০২ মে ২০২৬

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ / জীববৈচিত্র

হাওরে দেশি মাছ কমছে, হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি ঝুঁকিতে

প্রতিনিধি, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ১৩ জুন, ২০২৫ ৮:৫৪ অপরাহ্ন


মৎস্য, পাথর ও ধান—এই তিনটি উপার্জনের খাত ঘিরেই আবর্তিত হয় সুনামগঞ্জের জীবন ও অর্থনীতি। জেলার বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চল মাছের অন্যতম প্রধান উৎস। প্রতিবছর হাওর ও পুকুর মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার মাছ উৎপন্ন হয়। ধান কাটার পর হাওরের পানিতে দেশি মাছের প্রাচুর্য দেখা যায়, যা কৃষক ও জেলেদের জীবিকার মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশি মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মৎস্য বিভাগ এবং স্থানীয় জেলে ও চাষিদের মতে, এর প্রধান কারণ অবাধে কারেন্ট জালসহ নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ না রাখা এবং কৃষি জমিতে রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার। এসব কারণে মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং মাছের উৎস সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

সুনামগঞ্জ জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ১৩৭টি হাওর, ২৬টি নদী এবং ২০,৭৬৯টি পুকুর রয়েছে। এর মধ্যে ২০,২৪৯টি পুকুরে নিয়মিত মাছ চাষ হয়। নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ৭৪৩ জন। চলতি অর্থবছরে জেলার মাছের বাজারমূল্য ১,৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছে জেলা মৎস্য বিভাগ, যদিও গত বছরের তুলনায় এটি কিছুটা কম।

মৎস্য বিভাগ আরও জানিয়েছে, সুনামগঞ্জের হাওর ও জলাশয় থেকে বছরে প্রায় ৩৮ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপন্ন হয়। এখান থেকে মোট ১২৬ প্রজাতির দেশি মাছ পাওয়া যায়। তবে জেলেরা বলছেন, অনেক দেশি মাছ এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না।

দোয়ারাবাজার উপজেলার জালালপুর গ্রামের জেলে শান্ত মিয়া বলেন, 'আগে টেংরা, শিং, বাইম এসব মাছ হাওরে প্রচুর ছিল। এখন কারেন্ট জালের কারণে এসব মাছ দেখা যায় না।'

দিরাই উপজেলার চন্ডিপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম জানান, 'কারেন্ট জালের কারণে প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। মাছ নেই মানে আমাদের আয়ও নেই। সরকার দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিপদ ঘনাবে।'

জামালগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর গ্রামের রফিক মিয়া বলেন, 'ধান কাটার পর মাছ ধরা আমাদের প্রধান আয়ের উৎস। কিন্তু দেশি মাছের প্রজাতি কমে যাওয়ায় রোজগারও কমে যাচ্ছে।'

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বুড়িস্থল গ্রামের জেলে মুকুল হোসেন বলেন, 'এখন এমন জাল পাওয়া যায় যেটা দিয়ে পোনাসহ সব মাছ ধরা যায়। সরকার কঠোর আইন প্রয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিলে আমরা পরিবেশবান্ধবভাবে মাছ ধরতে পারি।'

বাজারেও দেশি মাছের সংকট চোখে পড়ছে। এক কেজি টেংরা, শোল, গজার জাতীয় দেশি মাছের দাম এখন ৫০০ থেকে ৭৫০ টাকা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ১২০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়।

শহরের আরপিননগরের ক্রেতা রুমেল হাসান বলেন, 'চাষের মাছ বেশি, দেশি মাছ কম। দাম বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে কেনা কঠিন।'

স্থানীয় এনজিওকর্মী শারমিন আক্তার বলেন, 'স্বাস্থ্যসম্মত বলে আমরা দেশি মাছ কিনতে চাই। তবে দাম একটু কম হলে ভালো হয়।'

‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন, সুনামগঞ্জ’ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, 'সরকার সব সময় প্রণোদনার কথা বলে, কিন্তু কার্যত তা বাস্তবায়ন হয় না বা হয় সামান্য। মাছ এখন হাওরের দ্বিতীয় ফসল। এটি রক্ষা করতে হলে কঠোর পদক্ষেপ ও সচেতনতা জরুরি।'

তিনি আরও বলেন, 'ইজারাপ্রাপ্তরা নিয়ম মানছেন কি না, তা তদারকি দরকার। হাওরের স্থায়ী বাঁধে মাছ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। পরিকল্পনায় স্থানীয়দের যুক্ত না করলে সুনামগঞ্জের মৎস্য অর্থনীতি বিপন্ন হবে।'

সুনামগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শামশুল করিম বলেন, 'জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হাওরে পলি জমে গভীরতা কমে যাচ্ছে। এতে মাছের প্রজনন ব্যাহত হয়। খনন কাজ করা গেলে মাছের উৎপাদন বাড়বে।'

তিনি জানান, জেলেদের বিকল্প আয়ের সুযোগ, প্রশিক্ষণ, অভয়াশ্রম গঠন, উন্নত জাতের পোনা ছাড়া ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এসব উদ্যোগ সফল করতে স্থানীয়দের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।

এ ব‍্যাপারে সিলেট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সীমা রানী বিশ্বাস জানান, 'প্রজনন মৌসুমে মা মাছ ও পোনা ধরা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। বাংলাদেশ মৎস্য আইনে এটি নিষিদ্ধ এবং আইন অমান্যকারীর বিরুদ্ধে জেল ও জরিমানার বিধান রয়েছে। পোনা যেই ধরুক না কেন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।'

তিনি বলেন, 'হাওরে গভীর পানি না থাকার কারণে পোনা ছাড়লেও তার প্রজননে ব্যাঘাত ঘটে। দেশি মাছ রক্ষায় সরকারি প্রকল্প গ্রহণ, বিল ইজারা না দিয়ে উন্মুক্ত রাখা, অভয়াশ্রম ঘোষণা এবং মা মাছ রক্ষা জরুরি। মৎস্যজীবীদের সচেতন করতে হবে এবং সবাইকে মৎস্য আইন মানতে হবে।'


শেয়ার করুনঃ

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ থেকে আরো পড়ুন

সুনামগঞ্জ মাছ উৎপাদন, দেশি মাছ সংকট, কারেন্ট জাল, হাওর মাছ, মৎস্য আইন, প্রজনন মৌসুম

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ