ফিরে দেখা জুলাই অভ্যুত্থান
১৮ জুলাই: শাবিপ্রবি শিক্ষার্থী রুদ্র সেনের মৃত্যু, ইন্টারনেটহীন রাত
সংগ্রাম-স্বাধীনতা
প্রকাশঃ ১৮ জুলাই, ২০২৬ ৭:১৭ অপরাহ্ন
সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই। কোটা সংস্কার আন্দোলনের উত্তাপে সারা দেশ তখন টালমাটাল। আগের দিনই বন্ধ ঘোষণা করা হয় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধীর করা হয় মোবাইল ইন্টারনেট। কিন্তু তাতেও থামেনি উত্তেজনার পারদ।
দিনভর সংঘর্ষ, হতাহত, শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) শিক্ষার্থী রুদ্র সেনের মৃত্যু এবং রাতে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার ঘটনায় সিলেট কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সকালে শাবিপ্রবিতে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান। হল ছাড়ার নির্দেশনা উপেক্ষা করে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। ক্যাম্পাসে তখন টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
এদিন দুপুরের দিকে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হয়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করেন। কিছু সময় শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি চললেও পরে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সড়ক ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশনার পর শিক্ষার্থী ও পুলিশের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়।
দুপুর ১টার পর সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের ছোড়া ইট-পাটকেলের জবাবে পুলিশ শটগান, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে। এ সময় অন্তত তিন শিক্ষার্থী ও এক পথচারী গুলিবিদ্ধ হন। আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে একজন সাংবাদিকও আহত হন।
বিকেলের দিকে শিক্ষার্থীরা পিছু হটলেও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সাধারণ মানুষ আখালিয়া এলাকায় সড়কে নেমে আসেন। সন্ধ্যার পর সেখানে আবারও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই ঘটে দিনের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা।
সংঘর্ষস্থল থেকে সরে যাওয়ার সময় শাবিপ্রবির কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড পলিমার সায়েন্স বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রুদ্র সেন পার্শ্ববর্তী একটি খাল পার হওয়ার চেষ্টা করেন। ভেলায় করে খাল অতিক্রমের সময় তিনি পানিতে ডুবে যান। পরে তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের অন্যান্য স্থানের মতো সিলেটেও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যায়। প্রথমে মোবাইল ইন্টারনেট এবং পরে ব্রডব্যান্ড সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং তথ্যপ্রবাহ প্রায় সম্পূর্ণ থেমে যায়। অনলাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যমগুলোর কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
ইন্টারনেট না থাকায় নানা ধরনের গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়েছে কিংবা ঢাকায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন—এমন ভিত্তিহীন তথ্য মুখে মুখে ছড়াতে থাকে। তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ না থাকায় বিভ্রান্তি আরও বাড়ে।
রাত ১০টার দিকে প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে সড়কে থাকা আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। দিনের সংঘাত তখন থেমে গেলেও সিলেটের মানুষের মনে রয়ে যায় অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক এবং রুদ্র সেনের মৃত্যুকে ঘিরে গভীর বেদনা।
ফিরে দেখা জুলাই অভ্যুত্থান, সিলেট, শাবিপ্রবি, রুদ্র সেন, সংঘর্ষ, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন