হাওরে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদনের আশা
কৃষি
প্রকাশঃ ২০ জুন, ২০২৫ ৮:৪৭ অপরাহ্ন
ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার হাঁটুভাঙা গ্রামের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম রেখন। গরুর খামার, ঠিকাদারি আর পাথরের ব্যবসা একের পর এক চেষ্টার পরও মিলছিল না সাফল্য। ২০১৩ সালে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে তাঁর ব্যবসা। তবে থেমে থাকেননি। হাল না ছেড়ে নতুন করে পথ খুঁজে নেন। সেই পথেই এসেছেন সফলতার চূড়ায়। পেয়েছেন ‘কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (এআইপি)’ জাতীয় সম্মাননা।
ব্যবসায়িক ব্যর্থতার পর ফিরে যান গ্রামের বাড়িতে। তখনই কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু। টিলা ও সমতল মিলিয়ে ১০ একর জমির গাছ কেটে শুরু করেন ফলের চাষ। প্রথমদিকে আশানুরূপ ফল না মিললেও এখন প্রতিবছর দেড় কোটি টাকার বেশি আয় করেন তিনি।
বর্তমানে তাঁর বাগানে রয়েছে ৩ হাজার মাল্টা গাছ, ২০ হাজার আনারস, ১ হাজার আমগাছ, ৪০টি ভিয়েতনামি নারকেলগাছসহ ড্রাগন, সফেদা, কুল বরই, লিচু, খেজুর, কাঁঠালসহ নানা ফলজ গাছ। এছাড়া বাড়িতেই গড়ে তুলেছেন ১০ হাজার লেয়ার ও ৫ হাজার ব্রয়লার মোরগের খামার।
সিরাজুল বলেন, ‘শুরুতে সবাই পাগল বলতো। স্ত্রী-সন্তানও সমর্থন করেনি। এখন সবাই আমাকে আইডল মনে করে।’ তাঁর এক ছেলে বাগান দেখাশোনা করেন। প্রবাসে থাকা বাকি তিন ছেলের ইচ্ছা, দেশে ফিরে বাবার গড়া বাগানেই কাজ করবেন।
২০১৭ সালে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি গাছ কেটে ফলচাষ শুরু করেন সিরাজুল। স্থানীয় কৃষি অফিসের সহায়তায় ২০১৮ সালে রোপণ করেন বারি মাল্টা-১ জাতের দেড় হাজার গাছ। ২০২০ সালে প্রথম ফল আসে। ২০২১ সালে প্রথম মৌসুমেই সাত লাখ টাকার মাল্টা বিক্রি করে আশার আলো দেখেন তিনি।
এখন প্রতিবছর মাল্টা থেকে ১৫-২০ লাখ টাকা, আনারস থেকে প্রায় ৮০ লাখ টাকা আয় হয়। পাশাপাশি আম, নারকেল, ড্রাগন, কাঁঠাল ও অন্যান্য ফসল থেকে আরও ২০-৩০ লাখ টাকা আয় করেন তিনি। ফলের পাশাপাশি সবজির চাষ করেও লাভবান হয়েছেন।
বর্তমানে তাঁর বাগানে ১০ জন শ্রমিক কাজ করেন। প্রতিদিন ৫০০ টাকা মজুরিতে তাঁরা গাছ পরিচর্যা, ছাঁটাই, ওষুধ প্রয়োগসহ নানা কাজ করেন। মোরগের খামার থেকে উৎপন্ন জৈবসার গাছের গোড়ায় ব্যবহার করেন তিনি।
সিরাজুলের সফলতা দেখে এলাকায় তিনি পরিচিত হয়েছেন ‘মাল্টা চাষি সিরাজ’ নামে। মৌসুমে প্রতিদিন তাঁর বাড়ি থেকে ৩০০-৪০০ কেজি মাল্টা বিক্রি হয়। কৃষি দপ্তরের সহযোগিতায় তিনি পেয়েছেন ট্রাক্টর, সার ও বীজসহ নানা সহায়তা।
সিলেট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তফা ইকবাল আজাদ বলেন, ‘সিরাজুল আমাদের গর্ব। তাঁকে সহায়তা করা মানেই দেশের কৃষিকে এগিয়ে নেওয়া।’
সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে থেকেই উদ্যোক্তা হওয়া সম্ভব। এক ইঞ্চি জমিও যেন পতিত না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে মাল্টা চাষের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কৃষি উদ্যোক্তা হতে খুব বেশি কিছু লাগে না। পরিশ্রম আর ধৈর্য থাকলেই সফলতা ধরা দেবে।’
মাল্টা চাষি সিরাজ, সিরাজুল ইসলাম রেখন, ফেঞ্চুগঞ্জ কৃষক, এআইপি কৃষি সম্মাননা, সিলেট মাল্টা চাষ