২১ মে ২০২৬

দৈনন্দিন / দিবস

আন্তর্জাতিক চা দিবস

১৮৭ টাকার জীবনসংগ্রাম, তিন-চতুর্থাংশ পরিবার এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে

মোসাইদ রাহাত

প্রকাশঃ ২১ মে, ২০২৬ ৪:৫৫ অপরাহ্ন

ছবিঃ ছবি: মামুন হোসাইন

বাংলাদেশে বছরে ৯ কোটির বেশি কেজি চা উৎপাদিত হয়। দেশের ১৭২টির বেশি চা-বাগান ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল এক শিল্পখাত। আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের চায়ের পরিচিতি বাড়ছে। কিন্তু যে শ্রমিকদের ঘামে এই শিল্প টিকে আছে, তাদের জীবনমান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক চা দিবসে তাই উৎসবের পাশাপাশি সামনে এসেছে চা-শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, কম মজুরি ও অধিকার সংকটের বাস্তবতা।


রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রায় সব অঞ্চলে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দিন শুরু করেন। রাস্তার পাশের ছোট দোকান, অফিসপাড়া কিংবা গ্রামীণ বাজার সবখানেই চায়ের উপস্থিতি। কিন্তু সহজলভ্য এই পানীয়ের পেছনে থাকা শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম খুব কমই আলোচনায় আসে।


চা-শ্রমিকদের বর্তমান দৈনিক মজুরি ১৮৭ টাকা। ২০২২ সালে ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলনে নেমেছিলেন শ্রমিকেরা। কয়েক দফা আন্দোলন ও ধর্মঘটের পর মজুরি বাড়লেও দাবি পূরণ হয়নি।


সিলেট ক্যাথলিক ডায়োসিসের শান্তি ও ন্যায়বিচার কমিশনের আহ্বায়ক ফাদার জোসেফ গোমেস বলেন, চা-বাগানের বাইরের সাধারণ দিনমজুরও এখন দৈনিক ৫০০-৭০০ টাকা পান। সেখানে চা-শ্রমিকেরা এখনও ১৮৭ টাকায় কাজ করছেন। এই মজুরিতে পরিবার চালানো বাস্তবে অসম্ভব। তাছাড়া অনেক বাগানে শ্রমিকেরা সময়মতো মজুরিও পান না। কোথাও কোথাও কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বেতন বকেয়া থাকে। এতে পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েন শ্রমিকেরা।


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের এক জরিপে দেখা গেছে, সিলেট অঞ্চলের প্রায় ৭৪ শতাংশ চা-শ্রমিক পরিবার এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। নিরক্ষরতার হারও উদ্বেগজনক। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, চা-বাগান এলাকার ১০ জন অভিভাবকের মধ্যে সাতজনই পড়তে-লিখতে পারেন না।


চা-বাগান এলাকায় শিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক শিশু মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে মেয়েশিশুরা নানা ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। মূলধারার বিদ্যালয়ে বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।


বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৭২টি চা-বাগানে নিবন্ধিত শ্রমিক রয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার। পরিবার ও অস্থায়ী শ্রমিকসহ এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ।


শ্রমিকনেতাদের দাবি, এদের বড় অংশের কোনো আনুষ্ঠানিক চাকরির স্বীকৃতি নেই। ফলে চাকরি হারানো, মজুরি বঞ্চনা বা অন্যায্য আচরণের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগও সীমিত।


চা-শ্রমিকদের ইতিহাসও বঞ্চনার। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে বর্তমান ভারতের বিহার, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা অঞ্চল থেকে বহু মানুষকে চা-বাগানে কাজের জন্য আনা হয়েছিল। স্বাধীনতার পরও তাদের জীবনযাত্রার কাঠামোগত বৈষম্য খুব একটা বদলায়নি। এখনও অধিকাংশ শ্রমিক পরিবার বাগান এলাকার জমির মালিকানা থেকে বঞ্চিত।


চা-বাগানের সবচেয়ে শ্রমসাধ্য কাজ পাতা তোলার দায়িত্বও মূলত নারীদের ওপর। প্রতিদিন নির্ধারিত পরিমাণ পাতা তুলতে না পারলে মজুরি কেটে নেওয়া হয়। বৃষ্টি, অসুস্থতা বা শারীরিক ক্লান্তির বিষয়ও অনেক সময় বিবেচনায় নেওয়া হয় না।


সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগানের শ্রমিক নেতা নমিতা রায় বলেন, বর্তমান বাজারে ১৮৭ টাকা মজুরিতে একটি পরিবার চালানো খুবই কষ্টকর। দ্রব্যমূল্য যেভাবে বেড়েছে, তাতে শ্রমিকদের ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ হচ্ছে না। আমরা চাই শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য মজুরি ও মানবিক জীবন নিশ্চিত হোক।


লাক্কাতুরা চা-বাগানের কাজ করা প্রদীপ কৈরী বলেন, চা-বাগানের শ্রমিকেরা দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করলেও তাদের জীবনমানের তেমন পরিবর্তন হয়নি। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও বাসস্থানের সমস্যাগুলো এখনও রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক চা দিবসে শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।


চা-গবেষক শামসুল হুদা বলেন, চা-বাগানের জমির লিজ নবায়নের সময় শ্রমিকদের অধিকার, পুনর্বাসন ও বসবাসের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে এখনো সে ধরনের কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চা-শ্রমিকেরা একই জায়গায় বসবাস ও কাজ করলেও জমির ওপর তাদের কোনো স্বীকৃত অধিকার নেই, যা বড় ধরনের সামাজিক বৈষম্যের উদাহরণ।


বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের শ্রম, স্বাস্থ্য ও কল্যাণ উপ-কমিটি সমন্বয়ক তাহসিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ছাড়া চা শিল্পের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। ন্যায্য মজুরি, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার, মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সকলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত হলে এই শিল্প আরও শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক হবে।


শেয়ার করুনঃ

দৈনন্দিন থেকে আরো পড়ুন

চা শ্রমিক, আন্তর্জাতিক চা দিবস, চা শ্রমিকের মজুরি, ১৮৭ টাকা মজুরি, চা শ্রমিকের জীবনসংগ্রাম

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ