজার টাকা এবং উপজেলা প্রশাসনের জন্য ৫ হাজার টাকা বণ্টন হতো।
এছাড়াও অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন কাজে ব্যবহৃত প্রতিটি বারকি নৌকা হতে এক হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। যার মধ্যে পুলিশ বিভাগ পায় ৫০০ টাকা এবং প্রশাসন (ডিসি ও ইউএনও) পায় ৫০০ টাকা। পুলিশ নির্দিষ্ট সোর্সের মাধ্যমে প্রত্যেক ট্রাক ও নৌকা থেকে এসব চাঁদা বা অবৈধ অর্থ সংগ্রহ করে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে দুদক।
প্রতিবেদনে সাদা পাথর লুটে বর্ডার গার্ড বিজিবিকেও দায়ী করা হয়েছে। এতে বলা হয়, সাদা পাথর এলাকায় ৩টি বিজিবি পোস্ট রয়েছে। এগুলো হতে লুটের ঘটনাস্থলের দূরত্ব ৫০০ মিটার থেকেও কম। এত কম দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও কোম্পানি কমান্ডার ইকবাল হোসেনসহ বিজিবি সদস্যদের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ ও নিষ্ক্রিদ্ধয়তার কারণে অবৈধ পাথর উত্তোলনকারীরা খুব সহজেই পাথর লুটপাট করতে পেরেছে। বিজিবি সদস্যরা প্রতি নৌকা ৫০০ টাকার বিনিময়ে এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দেয় এবং পাথর উত্তোলনের সময় বাধা প্রদান করেননি।
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে দুদক আরো যাদের অভিযুক্ত করেছে তারা হলেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির পদ স্থগিতকৃত সভাপতি সাহাব উদ্দিন, সদস্য হাজি কামাল (পাথর ব্যবসায়ী), কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক সভাপতি ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান লাল মিয়া, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন ওরফে দুদু, সিলেট জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক রুবেল আহমেদ বাহার, সহসাংগঠনিক সম্পাদক মুসতাকিন আহমদ ফরহাদ।
এছাড়াও অভিযুক্ত হয়েছেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মো. দুলাল মিয়া ওরফে দুলা, যুগ্ম আহ্বায়ক রজন মিয়া, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা যুবদল নেতা জসিম উদ্দিন, সাজন মিয়া, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির কর্মী জাকির হোসেন, সদস্য মোজাফর আলী, মানিক মিয়া, সিলেট জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মকসুদ আহমদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম ওরফে শাহপরান, কোষাধ্যক্ষ (বহিষ্কৃত) শাহ আলম ওরফে স্বপন, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কাশেম এবং পূর্ব জাফলং ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আমজাদ বক্স।
তালিকায় রয়েছে আওয়ামী লীগের সাত নেতাকর্মীর নামও। তারা হলেন-কার্যক্রম নিষিদ্ধ সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের কর্মী বিলাল মিয়া, শাহাবুদ্দিন, গিয়াস উদ্দিন, কোম্পানীগঞ্জ আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবদুল ওদুদ আলফু, কর্মী মনির মিয়া, হাবিল মিয়া ও সাইদুর রহমান।
এছাড়া অনুসন্ধানে সাদা পাথর লুটের সঙ্গে অন্য আরও ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন-কোম্পানীগঞ্জ ভোলাগঞ্জের আনর আলী, উসমান খাঁ, ইকবাল হোসেন আরিফ, দেলোয়ার হোসেন জীবন, আরজান মিয়া, মো. জাকির, আলী আকবর, আলী আব্বাস, মো. জুয়েল, আলমগীর আলম ও মুকাররিম আহমেদ।
বুধবার জাতীয় দৈনিক সমকাল দুদকের প্রতিবেদন সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ প্রতিবেদনের মাধ্যমে দুদকের প্রতিবেদনে নাম থাকার বিষয় জানতে পেরে প্রতিবাদ জানিয়ে প্রেস ব্রিফিং করেছেন সিলেট মহানগর বিএনপির নেতৃবৃন্দ।
সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কয়েস লোদী বলেন, ‘পাথর লুটে প্রকৃত লুটেরাদের আড়াল করতেই আমাকে জড়ানো হয়েছে। যারা তালিকা করেছেন, তাদেরকেই আমার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করতে হবে। অন্যথায় ক্ষমা চাইতে হবে।
এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে আজ (বৃহস্পতিবার) সাড়ে ১২টায় সংবাদ সম্মেলন করবে জামায়াতে ইসলামীর সিলেট জেলা ও মহানগর শাখা। তবে তার আগে বুধবার বিকেলে গণমাধ্যমে সমকালের প্রতিবেদনের প্রতিবাদে একটি বিবৃতি প্রেরণ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জামায়াতের মহানগর আমীর ও সেক্রেটারির নাম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জড়ানো হয়েছে। এর সাথে জামায়াত নেতৃবৃন্দ দুরে থাক সাধারণ কোন কর্মী-সমর্থকের ন্যুনতম কোন সম্পর্ক নেই।
‘সরকারী ব্যবস্থাপনায় ও বৈধ পন্থায় পাথর কোয়ারি খুলে দেয়ার দাবিতে সিলেটের পরিবহন মালিক শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের একটি কর্মসূচিতে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সাথে জামায়াত নেতারাও বক্তব্য রাখেন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ঐ মানববন্ধনে বক্তব্য রাখা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বক্তব্য নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক রিপোর্ট প্রকাশ ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে,’ বিবৃতিতে উল্লেখ।
বিবৃতিতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পাথর লুটে জড়িত প্রকৃত আসামীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসার জোর দাবি জানান তারা।
এছাড়াও আজ বিকেল চারটায় একই বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন আহবান করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিলেট জেলা ও মহানগর কমিটি।
দুদকের প্রতিবেদনে নাম আসা এবং ৮ জুলাইয়ের বৈঠকে দেয়া বক্তব্যের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বুধবার বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী বলেন, ‘আমি সেখানে বলেছিলাম যে সারা দেশের পপাথর কোয়ারি্র মতো সিলেটের কোয়ারিও খুলে দেয়া যায় কি না সে বিষয়টি গবেষণা করা যেতে পারে। কিন্তু আমার এ বক্তব্য কেউ টুইস্ট করলে তা আমার দায় না।’
এদিকে উদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্যেই গত ১৮ আগস্ট বদলী করা হয় সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদকে। তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। বুধবার দুপুরে তিনি তার কার্যালয় শেষবারের মতো ত্যাগ করেন।
তার স্থলাভিষিক্ত হওয়া খ্যাতনামা কর্মকর্তা সারোয়ার আলম সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগ দিতে বুধবার রাতে সিলেট এসেছেন। আজ বৃহস্পতিবার সকালে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
এদিকে গত ১২ আগস্ট সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদ্মাসন সিংহকে প্রধান করে গঠিত তিন সদস্যের কমিটি বুধবার তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ৭ পাতার এই প্রতিবেদনে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও ব্যক্তির সাদা পাথর লুটের সাথে জড়িত থাকার বিষয় উল্লেখ করে ১০টি সুপারিশ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পদ্মাসন সিংহ।
সাদাপাথর লুট কান্ডে অবশেষে উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বিভাগের সমন্বয় ও সংস্কার শাখার সচিব জাহেদা পারভিনকে প্রধান করে বুধবার কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির অন্য ৪ সদস্য হলেন-জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার একজন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার একজন, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার একজন ও সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) দেবজিৎ সিংহ। এর মধ্যে দেবজিৎ সিংহ তদন্ত কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।
কমিটি অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের ঘটনায় কোনো কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব অবহেলা ছিল কিনা তা নিরূপণ করে এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সুপারিশ সহ আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সিলেট, সাদাপাথর, ভোলাগঞ্জ, তদন্ত কমিটি, দুর্নীতি দমন কমিশন, দুদক, প্রতিবেদন, বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি