জগন্নাথপুরে অনিশ্চয়তার মুখে ৩২ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প
দৈনন্দিন
প্রকাশঃ ২১ মে, ২০২৬ ১০:৩১ অপরাহ্ন
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায় ঠিকাদারদের গাফিলতি ও ধীরগতির কারণে সরকারের প্রায় ৩২ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এলজিইডি ও জাইকার আওতাধীন একাধিক সেতু ও সড়ক প্রকল্প নির্ধারিত সময়েও শেষ না হওয়ায় জুনের মধ্যে বরাদ্দের টাকা ফেরত যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে দায়ী ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ। বুধবার (২১ মে) আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি।
কয়ছর আহমেদ বলেন, ‘জনগণের ট্যাক্সের টাকায় আসা উন্নয়নের বাজেট কোনো ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে ফেরত যেতে দেওয়া হবে না। যারা কাজ ফেলে রেখে উপজেলাবাসীকে দুর্ভোগে ফেলছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে কালো তালিকাভুক্ত করাসহ লাইসেন্স বাতিল করা হবে। সরকারের উন্নয়ন যাত্রা ব্যাহত করার অধিকার কারও নেই।’
স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও গ্রামীণ অবকাঠামো শক্তিশালী করতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ও ব্রিজসহ বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দেয় সরকার। কিন্তু কাজ পাওয়ার পর থেকেই নানা অজুহাতে কাজের গতি কমিয়ে ফেলে রাখেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা।
সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্র জানায়, প্রকল্পগুলোর মধ্যে এলজিইডির ৫টি সেতু ও রাস্তা প্রকল্পের ২৫ কোটি, জাইকা গ্রামীণ রাস্তা প্রকল্পের প্রায় ৪ কোটি ও জাইকা এইচবিবি রাস্তা প্রকল্পের আড়াই কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের উন্নয়ন কাজ থমকে রয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন একটি ফ্ল্যাট প্যাকেজে ৫টি সেতু ও রাস্তার কাজ আটকে আছে। এগুলো হলো— কলকলিয়া ইউনিয়নের জগদীশপুর ব্রিজ, রানীগঞ্জ ইউনিয়নের ঘোষগাও এলাকার ব্রিজ, পাটলি ইউনিয়নের লাউতলা ও রসূলগঞ্জ এলাকার ব্রিজ, মিরপুর ইউনিয়নের শ্রীরামসি গ্রামের ব্রিজ এলজিইডি বিভাগের প্রকল্প। ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের এই কাজটি পেয়েছে ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মো. জামিল ইকবাল।
গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও মেরামত জাইকা প্রকল্পের আওতায় ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীনে পাইলগাঁও ইউনিয়নের রমাপত্তিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে বাইতুল ফালা জামে মসজিদ শেওড়া এলাকার গ্রামীণ রাস্তা। ৪ কোটি ১৬ লাখ ৯৩ হাজার টাকা বরাদ্দের এই কাজটি পেয়েছে সুনামগঞ্জের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রাজিব এন্টারপ্রাইজ।
একই ইউনিয়নের রমাপত্তিপুর হতে শেওড়া রাস্তা পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার ৭০০ মিটার ইট সোলিং (এইচবিবি) রাস্তার জন্য ২০২৪ সালে প্রায় আড়াই কোটি টাকার টেন্ডার হয়। এই কাজটি পায় ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ওয়ান ইঞ্জিনিয়ারিং।
প্রকল্পের ধীরগতির বিষয়ে জানতে চাইলে মেসার্স ওয়ান ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ঠিকাদার আনোয়ার হোসেন খান বলেন, ‘আমরা কাজ করতে রাজি আছি। মাটি কাটার করে দিলে আমরা দ্রুত কাজ করে দিবো। মাটি কাটার ঠিকাদার মাটির কাজ করেনি।’
তবে অন্য দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মো. জামিল ইকবাল এবং মেসার্স রাজিব এন্টারপ্রাইজের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।
এদিকে চলতি বছরের জুন মাসে কাজের শেষ সময় ঘনিয়ে আসলেও কাজের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই মেগা প্রজেক্টগুলো আলোর মুখ না দেখলে উপজেলার হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে।
পাইলগাঁও ইউনিইয়নের রমাপ্রতিপুর ওয়ার্ডের মেম্বার শাহান মিয়া বলেন, ‘ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এখন পর্যন্ত কোন কাজ করেনি। কাজ না হওয়ায় আমাদের এলাকার মানুষ চরম ভোগান্তিতে আছেন।’
পৌর শহরের বাসিন্দা আব্দুল মতিন বলেন, ঠিকাদারের গাফেলতির কারণে উপজেলার প্রায় ২৯ কোটি টাকা জুন মাসে ফেরত চলে যাবে। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, এসব ঠিকাদারের লাইসেন্স বাতিল করে কালো তালিকা করা হোক।’
সচেতন মহলের ধারণা, যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে এই মেগা প্রকল্পের কাজ পুনরায় শুরু করে সম্পন্ন না করা হয়, তবে উপজেলার সামগ্রিক উন্নয়ন থমকে দাঁড়াবে। তাই এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের উচ্চমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা।
জগন্নাথপুর উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) সোহারাব হোসেন বলেন, ‘আমরা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে অনেকবার চিঠি দিয়েছি। কিন্তু তারা চিঠির কোন উত্তর দেননি। জুন মাসে প্রকল্পের টাকাগুলো সরকারের কোষাগারে চলে যাবে।’
জগন্নাথপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শিমুল আলী বলেন, ‘গ্রামীণ উন্নয়নের এই কাজ জাইকার অর্থায়নে হচ্ছে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে বারবার চিঠি দেওয়ার পরও তারা মাত্র ৪ শতাংশ কাজ করেছে।’
প্রকল্পের বিষয়ে জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইসলাম উদ্দিন বলেন, ‘আমি এলজিডি প্রকৌশলী ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে চিঠি দেওয়ার জন্য বলে দিয়েছি। এই টাকাগুলো ফেরত গেলে জগন্নাথপুর উপজেলায় কাজ আনা কঠিন হয়ে পড়বে।’
জগন্নাথপুর উন্নয়ন প্রকল্প, সুনামগঞ্জ সংবাদ, এলজিইডি প্রকল্প, জাইকা প্রকল্প, জগন্নাথপুর সড়ক উন্নয়ন