০৭ জুলাই ২০২৬

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ / প্রকৃতি

হবিগঞ্জের সাতছড়িতে মিলল বিরল ‘গোঁফওয়ালা বাদুড়’

সিলেট ভয়েস ডেস্ক

প্রকাশঃ ৭ জুলাই, ২০২৬ ৬:০৪ অপরাহ্ন

ছবিঃ হবিগঞ্জের সাতছড়ি উদ্যানে পাওয়া বিরল পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাট

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে বিরল প্রজাতির একটি ‘গোঁফওয়ালা বাদুড়’ শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। এত দিন এ প্রজাতির বাদুড় বাংলাদেশে রয়েছে বলে জানা ছিল না। নতুন এই আবিষ্কারের ফলে দেশে এ পর্যন্ত শনাক্ত বাদুড়ের প্রজাতির সংখ্যা দাঁড়াল ৩৭টিতে।

পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাট নামের এই বাদুড়টি শনাক্ত করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। গত ৩০ জুন জীববৈচিত্র্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল চেকলিস্টে সংশ্লিষ্ট গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়। গবেষণায় অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তিন শিক্ষক এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের বাংলাদেশ কার্যালয়ের একজন গবেষক।

২০১৭ সালের ১৯ আগস্ট সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের একটি কালভার্টের নিচে পাথরের খাঁজে এ বাদুড়ের একটি কলোনির সন্ধান পান গবেষকেরা। সেখান থেকে প্রথম দফায় তিনটি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এরপর দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ চালিয়ে ২০২৪ সালের ১৭ মার্চ ও ১৬ আগস্ট একই স্থান থেকে আরও নমুনা সংগ্রহ করেন তারা। ২০১৭ থেকে ২০২৪ এই সাত বছরের পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষেই প্রজাতিটি প্রকাশ্যে আসে।

এ গবেষণায় যুক্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক আশীষ কুমার দত্ত জানান, বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি খুলি ও দাঁতের গঠন বিশ্লেষণ এবং ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে বাদুড়টি পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাট বলে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হন তারা। অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হাসানের নেতৃত্বে এ গবেষণা দলে আরও ছিলেন অনিক সাহা, আশীষ কুমার দত্ত, শারমিন আক্তার ও সাজেদা বেগম।

মুখমণ্ডলের চারপাশে থাকা সূক্ষ্ম লোমের কারণে পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাটকে বাংলায় ‘গোঁফওয়ালা বাদুড়’ বলা হয়। তবে গবেষকদের মতে, এ প্রজাতি চেনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য কানের ভেতরের বল্লমাকৃতির ‘ট্রাগাস’, যা কানের দৈর্ঘ্যের প্রায় অর্ধেক। ছোট থেকে মাঝারি আকারের এই বাদুড়ের গায়ে থাকে ঘন বাদামি লোম। বাংলাদেশে পাওয়া নমুনাটির ডানার সামনের অংশ বা ফোরআর্মের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৩ দশমিক ৮৫ মিলিমিটার। বিভিন্ন মৌসুমে কলোনিতে এক থেকে ১০টি পর্যন্ত বাদুড়ের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে, আর পুরুষ বাদুড়গুলো সাধারণত একাকী থাকে বলে জানান গবেষকেরা।

এত দিন পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাটের বিচরণ কেবল দক্ষিণ ভারতের কেরালা ও পশ্চিমঘাট পর্বতমালার বনাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ বলে ধারণা করা হতো। সেই অঞ্চল থেকে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরের হবিগঞ্জে এর সন্ধান মেলায় প্রজাতিটির ভৌগোলিক বিস্তৃতি সম্পর্কে নতুন তথ্য যোগ হলো বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

উচ্চতার দিক থেকেও এ আবিষ্কার তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতে সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪০০ থেকে এক হাজার মিটার বা তারও বেশি উচ্চতায় এ বাদুড়ের দেখা মেলে। কিন্তু সাতছড়িতে এর কলোনি পাওয়া গেছে মাত্র ৮৫ মিটার উচ্চতায় যা গবেষকদের ধারণার চেয়ে অনেক কম। এ থেকে ইঙ্গিত মেলে, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতায় এ প্রজাতি আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সক্ষম।

আশীষ কুমার দত্ত বলেন, এই গোঁফওয়ালা বাদুড় পতঙ্গভুক প্রজাতি, অর্থাৎ এটি প্রচুর মশা ও ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে থাকে। ফলে পরিবেশে ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা রয়েছে। বাদুড় সংরক্ষণে পুরোনো কালভার্ট, মৃত গাছের কোটর বা গুঁড়ি এবং পরিত্যক্ত ভবন রক্ষার গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে এবং গবেষণার সংখ্যা বাড়লে আরও নতুন নতুন প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যাবে আমাদের দেশে।

আইইউসিএনের বৈশ্বিক লালতালিকায় পেটনস হুইস্কার্ড ব্যাটকে তথ্য-অপর্যাপ্ত প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকদের ভাষ্যে, সাতছড়িতে এর উপস্থিতি প্রমাণ করে, দেশের বনভূমি এখনো বহু বিরল প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে আছে। তবে পর্যটকদের অবাধ চলাচল ও আবাসস্থল ধ্বংসের ঝুঁকির কারণে এ প্রজাতি রক্ষায় বিশেষ পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন তারা।


শেয়ার করুনঃ

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ থেকে আরো পড়ুন

সিলেট, হবিগঞ্জ, বাদুড়

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ