২০ বছরেও নির্মাণ হয়নি সেতুর সংযোগ সড়ক
অনিয়ম-দুর্নীতি
প্রকাশঃ ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১১:০৪ পূর্বাহ্ন
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের বোরো ফসল রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে আবারও ব্যর্থ হয়েছে কর্তৃপক্ষ। ফলে ২০১৭ কিংবা ২০২২ সালের বন্যার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে কৃষকদের মধ্যে।
শুধুমাত্র কাজ শেষ করতে বিলম্ব নয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন নিয়ে অনিয়ম, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ এবং নিম্নমানের কাজের অভিযোগও রয়েছে কৃষকদের। তবে পূর্ববর্তী বছরের মতো এবারও এসকল অভিযোগে অস্বীকার করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, আজ শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) মধ্যে শতভাগ কাজ সম্পন্ন করার সময়সীমা হলেও ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শেষ হয়েছে ৭৬ শতাংশ কাজ। সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ায় ১৫ দিন সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে হাওর রক্ষা বাঁধ মনিটরিং ও বাস্তবায়ন কমিটি।
তবে কৃষকদের দাবি, বাস্তবে অর্ধেকের মতো কাজ হয়েছে। তাদের অভিযোগ, গত তিন বছরের মতো এবারও সময় বাড়িয়েও কাজ পুরোপুরি শেষ করা যাবে না।
এবছর সুনামগঞ্জের ৩৮টি হাওরে ৭১০টি প্রকল্পের আওতায় ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারকাজ চলছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪৫ কোটি টাকা। গত বছরের তুলনায় এ বছর বাঁধের দৈর্ঘ্য বেড়েছে ১১ কিলোমিটার, প্রকল্প কমেছে ২৫টি; তবে ব্যয় বেড়েছে ২০ কোটি টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এ বছর জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৪৫ হেক্টর জমি হাওরাঞ্চলে।
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাদদেশে অবস্থিত সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের নিজস্ব বাস্তুতন্ত্র রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে হাওরাঞ্চলের পানি নেমে গেলে বোরো আবাদ হয়, ফসল তোলা হয় এপ্রিল-মে মাসে। তবে মেঘালয়ে আগাম বর্ষণের ফলে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলের পানিতে ফসল তোলার সময় হাওরে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়ার আশঙ্কা থাকে।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকরা সংঘবদ্ধ হয়ে কয়েক দশক আগে পর্যন্ত নিজেরাই অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতেন। হাওরের ফসল রক্ষায় গুরুত্ব বিবেচনায় প্রায় দুইদশক আগে থেকে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। সেসময় ঠিকাদারদের মাধ্যমে বড় বাঁধ এবং পিআইসির মাধ্যমে ছোট মেরামত করার রীতি ছিল।
২০১৭ সালের মার্চের শেষ সপ্তাহে আগাম বন্যায় সুনামগঞ্জসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর বোরো ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। সে সময় বাঁধ নির্মাণে ঠিকাদার এবং পিআইসির অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।
সেবছরই বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে ‘কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা)’ নীতিমালা সংশোধন করা হয়। সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি বছর ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পিআইসি গঠন, ১৫ ডিসেম্বরের আগে কাজ শুরু এবং ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে।
তাহিরপুর, ছাতক, বিশ্বম্ভরপুর, ধর্মপাশা, মধ্যনগর ও জামালগঞ্জ উপজেলার ১৫ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারও বাঁধের কাজ একদিকে যেমন বিলম্বিত হচ্ছে, অন্যদিকে স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবে পিআইসি গঠন, ভালো মানের কাজ করতে টালবাহানসহ নানা অনিয়ম রয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলার ঘাগটিয়া গ্রামের কৃষক আবদুল কাইয়ুম বলেন, ‘চার একর জমিতে বোরো করেছি। শান্তিতে ধান তুলতে চাই। কিন্তু বাঁধের কাজের যে গতি, তাতে আবারও দুশ্চিন্তা হচ্ছে।’
বাঁধ নিয়ে সার্বিক প্রসঙ্গে অসন্তোষ থেকে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জ শহরে মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানিয়েছে হাওর বাঁচাও আন্দোলন।
সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, পিআইসি গঠন, প্রকল্প বাছাই, কাজের মান তদারকি ও সময়মতো কাজ শেষ না হওয়া– এসবল শুধু আমলাতান্ত্রিক ব্যর্থতা নয় বরং সব মিলিয়ে এটি ধারাবাহিক ব্যর্থতার একটি নজির।
সুনামগঞ্জে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী ও বাঁধ নির্মাণে জেলা কমিটির সদস্যসচিব মামুন হাওলাদার কৃষক ও অধিকারকর্মীদের সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, পিআইসিতে অন্তর্ভুক্ত না হওয়া ব্যক্তিরাই অধিকাংশ সময় অভিযোগ করেন; তদন্তে বেশির ভাগ অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের কারণে সপ্তাহখানেক কাজ ব্যাহত হয়েছে। এছাড়াও অনেক এলাকায় হাওরের পানি দেরিতে নামায় কাজ শুরুতেও বিলম্ব হয়েছে। এসকল কারণে সময়মতো কাজ শেষ করা যায়নি। তবে আপাতত ১৫দিন সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে এবং বর্ধিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা যাবে।’
এদিকে হাওরে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কাজের সার্বিক পরিস্থিতি পরিদর্শনে আজ সুনামগঞ্জে এসেছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা উপজেলার বিভিন্ন বাঁধ পর্যবেক্ষণ করবেন বলে জানিয়েছেন পাউবোর এ কর্মকর্তা।
হাওর রক্ষা বাঁধ, সুনামগঞ্জ, পিআইসি, পানি সম্পদ মন্ত্রী