১৮ জুন ২০২৬

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

সোচ্চার সংগঠন ও নাগরিকদের আহ্বান: ‘মিনিস্টার বাড়ি’ হোক সিলেটের প্রথম পুরাকীর্তি মিউজিয়াম

প্রকাশঃ ২৬ অক্টোবর, ২০২৫ ৭:০৮ অপরাহ্ন

ছবিঃ ফাইল ছবি

সিলেট নগরীর পাঠানটুলা এলাকায় সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের পাশে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘মিনিস্টার বাড়ি’। চুন-সুরকির ছাদওয়ালা ‘লেট-ব্রিটিশ’ স্থাপত্যশৈলীর এই বাড়িটি চারপাশের বহুতল ভবনের মাঝে এখনো দৃষ্টি কেড়ে নেয়। বাড়িটির মালিক ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের আসামের মন্ত্রীখ্যাত রাজনীতিক আবদুল হামিদ। প্রায় ৯৫ বছর টিকে থাকা এই আসামস্মৃতির নিদর্শনটি এখন নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুখে। 

 

ভারত বর্ষের ইতিহাস সূত্রে জানা গেছে, বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন আইনজীবী, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ আবদুল হামিদ। তিনি ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের ব্যবস্থাপক সভার সদস্য এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। সেই সূত্রেই বাড়িটি ‘মিনিস্টার বাড়ি’ নামে পরিচিতি পায়। এই বাড়িতে অতিথি হিসেবে এসেছিলেন তৎকালীন বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব-মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ অনেকে। বিগত সরকারের দুই মেয়াদে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা লেখক ও ইতিহাসবিদ আবুল মাল আবদুল মুহিত তার আত্মজীবনী গ্রন্থে এই বাড়ির উল্লেখ করেছেন। মিনিস্টার আবদুল হামিদ তার দাদা ছিলেন।

 

২৪ অক্টোবর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পরিদর্শন থেকে জানা গেছে, ব্যক্তিমালিকানাধীন ঐতিহ্যবাহী এই বাড়িটি ভাঙা হচ্ছে পারিবারিক প্রয়োজনে। ভাঙার কাজ শুরু হয় ২০ অক্টোবর। অধিদপ্তর মালিকপক্ষকে এক সপ্তাহ ভাঙার কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। এ নির্দেশনা অমান্য করে চলছিল ভাঙার কাজ। ২৬ অক্টোবর স্থপতিদের সংগঠন ‘ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ’ (আইএবি) সদস্য ও স্থপতি বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অংশ গ্রহণে বাড়িটি রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন করে ‘পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট, সিলেট। 

 

এতে আইএবি সিলেট শাখার সাধারণ সম্পাদক স্থপতি রাজন দাশ, পুরাকর্তী সংরক্ষণ সচেতনতার সংগঠন ‘সেভ দ্যা হেরিটেজ’-এর পক্ষে সাংবাদিক উজ্জ্বল মেহেদী, পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট-এর ট্রাস্টি রেজাউল কিবরিয়া, টিআইবির সচেতন নাগরিক কমিটির সৈয়দ মনির হেলাল, সিনিয়র সাংবাদিক আব্দুল কাদের তাপাদার, রাজনীতিবিদ ও সমাজকর্মী রেজাউল করিম আলো,  বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মী মোহাম্মদ আজিজুর রহমান, সিলেট লেখিকা সংঘের সাধারণ সম্পাদক ইশরাক জাহান জেলী, যুব ইউনিয়নের প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিউর রহমান, সাংবাদিক নাবিল হোসেন, মনোয়ার পারভেজসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও গণমাধ্যম কর্মীরা একাত্ম হন। 

 

বাড়িটি যেদিন ভাঙা হয়, সেদিন ফেসবুকে প্রথম লাইভ সম্প্রচার করা ‘ভয়েস টোয়েন্টিফোর’-এর কনটেন্ট ক্রিয়েটর আবদুর রহমান হীরা। সংরক্ষণ দাবির বিষয়টি তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ায়। বাংলাদেশে 'আরবান স্টাডি গ্রুপ' এর পরিচালক স্থপতি তৈমুর ইসলাম কর্তৃপক্ষের নজরে দেন। এ নিয়ে নাগরিক প্রতিবাদে তার সমর্থন ছিল। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরসহ সিলেটের ঐতিহ্য সচেতন মানুষের সঙ্গে স্থপতি তৈমুর ইসলামের যোগাযোগ মূলত নাগরিক প্রতিবাদের সূত্রপাত ঘটায়।

 

মানববন্ধন চলাকালেও বাড়িটি ভাঙার কাজ চলছিল। গণমাধ্যমে এ বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ায় রবিবার (২৬ অক্টোবর) প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বাড়িটি রক্ষায় ম্যাজিস্ট্রেসি নির্দেশনা জারি করেছে সিলেটের জেলা প্রশাসন।আগামী মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের একটি টিমের পরিদর্শন পূর্ব পর্যন্ত বাড়িটি না ভাঙতে এই নির্দেশনা জারি করা হয়।

 

রোববার (২৬ অক্টোবর) বেলা দুইটার দিকে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সিলেট সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আলিমউল্লাহ খান মিনিস্টার বাড়ি গিয়ে এ নির্দেশনার বিষয়টি জানান।এর আগে সিলেট জেলা প্রশাসনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মোছা. নাহিদা সুলতানা স্বাক্ষরিত ‘ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা মিনিস্টার বাড়ি ভাঙার কাজ বন্ধকরণ’ শীর্ষক পত্রে ২৯ অক্টোবর (মঙ্গলবার) উচ্চ পর্যায়ের টিমের পরিদর্শনের বিষয়টি জানানো হয়। ম্যাজিস্ট্রেসি নির্দেশনা জারির সময় বাড়ি মালিকের পক্ষের প্রতিনিধি আনিসুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। তিনি ম্যাজিস্ট্রেসি নির্দেশনা মেনে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। 

 

মিনিস্টার বাড়ি অবস্থানকালে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে আমাদের কাছে পত্র মারফত যোগাযোগ করা হয়। বাড়িটির ঐতিহাসিক দিক বিবেচনা করে সংরক্ষণ করার বিষয়ে সরেজমিন তদন্তে একটি উচ্চ পর্যায়ের টিম এখানে আসবে। বিশেষজ্ঞসহ ওই টিমের পরিদর্শন পূর্ব পর্যন্ত বাড়ি ভাঙার কাজ বন্ধ থাকবে। এ নির্দেশনা অমান্য করলে আইনত পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

 

মালিক পক্ষের বরাতে জানা গেছে, ৬৫০ শতক জায়গার মিনিস্টার বাড়িতে এখন মাত্র ৮২ শতক জায়গা রয়েছে। বাড়িটি ব্যক্তিমালিকানাধীন হলেও ঐতিহাসিক দিক বিবেচনায় জাতীয় স্মৃতি নিদর্শন হতে পারে উল্লেখ করে আইএবি সিলেট শাখার সাধারণ সম্পাদক স্থপতি রাজন দাশ বলেন, ‘আমরা চাই এটি পুরাকীর্তির মিউজিয়াম হিসেবে সংরক্ষিত হোক। যে টুকু অবশিষ্ট আছে, সে টুকু সংরক্ষণ করে পুরাকীর্তির মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা পেলে এ অঞ্চলের সব পুরাকীর্তি সুরক্ষার দাবি ভবিষ্যতের জন্য উচ্চকিত থাকবে।’ 


শেয়ার করুনঃ

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে আরো পড়ুন

সিলেট, মিনিস্টার বাড়ি, পাঠানটুলা, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ