১৭ এপ্রিল ২০২৬

যাপিতজীবন / স্বাস্থ্য

সিলেটে প্রতিবছর হামের টিকার দ্বিতীয় ডোজ থেকে বাদ পড়ছে হাজারো শিশু

আহমেদ জামিল

প্রকাশঃ ৫ এপ্রিল, ২০২৬ ৪:০০ অপরাহ্ন


সিলেটে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে প্রতিবছর শিশুদের হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা দেওয়া হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু শিশুরা সঠিকভাবে টিকা পাচ্ছে কি-না সেই তদারকি নেই স্বাস্থ্য প্রশাসনের। প্রশাসনের কর্তাদের এই অবহলোর কারণে প্রতিবছর হাজারেরও বেশি শিশু হাম-রুবেলা টিকার দ্বিতীয় ডোজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বছরের পর বছর দ্বিতীয় ডোজ না পাওয়া শিশুদের সংখ্যা বাড়ছেই। শুধু তাই নয়, লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ঘাটতি। খোঁদ সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অর্জন অনেক কম।

চিকিৎসকরা বলছেন, হামের দ্বিতীয় ডোজ না দেওয়ায় ঝুঁকিতে পড়তে পারে শিশুরা। সম্প্রতি সারাদেশের মতো সিলেটেও বাড়ছে হাম আক্রান্তদের সংখ্যা।

সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্যমতে, সিলেটে গতকাল শনিবার পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৭০জন। শেষ ২৪ ঘন্টায় নমুনা পরীক্ষা করে ৮ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে মোট ৩০ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।

গত তিন বছরের সিলেটে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার সরকারি তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জেলায় টিকার লক্ষ্যমাত্রা যেমন কমছে, তেমনি প্রতি বছর টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ থেকে ঝরে পড়ছে গড়ে আড়াই হাজারেরও অধিক শিশু।

পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা দেখা গেছে, ২০২৩ সালে সিলেট জেলায় টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৫ হাজার ৮৫৭ জন। এর মধ্যে প্রথম ডোজ (০-১১ মাস) পেয়েছিল ৮৪ হাজার ৬৩৫ জন শিশু। দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছে ৮২ হাজার ৯৬০ জন শিশু। এতে জেলায় দ্বিতীয় ডোজ থেকে বঞ্চিত হয়েছে ১ হাজার ৬৭৫ জন।

একই বছরে সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৭ হাজার ৭৩০ জন। এর মধ্যে প্রথম ডোজ পেয়েছিল ১৫ হাজার ৫২৩ জন শিশু আর দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছে ১৫ হাজার ১১৪ জন শিশু। এতে সিটি করপোরেশন এলাকায় দ্বিতীয় ডোজ থেকে বাদ পড়েছে ৪০৯ জন।

২০২৪ সালে সিলেট জেলায় টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৫ হাজার ৭৫৬ জন। এর মধ্যে প্রথম ডোজ  পেয়েছে ৮১ হাজার ৭৭৮ জন শিশু আর দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ৭৯ হাজার ৮৬০ জন শিশু। এ বছর জেলায় দ্বিতীয় ডোজ থেকে বঞ্চিত হয়েছে ১ হাজার ৯১৮ জন।

এ বছরে সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৬ হাজার ৬৫৬ জন। এর মধ্যে প্রথম ডোজ পেয়েছে ১৪ হাজার ৫২৭ জন শিশু আর দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছে ১৩ হাজার ৯১১ জন শিশু। এ বছর সিটি করপোরেশন এলাকায় দ্বিতীয় ডোজ থেকে বাদ পড়েছে ৬১৬ জন।

সর্বশেষ ২০২৫ সালে জেলার ১৩ উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮২ হাজার ২৬৭জন। এর মধ্যে প্রথম ডোজ  পেয়েছে ৭৬ হাজার ৩৫৬ জন শিশু আর দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ৭৪ হাজার ৩০৪ জন শিশু। গত বছর জেলায় দ্বিতীয় ডোজ থেকে বাদ পড়েছে ২ হাজার ৫২ জন।

একই বছরে সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ হাজার ৭২০ জন। এর মধ্যে প্রথম ডোজ পেয়েছে ১৪ হাজার ৪৮০ জন শিশু আর দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছে ১৩ হাজার ৫৭১ জন শিশু। গত বছর সিটি করপোরেশন এলাকায় দ্বিতীয় ডোজ থেকে বাদ পড়েছে ৯০৯ জন।

সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের একজন সহকারী অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, টিকার এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়া এবং দ্বিতীয় ডোজ থেকে শিশুদের ঝরে পড়া ভবিষ্যতের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। এর ফলে শিশুরা বড় ধরণের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। মাঠ পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম এবং টিকাদান কেন্দ্রের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা না গেলে এই হার আরও কমতে পারে বলেন তিনি।

সিলেটের সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শিশুদের টিকার আওতায় আনতে নিয়মিত ইপিআই কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

কিন্তু অভিভাবকরা বলছেন, রুটিন টিকার ক্ষেত্রে প্রচারণার মধ্যে কেবল একটি ব্যানার সাঁটানো ছাড়া দৃশ্যমান প্রচারণা নেই। একসময় মসজিদের মাইকে টিকা দেওয়ার কথা জানানো হলেও এখন আর সেটি হয় না।

নগরীর বাগবাড়ি এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকুরিজীবী কয়েস চৌধুরী বলেন, রুটিন টিকার ক্ষেত্রে কোনো প্রচারণা চালাতে দেখা যায় না। মাধ্যে মধ্যে পোলিং টিকা দেওয়ার সময় মাইকিং করা হয়।

তিনি বলেন, টিকাদানকর্মীরা যেদিন টিকা দেন, সেদিন কেন্দ্রের সামনে একটি ব্যানার টানিয়ে রাখেন। অভিভাবকরা নিজ দায়িত্বে শিশুদের নিয়ে টিকা দেন।

শামীমাবাদ এলাকার বাসিন্দা গৃহকর্মী রুমানা আক্তার বলেন, হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার পরে বাসা পরিবর্তন করেছিলাম। নতুন বাসার টিকাকেন্দ্রে যাওয়ার পর তারা দ্বিতীয় ডোজ দেয়নি, প্রথম ডোজ যেখান থেকে নেওয়া হয়েছে সেখান থেকে নেওয়ার কথা বলে। পরে আর পুরোনো ঠিকানায় গিয়ে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়নি।

সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন বলেন, হামের টিকার প্রথম ডোজ ও দ্বিতীয় ডোজের পার্থক্যের কারণ হলো অনেক অভিভাবক দ্বিতীয় ডোজটি দিতে চান না। এতে হাম রোগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি বলেন, অভিভাবকদের অসচেতনতা কাটাতে স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন এবং টিকাদানের আগের দিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোকজনকে জানিয়ে আসেন। অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও অভিভাবকদের অনীহা ও অসচেতনতার কারণে শিশুরা সময়মতো টিকা পাচ্ছে না। অভিভাবকদের এ ব্যাপারে আরও সচেতন হওয়ার কথা বলেন তিনি।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, রুটিন মাফিক প্রতিবছরই হামের দুই ডোজ টিকা দেওয়া হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে ক্যাম্পেইন করে হামের টিকা দেওয়া হচ্ছে না। হয়তো এজন্য কিছু শিশু বাদ পড়ছে।


শেয়ার করুনঃ

যাপিতজীবন থেকে আরো পড়ুন

সিলেট, হাম, রুবেলা, টিকা, সিভিল সার্জন, হামের টিকা

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ