কাজ থাকলে আয়, না থাকলে ধার: সিলেট নগরীর শ্রমিকদের বাস্তবতা
দৈনন্দিন
প্রকাশঃ ২ ডিসেম্বর, ২০২৫ ৬:২৪ অপরাহ্ন
সিলেট নগরীর বাসিন্দাদের নিত্যদিনের যাতায়াতের অন্যতম ভরসা সিএনজিচালিত অটোরিকশা। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ এই যানটির ওপরই নির্ভরশীল। যদিও কাগজে–কলমে সিএনজি ‘প্রাইভেট যান’ হিসেবে নিবন্ধিত, বাস্তবে এটি নগরের একমাত্র গণপরিবহন হিসেবেই চলাচল করছে।
নির্দিষ্ট ভাড়া না থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই যাত্রীদের অভিযোগ চালকরা নিজের মতো করে ভাড়া নেন। এতে প্রায়ই যাত্রী–চালকের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। অনেক সময় যাত্রীদের চালকদের রোষানলও সহ্য করতে হয়। এ অবস্থায় নির্দিষ্ট ভাড়া নির্ধারণের দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু এতদিন কোনো সুরাহা মিলছিল না।
অবশেষে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) সিএনজিচালিত অটোরিকশার প্রস্তাবিত ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করেছে। তবে ‘প্রাইভেট যান’ হিসেবে পাঁচজন যাত্রী বহনের ভিত্তিতে এই ভাড়া নির্ধারণ করায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিয়ম মেনে তিনজন যাত্রী বহন করলে যাত্রীদের ওপরই অতিরিক্ত ভাড়ার বোঝা পড়বে বলে মনে করছেন অনেকে। আবার আগের মতো অনিয়ম করে পাঁচজন যাত্রী তুললে ভাড়া তুলনামূলক কম থেকে যাবে। ফলে বাস্তবে চালকেরা কোন নিয়ম মানবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অতীতে কয়েক দফা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেও সফল হয়নি এসএমপি।
এসএমপি বলছে, এটি একটি প্রস্তাবিত তালিকা। আপাতত পাঁচজন যাত্রীর ভিত্তিতেই ভাড়া ধরা হয়েছে। যাত্রী ও চালকদের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে ভবিষ্যতে ভাড়ার ধরন চূড়ান্ত করা হবে।
গত সোমবার রাতে এসএমপির ফেসবুক পেজে কমিশনার আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরীর স্বাক্ষরে ভাড়ার প্রস্তাবিত তালিকা গণবিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ, সিএনজি মালিক–শ্রমিক প্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের মতামতের ভিত্তিতে ভাড়ার প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে নগরবাসীকে ই–মেইল ও মোবাইল নম্বরে মতামত পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত তালিকা অনুযায়ী সিলেট নগরীর বিভিন্ন স্থানে চলাচলের জন্য সর্বনিম্ন ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৮০ টাকা ভাড়া প্রস্তাব করা হয়েছে। আর ঘন্টা ভিত্তিতে ভাড়ার জন্য প্রতিঘন্টা ১৫০ টাকা ও পরবর্তী প্রতি ৩০ মিনিট ৭৫ টাকা করে প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত তালিকা অনুযায়ী- বন্দরবাজার, কোর্ট পয়েন্ট থেকে আম্বরখানা, টিলাগড়, এমসি কলেজ, শিবগঞ্জ, হুমায়ূন রশিদ চত্তর, দক্ষিণ সুরমা বাসটার্মিনাল, ওসমানী মেডিকেল, রিকাবীবাজার, মধুশহীদ, ঘাসিটুলা, শেখঘাট, কলাপাড়া, লামাবাজার পর্যন্ত ৬০ টাকা, পাঠানটুলা, মদিনা মার্কেট, সুবিদবাজার, ইসলামপুর, মেজরটিলা বাবনা পয়েন্ট ৭৫ টাকা, আখালিয়া, শাহজালাল ভার্সিটি, কুমারগাঁও বাসটার্মিনাল ৯০ টাকা, টুকেরবাজার, শাহজালাল ইউনিভার্সিটি গেইট, আখালিয়া, কুমারগাঁও বাস টার্মিনাল, শাহপরান (রহঃ) মাজার গেইট, খাদিম, টুকের বাজার ১২০ টাকা, মাসুক বাজার ১৫০, বিমানবন্দর, ক্যাডেট কলেজ, বড়শলা ১৭৫, বটেশ্বর, পীরের বাজার ১৮০ টাকা।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল গেইটের সম্মুখ থেকে বন্দরবাজার কোর্ট পয়েন্ট, আম্বরখানা পর্যন্ত ৬০ টাকা, কুমারগাও বাসটার্মিনাল, তেমুখি পয়েন্ট, টুকের বাজার ১০০ টাকা।
আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে বন্দরবাজার পয়েন্ট, সুরমা পয়েন্ট, কোর্ট পয়েন্ট, পাঠানটুলা, মদিনা মার্কেট, সুবিদবাজার, বন্দরবাজার পর্যন্ত ৬০ টাকা, টিলাগড়, এমসি কলেজ, বালুচর, টুকেরবাজার ৭৫ টাকা,
বড়শলা, ক্যাডেট কলেজ, কোম্পানীগঞ্জ বাইপাস ৯০ টাকা, শাহপরান (রহঃ) মাজার গেইট, খাদিম, বিমানবন্দর, বাদাঘাট, সোনাতলা, মইয়ারচর, জালালাবাদ থানা ১২০ টাকা, সালুটিকর ১৫০ টাকা, লামাকাজী ১৮০ টাকা। হুমায়ুন রশিদ চত্তর থেকে ওসমানী মেডিকেল ১২০ টাকা, কুমারগাঁও বাসটার্মিনাল ১৫০ টাকা।
রেলষ্টেশন পর্যন্ত বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার, তালতলা, জিতু মিয়া পয়েন্ট, চকের বাজার, নয়াবাজার, সিলাম, মোহম্মদপুর, বলদী আলশপাশ এলাকা পর্যন্ত ৯০ টাকা, ওসমানী মেডিকেল, লামাবাজার, রিকাবীবাজার পর্যন্ত ১২০ টাকা, আম্বরখানা সুবিদবাজার, মাজারগেইট আশপাশ এলাকা ১৫০ টাকা, কুমারগাঁও, টুকেরবাজার ১৮০ টাকা। টুকেরবাজার, তেমুখি থেকে আম্বরখানা, সুবিদবাজার, লামাকাজী, মোঘলাগাঁও, শিবেরবাজার, পিটারগঞ্জবাজার পর্যন্ত ৯০ টাকা।
মোগলাবাজার থেকে জালালপুর বাজার ৭৫ টাকা, রাখালগঞ্জ বাজার, আনিলগঞ্জ ৯০ টাকা, ক্বীনব্রীজ, কদমতলী, বাসটার্মিনাল, হুমায়ুন রশিদ চত্তর আশপাশ এলাকায় ১২০ টাকা। খালোমুখ থেকে কীনব্রীজ, কদমতলী, হুমায়ূন রশিদ চত্তর, কদমতলী বাসটার্মিনাল, রেলষ্টেশন পর্যন্ত ৯০ টাকা।
কদমতলী মুক্তিযোদ্ধা পয়েন্ট থেকে গোটাটিকর, পাসপোর্ট অফিস, কুশিঘাট আশপাশ এলাকায় ৬০ টাকা, পাঁচমাইল, সিরাজ উদ্দিন চত্তর পর্যন্ত ৬০ টাকা, হেতিমগঞ্জ (মেট্রোপলিটন এলাকার বাহিরে) ১৫০ টাকা। শাহপরান মেইন গেইট থেকে আম্বরখানা, বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার, সুরমা পয়েন্ট আশপাশ এলাকায় ১২০ টাকা।
কীন ব্রীজ, দক্ষিণপাড় (ভার্থখলা, বাবনা পয়েন্ট) থেকে চন্ডিপুল, দক্ষিণ সুরমা থানায় ৬০ টাকা, জালালপুর, কলাবাগান পর্যন্ত ১২০ টাকা, বিশ্বনাথ (কামাল বাজার হয়ে) ১৮০ টাকা। চন্ডিপুল থেকে জালালপুর বাজার ৭৫ টাকা, বন্দরবাজার, সুরমা পয়েন্ট, জিতুমিয়া পয়েন্ট, তালতলা, সোবহানীঘাট বাজার, উপশহর পয়েন্ট পর্যন্ত ৯০ টাকা, রিকাবীবাজার, ওসমানী মেডিকেল আশপাশ এলাকায় ১২০ টাকা।
জেল রোড পয়েন্ট থেকে নোয়াগাঁও, সাদীপুর, সাদাটিকর, বুরহানউদ্দিন মাজার, কুশিঘাট পর্যন্ত ৭৫ টাকা, মুক্তিরচক, মীরেরচক/শাহপরাণ (রঃ) থানা গেইট, মুরাদপুর বাজার পর্যন্ত ১২০ টাকা।
জালালাবাদ গ্যাস অফিস সংলগ্ন মেন্দিবাগ থেকে শাহজালাল উপশহর, শিবগঞ্জ পর্যন্ত ৫০ টাকা। শাহী ঈদগাহ থেকে আম্বরখানা ৫০ টাকা, জেলরোড পয়েন্ট ৬০ টাকা। বালুচর পয়েন্ট এমসি কলেজ ছাত্রাবাস সংলগ্ন এলাকা থেকে টিলাগড় ৫০ টাকা, আম্বরখানা ৬০ টাকা। জালালাবাদ গ্যাস অফিস সংলগ্ন মেন্দিবাগ থেকে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত ১৮০ টাকা।
এদিকে, ফেসবুকে এসএমপির জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে মো. ফয়সল আহমদে নামে এক ব্যক্তি কমেন্ট করেন ‘সিএনজি যাত্রী কয়জন বহন করবে? এটা নির্ধারণ জরুরি। রিজার্ভ ভাড়ার হার ঠিক আছে এটা।’
মোহাম্মদ সজিব আহমেদ নামে আরেকজন কমেন্টে লিখেন, ‘যারা এই ভাড়া ঠিক করেছেন তারা ভাড়া সম্বন্ধে কোন আইডিয়াই রাখেন না।’
এ বিষয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক) সুদীপ্ত রায় বলেন, সিএনজিচালিত অটোরিকশা প্রাইভেট যান হলেও সিলেটে এটি গণপরিবহণ হিসেবে চলাচল করছে। আমরা ভাড়া নির্ধারণের জন্য যে প্রস্তাবনা তৈরি করেছি, সেটি প্রাইভেট হিসেবে হলেও ৫জন যাত্রী চলাচলের জন্য প্রযোজ্য হবে। এক্ষেত্রে ভাড়া অনেকটা কমেছে। এটি নির্ধারণ করতে সকল শ্রেণিপেশার প্রতিনিধির মতামত নেওয়া হয়েছে। এখন চালকরাও সেটা মানার কথা। এজন্য আমরা এটি গণ বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করেছি। যদি কোনো অভিযোগ না থাকে তাহলে পরবর্তীতে এটি চূড়ান্ত করা হবে। আর যদি অভিযোগ আসে সেগুলোও যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে।
সিলেট, অটোরিকশা, সিএনজি, ভাড়া, পুলিশ