দিরাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ইটভাটার ম্যানেজার নিহত
দৈনন্দিন
প্রকাশঃ ৬ জুন, ২০২৬ ৩:৪৪ অপরাহ্ন
স্বপ্ন ছিল ইউরোপের উন্নত জীবনে পা রাখার। পরিবারের দারিদ্র্য দূর করে সুখ-সমৃদ্ধির নতুন অধ্যায় শুরু করার আশায় দালালদের প্রলোভনে পা বাড়িয়েছিলেন সুনামগঞ্জের শত শত তরুণ। কিন্তু ইতালি যাওয়ার সেই স্বপ্ন অনেকের জন্য পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে। কেউ প্রাণ হারিয়েছেন ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে, কেউ আবার লিবিয়ার মাফিয়া চক্রের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে দেশে ফিরেছেন।
অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন রিসার্চ অ্যান্ড সার্ভিস সেন্টার (এমআরএসসি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত নির্যাতনের শিকার হয়ে সুনামগঞ্জে ফিরেছেন অন্তত ২১৫ জন। তবে বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ অনেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেশে ফিরে এলেও তাদের তথ্য কোথাও নথিভুক্ত হয় না।
গত ২১ মার্চ ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে সুনামগঞ্জের ১৩ তরুণের মৃত্যুর ঘটনা পুরো জেলাজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এ ঘটনায় দিরাই ও জগন্নাথপুর থানায় পৃথক মামলা দায়ের হলেও মামলার অগ্রগতি নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে নিহতদের পরিবারের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, দালালদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সম্প্রতি নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন জামালগঞ্জ উপজেলার নাজিমনগর গ্রামের নুরু মিয়ার দুই ছেলে ইয়াছিন মিয়া ও জীবন মিয়া এবং একই গ্রামের আব্দুস শহীদের ছেলে মো. মামুন মিয়া। তাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে লিবিয়ায় মানবপাচারকারী চক্র ও মাফিয়াদের ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র।
ভুক্তভোগীরা জানান, চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি ইতালিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন তারা। নাজিমনগর গ্রামের দিলুরা বেগম, তার ছেলে মো. হুমায়ুন এবং মেয়ে জামাই নজরুল ইসলামের মাধ্যমে লিবিয়ায় যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তাদের সঙ্গে জনপ্রতি ১৪ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। এর মধ্যে লিবিয়া পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য পাঁচ লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়া হয় এবং ইতালিতে পৌঁছার পর বাকি টাকা পরিশোধের কথা ছিল।
নানা ধাপ পেরিয়ে সৌদি আরব, মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া হয়ে তারা লিবিয়ার বেনগাজিতে পৌঁছান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই তাদের জীবন অন্য মোড় নেয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, লিবিয়ায় অবস্থানরত সোহেল মিয়া ও ভৈরবের বেলাবরের মো. নিলয়ের নেতৃত্বে একটি চক্র তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। পরে স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে চুক্তির অতিরিক্ত টাকা আদায় করে বন্দুকধারী মাফিয়াদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
এরপর শুরু হয় মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন। মাফিয়া চক্র জনপ্রতি সাড়ে ২৬ লাখ টাকা দাবি করে এবং টাকা আদায়ের জন্য বন্দিদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতে থাকে।
লোমহর্ষক সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে মো. মামুন মিয়া বলেন, প্রচুর মারধর করছে। ঠিকমতো খাবারও দেয়নি। হাত-পা বেঁধে সারা রাত বাথরুমে ফেলে রাখছে। নির্যাতনের ভিডিও করে পরিবারের লোকজনকে পাঠাইছে। বলছে, সাড়ে ২৬ লাখ টাকা না দিলে মেরে ফেলবে। আমাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আমার পরিবার প্রায় ৫২ লাখ টাকা খরচ করেছে।

মামুনের ভাষ্য অনুযায়ী, লিবিয়ার মাফিয়া ও দালাল চক্রের অধিকাংশ সদস্যই বাংলাদেশি। মুক্তিপণের টাকা আদায়ের জন্য বাংলাদেশে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করা হয়। পরিবারের সদস্যরা জমি বিক্রি, গবাদিপশু বিক্রি এবং ধারদেনা করে সেই টাকা জোগাড় করেন।
আরেক ভুক্তভোগী ইয়াছিন মিয়া জানান, লিবিয়ায় পৌঁছানোর আগেই তার পরিবার স্থানীয় দালালদের হাতে ১০ লাখ টাকা তুলে দেয়। পরে ত্রিপোলিতে পৌঁছানোর পর ভিন্ন পথে ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে আরও দুই লাখ টাকা আদায় করা হয়। একপর্যায়ে প্রতারণার শিকার হয়ে তিনি অন্য একটি দালাল চক্রের হাতে পড়েন এবং পরে লিবিয়ার পুলিশের হাতে আটক হন।
ইয়াছিন বলেন, “আমাকে বেনগাজির গাম্বুদা জেলে পাঠানো হয়। সেখানে এক মাস ১৮ দিন ছিলাম। জেল থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানতে পারি, আমার ভাই জীবনকে ছাড়িয়ে আনতে ৩০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। পরে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় দেশে ফিরতে পেরেছি।”
জীবন মিয়ার অভিজ্ঞতাও ছিল ভয়াবহ। তিনি জানান, যে আস্তানায় তাকে আটকে রাখা হয়েছিল সেখানে ৬০ থেকে ৬৫ জন বন্দি ছিল। প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ সেখানে আনা হতো। সবাইকে নির্যাতন করা হতো এবং টাকা দিতে পারলেই কেবল মুক্তি মিলত।
জীবন বলেন, যারা টাকা দিতে পারত তাদের ছেড়ে দেওয়া হতো। যারা পারত না, তাদের ওপর অত্যাচার চলত। আমাকে মুক্ত করতে আমার পরিবার প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ করেছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত দিলুরা বেগমের ছেলে মো. হুমায়ুন দাবি করেন, তারা কাউকে প্রতারণা করেননি। দোয়ারাবাজারের প্রতাপপুর গ্রামের সোহেল নামের এক ব্যক্তি লিবিয়ায় যাওয়ার পুরো বিষয়টি পরিচালনা করছিলেন। তাদের নিজের আত্মীয়স্বজনও বর্তমানে লিবিয়ায় আটকা রয়েছেন।
এদিকে ভূমধ্যসাগরে নিহত জগন্নাথপুর উপজেলার ইছগাঁও গ্রামের আলী আহমদের মামা ফখর উদ্দিন বলেন, ১৩ লাখ টাকার চুক্তিতে পাঁচ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর বাড়ি ছাড়েন তার ভাগ্নে। পরে লিবিয়ায় একটি ‘গেইমঘরে’ বন্দি অবস্থায় খাবারের জন্য আকুতি জানিয়েছিলেন তিনি। একপর্যায়ে ৪২ জনকে নিয়ে সমুদ্রে যাত্রা শুরু করা হলে চার দিন পর নৌকাডুবিতে আলীসহ ২২ জনের মৃত্যু হয়।
ব্র্যাকের এমআরএসসি সুনামগঞ্জের কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সাগরপথে মৃত্যু কিংবা লিবিয়ার মাফিয়া চক্রের নির্যাতনের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। তবে তাদের নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত অন্তত ২১৫ জন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন।
তিনি বলেন, স্থানীয় ও আন্তঃজেলা দালাল চক্রের মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছে। কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা কিংবা নির্যাতনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো কারও কাছে নেই।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দালাল চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, ভূমধ্যসাগরে নিহতদের ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি বর্তমানে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করছে।
সুনামগঞ্জ, ইউরোপ, নির্যাতন, ভূমধ্যসাগর