২২ এপ্রিল ২০২৬

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ / পরিবেশ

শাহ আরেফিন টিলা

‘কঙ্কালের’ বুকেও চলছে পাথরখেকোদের তাণ্ডব

আহমেদ জামিল

প্রকাশঃ ২০ জানুয়ারী, ২০২৬ ১০:২১ পূর্বাহ্ন

ছবিঃ সিলেট ভয়েস

মাটি থেকে অন্তত ৫০ ফুঁট উচু টিলা। হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর অন্যতম সফরসঙ্গী হজরত শাহ আরেফিন (রহ.) এর মাজার সংশ্লিষ্ট এই টিলার আয়তন প্রায় ৫০০ একর। প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক ‘শাহ আরেফিন’ টিলার নিচে স্তরে স্তরে ছিল ছোট-বড় অসংখ্য পাথর। 


পাথরখেকোদের তাণ্ডবে সেই টিলা এখন ‘কঙ্কাল’ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবুও রেহাই পাচ্ছে না শাহ আরেফিন টিলা। সেই কঙ্কালের বুকেও তাণ্ডব চালাচ্ছে পাথরখেকোরা। শাহ আরেফিনের ধ্বংসস্তুপের বুকে বসানো হয়েছে অবৈধ ‘বোমা মেশিন’ (পাথর ভাঙার কল)। সঙ্গে রয়েছে কোদাল আর বেলচার খোঁচা। 


আবার ধ্বংসস্তুপের মাটি ওলট-পালট করেও লুট করা হচ্ছে পাথর। দফায় দফায় শাহ আরেফিন টিলাকে লণ্ডভন্ড করার পরেও শেষ ‘রক্তটুকুও’ নিংড়ে নিতে মরিয়া পাথরখেকোরা।


পাথর লুটের ঘটনায় গত ৬ জানুয়ারি সাড়ে চারশ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো। তার এক সপ্তাহ আগে আরও শতাধিক ব্যক্তিকে আসামী করে পৃথক মামলা দায়ের করেছে কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশ। 


এর আগে গত ১০ নভেম্বর সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম শাহ আরেফিন টিলা পরিদর্শন করে ধ্বংসযজ্ঞ দেখে হতবাক হয়ে পড়েন। তার পরিদর্শনের পর পাথর লুট ঠেকাতে সিলেট-ভোলাগঞ্জ সড়কের পাশে আরেফিন টিলার সড়কে লোহার বেষ্টনী বসানো হয়। 


কিন্তু লোহার বেষ্টনীও আটকাতে পারেনি পাথর লুট। পাথরখেকোরা শাহ আরেফিন টিলা থেকে বিকল্প পথে ফসলী জমির উপর দিয়ে ট্রলিতে করে পাথর লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। লুট করা এসব পাথর ভোলাগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন ক্রাশার মেশিনে (পাথর ভাঙার মেশিন) ভাঙিয়ে ট্রাকে করে সারাদেশে পৌছে দিচ্ছে।


এদিকে, সিলেট নগরী থেকে ভোলাগঞ্জ পর্যন্ত পুলিশের অন্তত ৫-৬টি চেকপোস্ট থাকার পরও লুট করা পাথর ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিটি চেকপোস্টে পাথরবহনকারীর ট্রাক আটকানো হচ্ছে ঠিকই। তবুও এসব পাথরবাহী ট্রাক প্রতিটি চেকপোস্ট পাড়ি দিয়ে সিলেট থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে। এতে করে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠছে। 


স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালের দিকে শাহ আরেফিন টিলায় পাথরখেকোদের প্রথম নজর পড়ে। এরপরই প্রকাশ্যে চলতে থাকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন। ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের দিকে এখানে পাথর উত্তোলনে অবৈধ ‘বোমা মেশিনের’ (পাথর ভাঙার কল) ব্যবহার শুরু হয়। গত আড়াই দশকে পাথর ও মাটি সাবাড় করে নেওয়ায় একসময়ের অনিন্দ্যসুন্দর টিলা এখন অনেকটা ‘কঙ্কাল’ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সুযোগে পাথরখেকোরা ফের তাণ্ডব চালায়। শুধু এই টিলা থেকেই শতকোটি টাকার পাথর লুট করে দুর্বৃত্তরা। ধ্বংসলীলার পর কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন। বসানো হয়েছে পুলিশ চেকপোস্ট, বাড়ানো হয়েছে টহল। তবুও থেমে নেই পাথরখেকোরা। 


বৃহস্পতিবার সরজমিনে শাহ আরেফিন টিলা ঘুরে দেখা গেছে, প্রাকৃতিক টিলার কোনো অস্থিত্বই নেই। মাটি খুড়ে পাথর উত্তোলনের কারণে লন্ডভন্ড অবস্থা শাহ আরেফিনের। ধ্বংসস্তুপের বুকে বোমা মেশিন বসিয়ে ফের গর্ত করে পাথর তুলছেন শ্রমিকরা। কেউ কেউ বেলচা ও কোদাল দিয়েও তুলছেন পাথর। কিছু জায়গায় ধ্বংসস্তুপের মাটি সরিয়েও তোলা হচ্ছে পাথর। এসব পাথর ট্রলিতে করে টিলা থেকে নিয়ে আসা হচ্ছে। 


পুলিশ ও প্রশাসনের অভিযানের ভয়ে পাথর বোঝাই প্রতিটি ট্রলি মূল সড়ক ব্যবহার না করে ফসলি জমি দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ভোলাগঞ্জ এলাকায়। সেখানে স্টোন ক্রাশার মেশিনে নিয়ে সেগুলো ভাঙা হয়। এরপর ট্রাকে করে পাঠানো হয় সিলেটের বাইরে।


পাথর ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ভারত থেকে কোনো পাথর আমদানি হচ্ছে না। ভোলাগঞ্জ আমদানি রপ্তানীকারক সমিতির সভাপতি শাহাব উদ্দিন বলেন, প্রায় মাসখেনেকের সময় বেশি সময় ধরে পাথর আমদানি করা হচ্ছে না। ভোলাগঞ্জ শুল্ক স্টেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঝামেলা থাকায় ব্যবসায়ীরা পাথর আমদানি করছেন না। 


অথচ ভোলাগঞ্জ এলাকার সবকটি ক্রাশার মেশিন চলছে দিব্যি। সেখানে ছোট-বড় পাথর ভাঙার কাজ করছেন নারী-পুরুষ শ্রমিকরা। 


সরজমিনে ভোলাগঞ্জে অবস্থান করে দেখা গেছে, শাহ আরেফিন টিলা থেকে ট্রলি ট্রলি পাথর এসে ঢুকছে ভোলাগঞ্জের বিভিন্ন স্টোন ক্রাশার মিলে। পরে খুব দ্রুত এগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো করা হচ্ছে। কম সময়ে পাথরগুলো ভাঙার জন্য প্রতিটি ক্রাশার মিলে অনেক শ্রমিক কাজ করছেন। তবে এরা কেউই কথা বলতে চাননি। 


প্রকাশ্যে পাথর লুট করে এনে ক্রাশার মিলে ভাঙা হলেও উপজেলা প্রশাসনের কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি। এমনকি যেখানে পাথর ভাঙার ব্যাপক কর্মযজ্ঞ সেখান থেকে দূরে পুলিশের চেকপোস্ট। অর্থাৎ শাহ আরেফিন থেকে পাথর নিয়ে ক্রাশার মিল পর্যন্ত পৌঁছাতে যেটুকু সড়ক অতিক্রম করতে হয়, সেখানে প্রশাসনের কোনো তৎপরতা না থাকায় এই সুযোগটুকুই কাজে লাগায় পাথরখেকোরা।  


এদিকে, পাথর লুটের ঘটনায় গত ৬ জানুয়ারি ৫০ জনের নামোল্লেখ করে অজ্ঞাত ৪০০ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর মহাপরিচালক (যুগ্মসচিব) মো. আনোয়ারুল হাবীব। 


এর আগে, গত ৩০ ডিসেম্বর কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে পাথর লুটে জড়িত তিনজনকে আটক করেছে। পরে এ ঘটনায় ওইদিনও থানার উপপরিদর্শক মো. কামরুল আলম বাদি হয়ে ৪৭ জনের নামোউল্লেখ করে আরও অজ্ঞাত ৬০জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেছেন। 


পাথর লুট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিন মিয়া বলেন, পাথর লুট ঠেকাতে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি।  শুক্রবার অভিযান পরিচালনা করে ৪০টি মেশিন ভাঙা হয়েছে। গত সপ্তাহে শাহ আরেফিন টিলায় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

 

কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, শাহ আরেফিন টিলা বিশাল আয়তনের। এখানে পাথর লুটকারীরা নতুন নতুন জায়গা খুঁজে পাথর তুলে। তবুও আমরা পুলিশি টহল বৃদ্ধিসহ পাথর লুট বন্ধে কাজ করছি।


তিনি বলেন, পুলিশের দায়ের করা মামলায় এখন পর্যন্ত ১৭জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। খনিজ সম্পদ ব্যুরোর দায়ের করা মামলার আসামীদেরও খোঁজা হচ্ছে। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি কিন্তু লুটতরাজের সংখ্যা বেশি হওয়া নিয়ন্ত্রণে আসছে না।


সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, শাহ আরেফিনে আর কিছু নেই। সব শেষ করে দেওয়া হয়েছে। পাথর লুটের ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব আসামীদের ধরতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 


শেয়ার করুনঃ

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ থেকে আরো পড়ুন

সিলেট, শাহ আরেফিন টিলা, কোম্পানীগঞ্জ, পাথর লুট,

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ