বানিয়াচংয়ে গণভোট-জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে ১১ দলীয় জোটের গণমিছিল
সংগ্রাম-স্বাধীনতা
প্রকাশঃ ৫ আগস্ট, ২০২৬ ৮:৪৫ অপরাহ্ন
কারফিউ উপেক্ষা করে রাজপথে মানুষের ঢল। শহরের রাস্তায় রাস্তায় কাঁটাতারের ব্যারিকেড, অস্ত্রসজ্জিত সাঁজোয়া যান। কোথাও গুলির শব্দ, কোথাও বা বিস্ফোরণের আওয়াজ। তবু থামেনি মানুষ। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান চেয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সিলেটসহ পুরো দেশের বিভিন্ন রাজপথে নেমে এসেছিলেন ছাত্র জনতা। সবার মুখে তখন একটাই দাবি ‘সরকারের পদত্যাগ চাই।’
সেদিন সিলেটে ছিল গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। চলমান আন্দোলনে নানা বাধা উপেক্ষা করে চৌহাট্টার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হতে থাকেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মুরারিচাঁদ কলেজ, সরকারি কলেজ, মদন মোহন কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেন শিক্ষক, শ্রমিক, চাকরিজীবী, অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজার হাজার সাধারণ মানুষ।
একদিকে বৃষ্টি, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাঁধা। সবকিছু উপেক্ষা করে আন্দোলনের পরিধি ছড়িয়ে পড়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায়।
৫ আগস্ট সকাল পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের কারফিউ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া অবস্থানে নগরীর পরিস্থিতি ছিল থমথমে।
তবে এই দিনের গল্প শুরু হয়েছিল এরও প্রায় দুই মাস আগে। ২০২৪ সালের ৫ জুন সরকারি চাকরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালের পক্ষে হাইকোর্টের রায়ের পর রাজধানী ঢাকাতে নতুন করে আন্দোলনে নামেন চাকুরিপ্রত্যাশী ও শিক্ষার্থীরা। শাহবাগ থেকে শুরু হওয়া কর্মসূচি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
আন্দোলনের ১১ দিনের মাথায়, ১৬ জুলাই, পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যু এবং আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, সংঘর্ষ, গুলি, গ্রেপ্তার ও প্রাণহানির ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দেশের সর্বত্র। কোটা সংস্কারের দাবি ধীরে ধীরে ছাপিয়ে যেতে থাকে সরকারবিরোধী নানা দাবিতে।
এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে শুরু করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। চাকরির সুযোগ ও বৈষম্যের প্রশ্নে শুরু হওয়া আন্দোলন ক্রমে পরিণত হয় বৃহত্তর রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনে।
দাবিও বদলে যায় আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে। ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয় একদফা ‘শেখ হাসিনার পদত্যাগ’। একই সঙ্গে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ঘোষণা দেন ছাত্রনেতারা। ৪ আগস্ট তারা দেশের মানুষকে ঢাকায় আসার আহ্বান জানান।
৫ আগস্টের সকাল ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ মোতায়েন ছিল। বিভিন্ন স্থানে কাঁটাতারের ব্যারিকেড। ঢাকার প্রবেশপথে কড়া তল্লাশি। পুলিশের মাইক থেকে মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছিল।
কিন্তু মানুষ ঘরে থাকেনি। কারফিউ উপেক্ষা করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ শাহবাগের দিকে এগোতে থাকেন। বেলা ১১টার দিকে মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেলেও আন্দোলন থামেনি। শাহবাগে ছিল সাঁজোয়া যান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবস্থান। বিভিন্ন স্থান থেকে ভেসে আসছিল গুলির শব্দ ও বিস্ফোরণের আওয়াজ।
দুপুরের আগেই শাহবাগমুখী জনস্রোত ঘন হতে থাকে। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মানুষও যোগ দেন সেই মিছিলে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শাহবাগ ও আশপাশের এলাকা পরিণত হয় জনসমুদ্রে।
এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন, এমন খবর। মানুষের মধ্যে শুরু হয় নানা জল্পনা-কল্পনা। কী হতে যাচ্ছে? শেখ হাসিনার সরকারের পতন কি আসন্ন? নাকি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অন্য কোনো পায়তারা? এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে মানুষের মনে।
পরে জানা যায়, সেনাপ্রধানের ভাষণের সময় পরিবর্তন করা হয়েছে। ইন্টারনেটবিহীন অবস্থাতেও নানা মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এরই মধ্যে দুপুরের দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একটি ভিডিও। তাতে দেখা যায়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে করে দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় দৃশ্যপট।
এরপর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। তিনি সংকট কাটাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের উদ্যোগের কথা জানান।
এদিকে সিলেট থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয় উল্লাস। বৃষ্টি উপেক্ষা করে সিলেটের পথে ঘাটে নেমে পড়েন হাজারো মানুষ। কেউ আনন্দে কাঁদছেন, অন্যকে জড়িয়ে ধরে উল্লাসে মেতে ওঠছেন, কেউবা খুশিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছেন সিজদায়।
রাজধানীর মতো করে সিলেটেও হাজার হাজার মানুষ বিজয় মিছিল নিয়ে বের হন। নগরীর আম্বরখানা থেকে শুরু হয়ে জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, রিকাবীবাজার থেকে মীরবক্সটুলা, নয়াসড়ক এবং মধ্যে চৌহাট্টাসহ সকল এলাকা কানায় কানায় পূর্ণ হতে থাকে ছাত্র-জনতাসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষ।
তবে ৫ আগস্টের চিত্র শুধু উল্লাসের ছিল না। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, গুলি ও হতাহতের পাশাপাশি সরকারি স্থাপনা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। বিজয়ের উল্লাসের পাশাপাশি দিনটির সঙ্গে তাই জড়িয়ে থাকে প্রাণহানি, আহত হওয়া এবং স্বজন হারানোর বেদনা।
ক্ষমতার পালাবদলের পর গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। রাষ্ট্র সংস্কার, নির্বাচন, বিচার ও প্রশাসনিক পরিবর্তন নিয়ে শুরু হয় নতুন আলোচনা। বাংলাদেশের রাজনীতিও প্রবেশ করে এক অনিশ্চিত নতুন অধ্যায়ে। ৫ আগস্টকে তাই কারও কাছে গণঅভ্যুত্থানের বিজয়ের প্রতীক। কারও কাছে আবার দীর্ঘ অপশাসনের বিরুদ্ধে মাথা গজিয়ে ওঠা এক নতুন সূর্য উদয়ের দিন।
এক কথায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এমন একটি দিন, যেদিন একটি সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটে এবং শুরু হয় নতুন, ও গণতান্ত্রিক এক বাংলাদেশের।
৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান , সিলেটে গণঅভ্যুত্থান, জুলাই আন্দোলন , আগস্ট আন্দোলন ২০২৪, শেখ হাসিনা পদত্যাগ, ৫ আগস্ট ২০২৪ , সিলেট ছাত্র আন্দোলন, কারফিউ উপেক্ষা করে আন্দোলন