ফের চালু হচ্ছে ঢাকা-সিলেট-ম্যানচেস্টার রুটে বিমানের ফ্লাইট
প্রবাস
প্রকাশঃ ২২ মে, ২০২৫ ৮:৪৭ অপরাহ্ন
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরে প্রবাসীদের অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা সিলেটের প্রবাসীরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরেই এই বিমানবন্দরে বৈষম্যমূলক নীতি অবলম্বন করা হচ্ছে। যা তাদের চলাচল, বিনিয়োগ এবং দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার মতো বিষয়েও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
প্রবাসীদের অভিযোগ, সিলেট অঞ্চলের মানুষ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও যাত্রী সেবায় তার প্রতিফলন হচ্ছে না। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী এটি একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলেও বাস্তবে বিদেশি কোনো এয়ারলাইন্স এখানে অবতরণ করতে পারছে না। বর্তমানে একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত এয়ারলাইন্সের কয়েকটি আন্তর্জাতিক রুটেই সীমাবদ্ধ সিলেট বিমানবন্দরের কার্যক্রম।
একইসঙ্গে যাত্রীসেবার মান নিয়েও রয়েছে ব্যাপক অভিযোগ। চেক-ইন, লাগেজ হ্যান্ডলিং ও কাস্টমস প্রক্রিয়ায় যাত্রীরা নিয়মিত হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ প্রবসাীদের।
বিশেষ করে যুক্তরাজ্য থেকে কার্গো মালামাল পাঠানোর ক্ষেত্রেও সিলেটের যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কারণ মালামালগুলো প্রথমে ঢাকায় গিয়ে কাস্টমস হয়। তারপর সড়কপথে সিলেটে পাঠানো হয়।
তবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট যদি সিলেটে নামতে চাইলে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো চাহিদা নেই। অবশ্য কোনো প্রবাসী এই বিষয়ে লিখিত আবেদন দিলে তারা বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্য থেকে ছুটি কাটাতে দেশে আসেন প্রবাসী সাকিব সানী। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের অধিকাংশই সিলেটি। কিন্তু সিলেটিদের জন্য বিমান মাত্র একটি। বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্স ছাড়া অন্য বিমান এখানে অবতরণ করতে দেওয়া হয় না। এতে খরচ অনেক বেড়ে যায়। অধিকাংশ প্রবাসীই দেশে আসতে চান না । কিন্তু কেন এটা হচ্ছে আমরা জানিনা।
এক্সপ্রেস কার্গোর মালিক এনামূল করিম বলেন, ‘আমার কোম্পানী যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে কাজ করে, আমাদের ৪০ টির মতো এজেন্ট আছে এখানে। আমরা প্রবাসীদের কোন পণ্য বা মালামাল বাংলাদেশ বিমানে কার্গোর মধ্যে দেশে পাঠাই তখন বিমান ঠিকই সিলেট ল্যান্ড করলেও পণ্য নিয়ে চলে যায় ঢাকায় এবং ঢাকায় গিয়ে পণ্য খালাস করে। সেজন্য আমাকে ঢাকায় থার্ড পার্টির সাহায্য নিতে হচ্ছে সিলেটের পণ্য পৌছাতে কারণ পণ্যগুলো সিলেট না রেখে ঢাকায় নিয়ে চলে যাওয়ায় আমাদের খরচ বেড়ে যায় দ্বিগুন। এছাড়া আমরা দাম বেশি বাড়ালেও গ্রাহক চাহিদা কমে যায়।‘
তিনি আরও বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে কোন এক অজানা সিন্ডিকেটে কাছে সিলেট বিমানের কাস্টমসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা জিম্মি। এতো সুযোগ সুবিধা এবং আধুনিকায়ন করা হলেও আমরা যারা পণ্য আদান প্রদানের কাজ করি এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করি তাদের নিয়ে কেউ ভাবছে না।’
ইউকে এনআরবি সোসাইটির পরিচালক ও প্রবাস বাংলা টেলিভিশনের সিইও মোহাম্মদ আহমেদ জুনেদ সিলেট ভয়েসকে বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে ৯০ শতাংশ প্রবাসীই সিলেটি। কিন্তু আমরা সিলেটিদের কর্গোর মাধ্যমে পণ্য পাঠাতে হলে এখন বড় ধরণের বিড়াম্বনায় শিকার হতে হয়। যেখানে আগে সিলেট পণ্য নামতো কিন্তু এখন সেটি ঢাকায় হচ্ছে। যার কারণে প্রবাসীদের বাংলাদেশে পণ্য মালামাল পাঠানোর আগ্রহ অধিকাংশ কমে গিয়েছে একমাত্র খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে। এটি নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে তা না হলে সরকার অনেক বড় রাজস্ব হারাবে এবং অর্থনীতির ক্ষতি হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিমান ভাড়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে অসামঞ্জস্যতা। একই ফ্লাইটে ঢাকার যাত্রীদের তুলনায় সিলেটগামী যাত্রীদের কাছ থেকে অনেক বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। যা প্রবাসীদের মধ্যে অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। এতে করে অনেক প্রবাসী পরিবারসহ সিলেটে আসতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।’
যুক্তরাজ্যের ইস্ট লন্ডনে থাকা সুনামগঞ্জের বাসিন্দা নাইমুর রহমান সিলেট ভয়েসকে বলেন, ‘আমি কিছুদিন আগে গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে নিজ দেশে আসতে চেয়েছিলাম। সরাসরি সিলেট যায় একমাত্র বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স তবে ভাড়া অতিরিক্ত। আমাকে সিলেট নামলে দেখায় ১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা এবং ঢাকায় নামলে সেটা ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকা। এতো বৈষম্য কেন সিলেটিদের সাথে এটাই আমরা বুঝি না। এতে অতিরিক্ত দাম এবং খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবার দেশে আসার পরিকল্পনাই বাদ দিয়ে দিয়েছি। এছাড়া এখানে যদি বহুজাতিক বিমান নামে তাহলে দামেও বিশাল পরিবর্তন আসবে সে দিকেও কেউ নজর দিচ্ছেন না, অথচ প্রবাসীরা বাংলাদেশের চালিকা একটা অন্যতম শক্তি।’
প্রবাসীদের দাবি দাওয়া নিয়ে কাজ করা প্রবাসী ওয়েলফেয়ার ফোরামের সভাপতি আহ্বায়ক ডক্টর এম এ মোশতাক বলেন, ‘ওসমানী বিমানবন্দর ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার মতো অবকাঠামো অর্জন করেছে। নতুন টার্মিনাল ভবন, ফুয়েলিং সুবিধা, শক্তিশালী বিদ্যুৎ সংযোগ, উন্নত কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ইত্যাদি সম্পন্ন হয়েছে। শুধু প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা ও অনুমোদন। সিলেটে ভাড়ার অতিরিক্ত হওয়ার পেছনে যে সিন্ডিকেট কাজ করে তাদের শক্তভাবে দমন করতে হবে। কাতার, ইতিহাদ এয়ারওয়েজ, ব্রিটিশ এয়ারয়েজের মতো বিমানকে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে নামাতে হবে, এতে করে প্রকৃতিকন্যা সিলেটের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে।’
সিলেটে কেন পণ্য খালাস হচ্ছে না সে বিষয়ে জানতে চাইলে কাস্টমের বিমানবন্দর ও এয়ারফ্রেইট বিভাগ অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সহকারি পরিচালক ইনজামাম উল হক বলেন, এটি এখন আপাতত ঢাকায় হচ্ছে। তবে বাহিরে পণ্য আদান প্রদানে দায়িত্বে থাকা ব্যবসায়ী বা প্রবাসীরা যদি আবেদন করেন সে বিষয়ে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিব এবং আমাদের পরিচালক মহোদয়ের কাছে সেটি তুলে ধরবো।’
সিলেটে বিমানের বহুজাতিক কোম্পানীর ফ্লাইট চালু প্রসঙ্গে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক হাফিজ আহমদ বলেন, ‘আমার কাছে কোন কোম্পানী বলেনি সে সিলেটের এয়ারপোর্টে ফ্লাইট চালু করতে চায়। যদি কেউ ফ্লাইট নামতে চায় তাহলে অবশ্যই আমরা সেটি গ্রহণ করব। আমি নিজেও চাই ওসমানী বিমানবন্দরে বহুজাতিক ফ্লাইট চালু হোক।
সিলেট বিমানবন্দর, প্রবাসীদের অভিযোগ, কার্গো সেবা সিলেট, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেটে বিমানসেবা