০২ মে ২০২৬

তথ্যপ্রযুক্তি-শিক্ষা / শিক্ষা

উত্তরপত্র মূল্যায়নে ‘উপরের চাপ’ না থাকায় সিলেটে ফল বিপর্যয়

মোসাইদ রাহাত

প্রকাশঃ ১৬ অক্টোবর, ২০২৫ ৬:৩২ অপরাহ্ন

ছবিঃ সংগৃহীত

এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে। পাসের হার ও জিপিএ—৫ দুটোতেই এ ধস নেমেছে। গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার অর্ধেকে নেমে এসেছে। আর জিপিএ—৫ কমেছে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫ গুণ। 

এ বছর সিলেট বোর্ডে পাসের হার ৫১ দশমিক ৮৬ শতাংশ। গত বছর পাশের হার ছিল ৮৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এবার জিপিএ—৫ পেয়েছে ১ হাজার ৬০২ জন। গত বছর জিপিএ—৫ পেয়েছিল ৬ হাজার ৬৯৮ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ এক ধাক্কায় পাসের হার ও জিপিএ—৫ প্রাপ্তিতে বড় ধরণের ধাক্কা খেয়েছে সিলেট শিক্ষাবোর্ড।

অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়—বরং এর পেছনে রয়েছে শিক্ষাবোর্ডগুলোর নীতি নির্ধারণ ও শিক্ষার্থীদের দুর্বল ভিত্তি। তাছাড়াও রয়েছে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে অমনযোগীতা ও অভিভাবকদের উদাসীনতা। বিশেষ করে গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে শিক্ষক—শিক্ষার্থীর সম্পর্কের সংকটও একটি বড় কারণ। 

সিলেট শিক্ষাবোর্ডও বলছে একই কথা। বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, এবারের ফলাফল সিলেটের বাস্তব চিত্র। এবার শিক্ষকরা স্বাধীনভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে পেরেছেন। কোনো ধরণের চাপ ছাড়াই সঠিকভাবে মূল্যায়ন হওয়ায় ফলাফলের হার কমেছে। তবে এর বাইরেও কিছু কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। 

শিক্ষকরা বলছেন, ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা ৮ম, ৯ম ও ১০ম শ্রেণিতে অটোপাশের মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়েছে। এই বছরগুলোতে তাদের পাঠদান ছিল অনিয়মিত, অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ ছিল সীমিত, আর বাস্তব মূল্যায়নের সুযোগও ছিল না। এই শিক্ষার্থীরাই পরে ২০২৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়, যেখানে বোর্ড কর্তৃপক্ষ নম্বর প্রদানে নমনীয়তা দেখায়। ফলে অনেকেই ভালো ফল করলেও শক্ত ভিত তৈরি হয়নি।

তারা আরও বলছেন, ২০২৩ সালের এসএসসি পরীক্ষায়ও প্রশ্ন ছিল তুলনামূলক সহজ ও উত্তরপত্র মূল্যায়নে ছিল নমনীয়তা। কিন্তু এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন কঠিন হওয়ায় এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে কোনো নমনীয়তা না দেখানোয় এই শিক্ষার্থীরাই খারাপ ফলাফল করেছে। 

অন্যদিকে খারাপ ফলাফলের পেছনে শিক্ষার্থীদের গাঁছাড়া মনোভাব, অমনযোগিতা ও অভিভাবকদের উদাসীনতাও দায়ী বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। তারচেয়েও বড় বিষয় হলো গত বছর শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর শিক্ষার্থীদের পাঠদানে অমনোযোগীতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায়। যার প্রভাবও এবারের ফলাফলে পড়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষক—গবেষকরা।

সিলেটের আম্বরখানা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ জমির উদ্দিন বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে আসে না। পড়াশোনায় মনোযোগ নেই। তাদের চিন্তাধারা এখন ভিন্ন। যার কারণেই ফল বিপর্যয়।’

শিক্ষাবিদ আবুল ফতেহ ফাত্তাহ বলেন, ‘ফলাফল কোন সময় বিপর্যয় হয় না আমার বিবেচনায়। ফলাফল প্রনয়নে সব বোর্ড মিলে যে পলিসি তৈরি করে সে পলিসিতে শিক্ষার্থীদের মেধার সঙ্গে ও মানবিক দিকটি বিবেচনা করা হয়। যখন উদার পলিসি অনুসরণ করা হয় তখন ফলাফল বেশ ভালো হয়। যখন একটু কঠোর হয় তখন ফলাফল নেমে আসে। এক্ষেত্রে যারা পাশ করে বোর্ড তাদের ফেল করায় না কিন্তু আশানুরূপ ফলাফলটা পায় না।’

তিনি বলেন, ‘এবার ফলাফল নেমে আসার কারণ হতে পারে—শিক্ষকদের খাতা মূল্যায়ন বিষয়টি, শিক্ষাবোর্ডের উদার—মনোভাববিহীন পলিসি ও শিক্ষার্থীদের অমনোযোগিতা।’

অটোপাশ হয়ে আসা শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যতটা সিরিয়াসনেস হয়ে পড়াশোনা করা দরকার ছিলো ততটা সিরিয়াস হয়ে পড়েনি। এর দায় সবারাই।’

মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল আনাম মো. রিয়াজ বলেন, ফলাফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ শিক্ষানীতিতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। আমাদের প্রধান উপদেষ্টা ও শিক্ষা উপদেষ্টাও একজন শিক্ষক। তাদের সময়ে এটা আশা করা যায়নি। এই সরকারের আমলে অন্তত এই জায়গাটা ঠিক করা প্রয়োজন বলে মনে করেন। 

তিনি আরও বলেন, ৫৪ বছর ধরে আমরা শুনে আসছি শিক্ষাব্যবস্থা ঢালাওভাবে সাজানো হবে। কিন্তু কখনও সাজানো হবে তা আমরা জানিনা। তবে শিক্ষাব্যবস্থা ঢালাওভাবে সাজানো হোক আর নাই হোক অন্তত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এতে করে কিছু বিষয়ে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়বে। 

সিলেট শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, সিলেটে এবছর যে ফলাফলটা এসেছে এই সিলেটের বাস্তব চিত্র। ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেখেন এবং তারপরের ফলাফলগুলো দেখেন আবার ২০২০ সাল থেকে ফলাফল থেকে বুঝে যাবেন এগুলো কিভাবে তৈরি করা হয়েছিল। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে যায় না, ইংরেজিতে ভালো করে বুঝেন না। যার কারণে ফল খারাপ হচ্ছে। 

৫ আগষ্টের ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘৫ আগষ্টের পর শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষকদের সম্পর্কটা আগের মতো নেই। একজন শিক্ষার্থী একজন শিক্ষককে নির্দেশ দিচ্ছে, তাহলে একজন শিক্ষক কিভাবে পাঠদান নিবেন। প্রতিষ্ঠানগুলো কোন অবস্থায় তা সবার খোঁজ নেওয়া দরকার। 

তিনি আরও বলেন, ‘এবারের ফলাফল ইংরেজিতে খারাপ বেশি। দুই পত্র মিলিয়ে ৬৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে এটি কেন হবে। তাছাড়া আমাদের বড় সমস্যা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নেই। গেল ১০ থেকে ১২ বছর ধরে শিক্ষকদের কোন প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না, ফলাফল বিপর্যয়ে এটিও একটা কারণ।’

উল্লেখ্য, সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ৬৯ হাজার ১৭২ জন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩৫ হাজার ৮৭১ জন। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ৬০২ জন শিক্ষার্থী। ২০০৫ সালের পর এটি সিলেটের সর্বনিম্ন পাসের হার।


শেয়ার করুনঃ

তথ্যপ্রযুক্তি-শিক্ষা থেকে আরো পড়ুন

এইচএসসি, ফলাফল বিপর্যয়, সিলেট

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ