বৈশাখ-জৈষ্ঠ মাসে আকাশ অন্ধকার হয়ে আসার পর দূরে গর্জে ওঠা বজ্রধ্বনি যখন শোনা যায়, তখন মাঠে বা হাওরে কাজ করা কৃষক ও জেলেরা বুঝতে পারেন বজ্রপাত হবে। বাংলাদেশে বজ্রপাত অন্যতম মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা প্রতি বছর শত শত মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়।


২০১৬ সালেই বজ্রপাতের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে সরকার একে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘোষণা করে এবং মৃত্যুহার কমাতে নানা পদক্ষেপ নেয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনও আরও অনেক কিছু করার সুযোগ আছে।


বাংলাদেশ চাইলে এশিয়ার অন্যান্য দেশের সফল অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বজ্রপাতজনিত মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। এসব দেশে নীতিমালা পরিবর্তন, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার এবং জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে মৃত্যুহার কমেছে।


এশিয়ার ভালো উদাহরণ থেকে শেখা


সিঙ্গাপুর—একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্র যেটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতপ্রবণ দেশগুলোর একটি। তারা উন্নত প্রযুক্তি ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যবহার করে বজ্রপাত নিরাপত্তায় বিশ্বে রোলমডেলে পরিণত হয়েছে।


সিঙ্গাপুরের ‘ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট এজেন্সি (এনইএ)’ একটি রিয়েল-টাইম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু করেছে, যা মোবাইল অ্যাপ ও পাবলিক সাইনেজের মাধ্যমে মানুষকে সতর্ক করে।


এনইএ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ব্যবস্থার ফলে বজ্রপাতজনিত মৃত্যু প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে, যা প্রমাণ করে যে আগাম সতর্কতা কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে।


আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ‘দামিনী’ নামে একটি অ্যাপ চালু করেছে, যা কোটি কোটি গ্রামবাসীকে রিয়েল-টাইম বজ্রপাত সতর্কবার্তা পাঠাতে সক্ষত এবং এটির মাধ্যমে তারা ঝড়ের সময় নিরাপদে থাকতে পারছে।


লাইটনিং রেসিলিয়েন্ট ইন্ডিয়া ক্যাম্পেইন–এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বজ্রপাতের ঘটনা ৫৭ শতাংশ বাড়লেও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মৃত্যুহার ২২ শতাংশ কমে এসেছে। তবে মানুষের মধ্যে সচেতনতার হার কম হওয়ায় এখনো বজ্রপাতে আধুনিক প্রযুক্তির সুফল ভোগ করতে পারছে না দেশটি।


এছাড়াও, নেপাল, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড আগাম বজ্রপাত পূর্বাভাস প্রযুক্তি চালু করে, জনগণকে সচেতন করে এবং জাতীয় নীতিমালায় এ সংক্রান্ত বিভিন্ন পদক্ষেপ যুক্ত করে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।


বাংলাদেশের বজ্রপাত মোকাবেলার প্রচেষ্টা


২০১৬ সালে বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করার পর বাংলাদেশ সরকার ঝুঁকি হ্রাসে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করে।


দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর (ডিডিএম) ২০১৭ সালে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়, যার আওতায় গ্রামীণ এলাকায় লাখ লাখ তাল গাছ রোপণ শুরু হয়, কারণ ঐতিহাসিকভাবে এগুলো প্রাকৃতিক লাইটনিং অ্যারেস্টার হিসেবে কাজ করেছে।


তবে গাছগুলোর সঠিক পরিচর্যা না হওয়ায় অনেক গাছ মারা যাওয়ায় সমালোচনা সৃষ্টি হয়। ২০২২ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সাবেক প্রতিমন্ত্রী প্রকল্পটি বাতিলের ঘোষণা দেন।


তবুও, ডিডিএম কর্মকর্তারা জানান, তালগাছ রোপণ তাদের নিয়মিত কার্যক্রম হিসেবে এখনও চলমান রয়েছে, এবং এটি বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর একটি উপায়।


ডিডিএম বর্তমানে সিলেট বিভাগের চারটিসহ দেশের ১৫টি বজ্রপাতপ্রবণ জেলায় ৬,৭৯৩টি বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্র (লাইটনিং অ্যারেস্টার) স্থাপন ও ৩,৩৯৮টি বজ্রপাত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বলে কর্মকর্তারা জানান।


এদিকে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) আরও ১,৪০০টি লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করছে ১৪ জেলায়, যার মধ্যে সাতটি জেলা ডিডিএম-এর আওতায়ও রয়েছে।


এলজিইডির প্রকল্প পরিচালক অরুণ কুমার চৌধুরী বলেন, “ডিডিএমের কাজের সঙ্গে যাতে ওভারল্যাপ না হয়, তাই আমরা খোলা জায়গায় লাইটনিং অ্যারেস্টার বসাচ্ছি না। বরং আমরা এগুলো বসাচ্ছি নতুন নির্মিত ৪৫০টি আশ্রয়কেন্দ্র, ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স, হাসপাতাল ও গ্রামীণ বাজারে, যেখানে মানুষ বেশি জড়ো হয়।”


বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি নিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি)। যুক্তরাষ্ট্রের নাসা-এর সঙ্গে যৌথভাবে তারা ‘হাই-ইমপ্যাক্ট ওয়েদার এসেসমেন্ট টুলকিট (হাইওয়াট)’ নামের একটি আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করেছে।


বিএমডি’র স্টর্ম ওয়ার্নিং সেন্টারের উপপরিচালক ড. মো. শামীম হাসান ভূইয়া বলেন, “এই উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন আমরা বজ্রপাতের সম্ভাব্য স্থান ৩০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে পূর্বাভাস দিতে পারি এবং বজ্রপাত হওয়ার প্রায় ৩০ মিনিট আগেই সতর্কবার্তা পাঠানো সম্ভব।”


বজ্রপাত এবং বাস্তবতা


২০১৬ সাল থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বজ্রপাতজনিত মৃত্যুর হার কমেনি, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বজ্রপাত বাড়ায় মৃত্যুও বাড়ছে।


বজ্রপাত হল এক ধরনের বৈদ্যুতিক স্রোতের বিস্ফোরণ, যা বজ্রপাতমুখী মেঘ ও ভূমির মধ্যে বা মেঘের অভ্যন্তরে চার্জের ভারসাম্যহীনতার ফলে ঘটে।


‘জিআইএস-বেজড স্পাটিয়াল এনালাইসিস ফর লাইটনিং সিনারিও ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়, অধিকাংশ বজ্রপাত মৃত্যুর ঘটনা ঘটে প্রাক-বর্ষা ও বর্ষা মৌসুমে। দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত।


২০১৯ সাল থেকে বজ্রপাত সম্পর্কিত মৃত্যু পর্যবেক্ষণকারী বেসরকারি সংস্থা ‘সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম’ জানায়, ২০১৯-২০২৩ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতে ১,৩২২ জন নিহত হয়েছে, যা বছরে গড়ে ২৬৪ জন।


গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বজ্রপাতে মারা গেছেন ২৯৭ জন, যাদের মধ্যে ৩৪ জন শিশু-কিশোর এবং আহত হয়েছেন ৪৬০ জন। এর মধ্যে ১৫২ জন (৪৮.৮২ শতাংশ) মাঠে কাজ করার সময় মারা যান, যা গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের ঝুঁকির ভয়াবহতা তুলে ধরে।


বাংলাদেশের করণীয় কী?


সিঙ্গাপুর, ভারত ও মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়। বিশেষ করে একটি জাতীয় রিয়েল-টাইম বজ্রপাত সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।


বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এম এ ফারুক বলেন, “বজ্রপাত এমন একটি দুর্যোগ, যা আমরা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। তবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব।”


তিনি তালগাছ রোপণকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে ইতিবাচকভাবে দেখেন এবং সাথে সুপারিশ করেন সুপারি গাছ রোপণেরও, যা প্রাকৃতিক প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।


এছাড়া, তিনি স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি নীতিমালার অংশ হিসেবে সতর্কতা ব্যবস্থা, আশ্রয়কেন্দ্র এবং উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।


বিএমডি’র ড. শামীম হাসান ভূঁইয়া বলেন, “আমাদের প্রযুক্তি এখন মানুষকে কমপক্ষে ৩০ মিনিট আগে সতর্ক করতে পারছে। এখন আমাদের দরকার কার্যকরভাবে এই বার্তাগুলো মানুষের কাছে পৌঁছানো।”


তিনি আরও জানান, “সম্প্রতি আমরা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও টেলিকম অপারেটরদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেছি, যেখানে আলোচনা হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মোবাইল টাওয়ার ব্যবহার করে ভয়েস কলের মাধ্যমে বার্তা পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে। এতে করে শত শত প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।”


তিনি বলেন, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)-এর সহযোগিতায় বিএমডি জনগণকে সচেতন করতে বেশ কিছু প্রচার উপকরণ তৈরি করেছে, যেগুলো এখন বিতরণের জন্য প্রস্তুত।


সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম এর সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা জানান, সম্প্রতি তারা সরকারকে মৃত্যুহার কমাতে পাঁচ দফা পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।


তারা যে প্রধান প্রস্তাবনা দিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে স্কুল পাঠ্যবইয়ে বজ্রপাত নিরাপত্তা বিষয়ে বাধ্যতামূলক অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা, সরকারি মাধ্যমে বজ্রপাত পূর্বাভাস প্রচার, যা এখন ৩০ মিনিট আগেই পাওয়া যাচ্ছে।


এছাড়াও কৃষক ও সাধারণ জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বৈঠক ও সেমিনারের আয়োজন, খোলা মাঠে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং বজ্রপাতে আহতদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান করার আহ্বান জানানো হয়েছে।


শেয়ার করুনঃ

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ থেকে আরো পড়ুন

বজ্রপাত, করণীয়, সমস্যা, সমাধান সাংবাদিকতা, সলিউশনস জার্নালিজম,