সুনামগঞ্জে সাড়ে ৩ লাখ শিশুকে দেয়া হবে হাম-রুবেলার টিকা
যাপিতজীবন
প্রকাশঃ ২০ নভেম্বর, ২০২৫ ১:০১ অপরাহ্ন
সিলেট অঞ্চলে যক্ষ্মা এখনো বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে টিবির (যক্ষ্মা) সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন চা বাগানে বসবাসকারী সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী। অপুষ্টি, ঘনবসতি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও চিকিৎসাসেবায় সীমাবদ্ধতা এসব কারণেই এই অঞ্চলে যক্ষ্মার প্রকোপ বেশি।
জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সিলেট বিভাগীয় অফিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সিলেটে শিশুদের যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ার হার প্রতি বছরই বেড়ে চলেছে। ২০২১ সালে শিশু আক্রান্তের হার ছিল ৩.৯৮ শতাংশ। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫.১৫ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৮.৬৬ শতাংশে।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল বলেন, ‘চা বাগানে বসবাসকারী মানুষ এখনো ন্যূনতম স্বাস্থ্যমানের বাইরে। অতিরিক্ত ভিড়, অস্বাস্থ্যকর ঘরবাড়ি, অপুষ্টি, নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার, এমনকি গবাদিপশুর সঙ্গে একই ঘরে বসবাস—এসব কারণে যক্ষ্মার সংক্রমণ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পাঁচ থেকে আটজন একসঙ্গে একটি ঘরে থাকার ফলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।’
সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন জন্মেজয় দত্ত বলেন, ‘চা বাগানের অনেক বাসিন্দাই অপুষ্টিতে ভোগেন। তাই যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় চা বাগানের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, সন্দেহভাজনদের থুতু সংগ্রহ করে পরীক্ষা—এসব কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।’
হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. রত্নদ্বীপ বিশ্বাস বলেন, ‘দীর্ঘস্থায়ী কাশি, রক্ত ওঠা, বুকে ব্যথা, ওজন কমে যাওয়া, জ্বর এবং রাতের ঘাম—এগুলো যক্ষ্মার লক্ষণ। চা শ্রমিকরা সাধারণত নিম্নমানের পরিবেশে বসবাস করেন এবং পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার পান না। তাই তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।’
মৌলভীবাজার জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, ‘মৌলভীবাজারে সপ্তাহে পাঁচদিন এক্স-রে মাধ্যমে টিবি রোগ শনাক্ত করা হচ্ছে। এখানে শিশুদের রোগ নির্ণয়ের হার তুলনামূলক বেশি।’
হিড টিবি কন্ট্রোল প্রোগ্রাম–জিএফএটিএম–এর ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক রায়হান আহমেদ বলেন, ‘মৌলভীবাজার জেলা পুরো দেশের মধ্যে যক্ষ্মা সংক্রমণের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি। দুর্বল পুষ্টি, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, টিবি-পজিটিভ রোগীর সংস্পর্শ এবং স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাব এসবই মূল কারণ। শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ এবং কুলাউড়া উপজেলার সব টিবি রোগীর ৬৫ শতাংশই চা বাগানের কর্মী।’
২০২৪ সালে মৌলভীবাজারে মোট ৪ হাজার ৬৬৪ জন টিবি রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে এক হাজার ৫০৩ জন (৩৫ শতাংশ) ছিলেন চা শ্রমিক। ওই বছর শিশু টিবি রোগী শনাক্তের হার ছিল ৮ শতাংশ যা জাতীয় গড়ের তুলনায় বেশি।
জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সিলেট বিভাগীয় কনসালটেন্ট শহীদ আনোয়ার বলেন, ‘চা বাগানের পরিবেশ যক্ষ্মা সংক্রমণের জন্য আদর্শ। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে যক্ষ্মার হার ১৪ বছরের নিচের বয়সীদের মধ্যে ৮ শতাংশ। অনেক সময় তারা আক্রান্ত দাদা–পিতামহের সংস্পর্শে থাকে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় ঝুঁকিও বেশি। কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে রোগ শনাক্ত করাও কঠিন।’
স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম বলেন, ‘সচেতনতার অভাব ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কারণে এই সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীতে শুধু যক্ষ্মা নয়, কুষ্ঠের মতো রোগও ছড়িয়ে পড়ে। আমরা সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করছি।’
সিলেট, যক্ষা, শিশু, চা বাগান