অভিবাসন নয়, মৃত্যুযাত্রা: সিলেটের করুণ বাস্তবতায় দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন
সম্পাদকীয়
প্রকাশঃ ২১ নভেম্বর, ২০২৫ ১০:৫০ অপরাহ্ন
নরসিংদীর মাধবদীতে উৎপন্ন ৫.৭ মাত্রার যে ভূমিকম্পে কেঁপেছে রাজধানী, হারিয়েছে অন্তত ১০টি প্রাণ; তা আমাদের জন্য একটি সাবধানবাণী। প্রাকবিধ্বংসী সংকেত, যা জানান দিচ্ছে আমাদের মহানগরগুলো কতটা অসুরক্ষিত।
ভূতাত্ত্বিক অবস্থানগত কারণে সম্পূর্ণ বাংলাদেশই ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। আর যেসকল বড় মহানগরী ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পর সিলেট তার মধ্যে অন্যতম।
প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের বাস্তবতায় ঐতিহ্যগতভাবে সিলেটের অবস্থান সবচেয়ে বিপজ্জ্নক। ১৮৯৭ সালে ‘গ্রেট আসাম ভূমিকম্প’ কিংবা ১৯১৮ সালের ‘শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প’– এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতিকে পাল্টে দিয়েছিলো অনেকাংশে। চালিয়েছিলো ব্যাপক ধ্বংসলীলা।
সিলেটের অবস্থান ডাউকি ফল্ট লাইনের খুব কাছে, যা শিলং প্লেটোর দক্ষিণ প্রান্ত। অত্যন্ত সক্রিয় এই ফল্টের কারণে প্রায় শতবর্ষ পরেও আমরা আবারও সেই প্রলয়ের মুখোমুখি; বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে কোন সময় এই অঞ্চলে সংঘটিত হতে পারে শক্তিশালী ভূমিকম্প, নামবে প্রবল বিপর্যয়।
বড় ভূমিকম্প হলে সিলেট কীভাবে প্রবল বিপর্যয়ের মুখে পড়বে – এ নিয়ে প্রশ্নের যেমন শেষ নেই, তেমনি উত্তর খুঁজতে হয়েছে অজস্র গবেষণা। বিশেষজ্ঞরা খুঁজে বের করেছেন কেনো সিলেট নগরী ব্যাপক ধ্বংসলীলার মুখোমুখি হবে।
বিভিন্ন গবেষণায় তারা জানিয়েছেন যে টিলা কেটে ও জলাশয় ভরাট করে অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে এই এলাকার মাটির তরলতা ও ভিত্তি ক্ষয় হয়েছে, তাছাড়া কিছু এলাকায় রয়েছে ঘনবসতি যা বেশি ধ্বংসযজ্ঞে সহায়তা করবে।
তবে শুধুমাত্র অবকাঠামোগত ঝুঁকি নয়, বরং ভূমিকম্পের সময় নিরাপত্তা বিষয় সক্ষমতা ও ভুমিকম্প পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমের সক্ষমতারও রয়েছে চরম ঘাটতি। অতীতে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু সচেতনতা ক্যাম্পেইন কিংবা প্রশিক্ষণ-কর্মশালা ইত্যাদির আয়োজন দেখলেও সমন্বিত রেসপন্সের অনুশীলন একেবারেই হয়নি– ফলে ভূমিকম্পের ফলে হতাহতের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।
ভূমিকম্প ঝুঁকি নিরসনে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্মপদ্ধতি গ্রহণের জন্য আহবান জানিয়েছেন এবং সচেতন নাগরিকরা সেসকল সুপারিশ বাস্তবায়নে বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ সিলেট সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসনের কাছে দাবি জানালেও কখনোই খুব কার্যকর কোন উদ্যোগ দেখা যায় না। বরং ছোট-মাঝারি ভূমিকম্পের পর কিছুদিন তোড়জোড় দেখা দেয়– তারপর সেই পুরাতন চিত্র ফিরে আসে।
এবার অন্তত বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদের সক্ষমতা দেখানোর সময় এসেছে। শুধুমাত্র লোকদেখানো কার্যক্রম যেমন ফুটপাত থেকে হকার অপসারণ কিংবা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা অপসারণে সীমাবদ্ধ থেকে নয়– বাসযোগ্য সিলেট নগরী গড়ে তুলতে নগরীর ভবিষ্যৎ ভূমিকম্প ঝুঁকির বিষয়ে দ্রুত ও বাস্তবসম্মত সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। সিলেটবাসীর জন্য মায়াকান্না কেবলমাত্র বক্তব্য, লেখালেখি এবং সংবাদমাধ্যমের সরাসরি সম্প্রচারে দর্শনদারীমূলক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ না রেখে বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় প্রকৃত কর্মপদ্ধতি নিরূপণ করতে হবে।
এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের গবেষণাপত্রের সুপারিশের আলোকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ৫টি সুনির্দ্দিষ্ট সুপারিশ রাখছি।
ভূমিকম্প কোন অলীক-অবাস্তব কোন সম্ভাবনা নয়, বরং বাস্তবসম্মত একটি দুর্যোগ যার প্রমাণ আমরা চাক্ষুষ করেলাম ঢাকা ভূমিকম্পের ঘটনায়। ভূমিকম্প এমন এক দুর্যোগ যা আমরা আগে থেকে জানতেও পারবো, প্রতিরোধও গড়তে পারবো না– কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারবো অনেকাংশেই।
এই নগরী ১৯৮৭ সালের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প চাক্ষুষ করেছে, যে ভূমিকম্প এই নগরীর সকল দালান ধ্বংস করে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছিলো। কিন্তু সে সময়কার সচেতন সিলেটবাসী সেই ভূমিকম্প থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তীতে আসাম প্যাটার্নের বর্গা-ব্যাটনের বাড়ি নির্মাণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার একটি দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন।
শতবর্ষ পরে আমরা পূর্বপুরুষের শিক্ষা ভুলে বর্গা-ব্যাটন গুড়িয়ে দিয়ে একের পর একে দালান নির্মাণ করে চলেছি। এবার যেনো আমাদের আবারো দূরদর্শী হতে আরেকটি ভূমিকম্পের হত্যাযজ্ঞের মুখোমুখি না হতে হয়, সেই প্রত্যাশা ও উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে সচেতন সিলেটবাসীকেই- নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে।
সিলেট, ভূমিকম্প, সম্পাদকীয়, ভূমিকম্পে করণীয়, সুপারিশ, সিলেট সিটি কর্পোরেশন, সিলেট জেলা প্রশাসন,