১৫ জুন ২০২৬

সংগ্রাম-স্বাধীনতা / জুলাই গণঅভ্যুত্থান

সাংবাদিক তুরাব হত্যার ১ বছর

ফিরেছে ১৯ জুলাই, তুরাবের স্মৃতি জাগরুক স্বজন-সহকর্মীদের মনে

বিলম্বিত বিচার, ১৮ আসামীর মধ্যে গ্রেপ্তার ২, এখনো প্রস্তুত নয় চার্জশিট, দ্রুত বিচারের দাবি পরিবারের

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ১৯ জুলাই, ২০২৫ ১:৪১ অপরাহ্ন


শহীদ সাংবাদিক আবু তাহের মো. তুরাবের রক্তে ভেজা সেই ১৯ জুলাই আজ আবারও ফিরে এসেছে। কিন্তু আর ফিরবেন না তুরাব। ক্যালেন্ডারে এক বছর ঘুরে এলেও থেমে আছে তুরাবের বিচারের অগ্রগতি। এক বছরে গ্রেপ্তার মাত্র দুজন, প্রস্তুত হয়নি চার্জশিট, বিচার এখনো অধরা।


গত বছরের এই দিনে কোটাবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল ছিল সারাদেশ। জুমার নামাজের পর সিলেট শহরের বন্দরবাজার এলাকায় বিএনপির ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল বের করেন। শান্তিপূর্ণ মিছিলের পিছন থেকে গুলি ছুড়ে পুলিশ। 


এসময় সড়ক বিভাজকের উপরে দাড়িয়ে ছবি তুলছিলেন দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট ব্যুরো প্রধান তুরাব। পরনে ছিল প্রেস লেখা ভেস্ট। তারপরও পুলিশ গুলি ছুড়ে, শটগানের ছররা গুলি লাগে তুরাবের মুখে-গায়ে। রক্তাক্ত তুরাব লুটিয়ে পড়েন মাটিতে।


ঘটনাস্থলে থাকা সহকর্মী কালের কন্ঠের আলোকচিত্র সাংবাদিক ও বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন সিলেট বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক আশকার ইবনে আমিন লস্কর রাব্বি, মানবজমিনের আলোকচিত্র সাংবাদিক মাহমুদ হোসেন, শ্যামল সিলেটের আলোকচিত্র সাংবাদিক আজমল আলী সম্প্রতি সিলেট ভয়েসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে রোমন্থন করেন সেদিনের স্মৃতি।


আমিন রাব্বি বলেন, ‘সেদিন কালেক্টরেট মসজিদে জুমার নামাজ পরে বের হয়েছি, মসজিদের সামনে ছিল তুরাব। তখন মিনিটখানেক আলাপ হয়, এর মধ্যে মিছিল শুরু হয়, পুলিশও আসে। আমরা রোড ডিভাইডারের উপর দাড়িয়ে ছবি তুলছিলাম দুজনেই। মিছিলের দুই-তৃতীয়াংশ চলে গেলো, আমি রাস্তার সাইডে চলে গেলাম। তখনই গুলির তিনটি আওয়াজ শুনলাম। এমন সময় তুরাব আমার উপরে এসে পড়ে বলে– ‘ভাই আমারে বাঁচান, আমার চোখে লাগছে।’


তিনি বলেন, ‘আহত তুরাবকে রিক্সায় তুললাম একটা, সহকর্মী মোহিত নিজে রিক্সা চালিয়ে সামনে এগুলো, তারপর একটা সিএনজি-অটোরিক্সা পেলাম। তখনও তুরাব বলছে সে ঠিক আছে, মেডিকেল যেতে পারবে। আমরা ভেবেছি মাথায় একদুইটা লেগেছে, শরীরে এতগুলো স্প্লিন্টার লেগেছে ভাবতেও পারিনি।’ 


তিনি বলেন, ‘ঘন্টাখানেক পর সহকর্মী রেজা রুবেল কল দিয়ে জানায় তুরাবের রক্ত লাগবে, সে জানায় যে শতাধিক স্লিন্টার লেগেছে গায়ে। পরে ওসমানী থেকে তাকে ইবনে সিনায় নেয়া হয়। অন্য কাজ শেষ করে হাসপাতালে যাওয়ার আগেই জানতে পারি তুরাব মারা গেছে।’


আজমল আলী বলেন, ‘আন্দোলনের শুরু থেকেই প্রায়সময়ই তুরাব আমাকে কল দিতো, আন্দোলন যখন তুঙ্গে, ১৫ জুলাই, তখন থেকে সে খুব অ্যাকটিভলি কাজ করছিলো। এর মধ্যে ১৮ জুলাই পায়ে গুলি খাওয়ার পর সবাই তাকে সতর্ক থাকতে বলেছিলো। কিন্তু তারও হায়াত ছিল না, পরদিনই পুলিশের গুলিতে সে মারা যায়।’


মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দেশের সাংবাদিকদের জন্য একটি কালো অধ্যায়। শুক্রবার জুমার পর আন্দোলনের মিছিলের পিছন থেকে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়, আমার ভাই তুরাব গুলি লেগে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। সেখান থেকে ধরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। সেখান থেকে ইবনে সিনায় আইসিইউতে, পরে শাহাদত বরণ করেন।’


তুরাবের মৃত্যুর পর তার ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. শামসুল ইসলাম জানান, ‘তার শরীরে ৯৮টি ছররা গুলির চিহ্ন ছিল, লিভার ও ফুসফুস ছিদ্র হয়ে গিয়েছিল, মাথাতেও ছিল গুরুতর আঘাত।’


নিহত হওয়ার মাত্র তিন মাস আগেই লন্ডনপ্রবাসী তানিয়া ইসলামকে বিয়ে করেছিলেন তুরাব। যুক্তরাজ্যে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কিন্তু রক্তাক্ত ১৯ জুলাইয়ে সেই সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। দাফনের আগে স্ত্রীর দেখা হয়নি শেষ বিদায়টাও, একদিকে বন্ধ ছিল ইন্টারনেট, অন্যদিকে বিদেশ থেকে দেশে আসা তখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছিলো।


তুরাব হত্যার এক মাস পর গতবছরের ১৯ আগস্ট সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল মোমেনের আদালতে মামলা দায়ের করেন তার ভাই আবুল আহসান মোহাম্মদ আজরফ (জাবুর)।


মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখসহ দুই থেকে ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়। প্রাথমিকভাবে পুলিশ তদন্ত করে, পরে অক্টোবরে মামলাটি পিবিআইতে এবং তারপর মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রেরণ করা হয়।


এ মামলার নামোল্লেখ করা ১৮ আসামীর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন শুধুমাত্র দুইজন– সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের তৎকালীন এডিসি সাদেক কাউসার দস্তগীর ও পুলিশ কনস্টেবল উজ্জ্বল সিংহ।


তুরাবের মা মমতাজ বেগম বলেন, ‘তুরাব ছিল আমার নাড়িছেঁড়া ধন। এক মুহূর্তও ভুলিনি। জীবিত থাকতে ছেলের হত্যার বিচার দেখে যেতে চাই।’


তুরাবের ভাই আবুল আহসান মোহাম্মদ আজরফ (জাবুর) বলেন, ‘আমার ভাইয়ের জায়গা কেউ নিতে পারবে না। প্রকাশ্যে একজন সাংবাদিককে গুলি করে হত্যার বিচার এক বছরেও হয়নি—এটাই আমাদের হতাশ করছে।’


আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তা শাহ আলম জানিয়েছেন, ‘তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। ২০ জুলাই দুই আসামিকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাইব। আগস্টের মাঝামাঝি চার্জশিট জমা দিতে পারব বলে আশা করছি।”


শেয়ার করুনঃ

সংগ্রাম-স্বাধীনতা থেকে আরো পড়ুন

সিলেট, সাংবাদিক, তুরাব হত্যা, শহীদ সাংবাদিক এটিএম তুরাব, বিচার, জুলাই অভ্যুত্থান

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ