২০ বছরেও নির্মাণ হয়নি সেতুর সংযোগ সড়ক
অনিয়ম-দুর্নীতি
প্রকাশঃ ২৫ আগস্ট, ২০২৫ ৫:৫৯ অপরাহ্ন
সিলেটের আলী আমজদের ঘড়ি ১৫১ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যের প্রতীক। ‘চাঁদনী ঘাটের সিঁড়ি, আলী আমজদের ঘড়ি, বঙ্কু বাবুর দাড়ি, জিতু মিয়ার বাড়ি,সিলেটের ঐতিহ্যবাহী প্রবাদটির সৃষ্টি করে সিলেটে ইতিহাস। শহরে প্রবেশ করলেই কিনব্রিজের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঘড়িঘরকে সিলেটের গৌরব হিসেবে দেখে মানুষ। কিন্তু সেই ঘড়িঘরের বেষ্টনীর ভেতরেই জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে নির্মিত হচ্ছে স্মৃতিফলক ‘স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প’। আর এ নিয়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।
আলী আমজদের ঘড়িঘর বাংলাদেশের প্রাচীনতম ঘড়ি টাওয়ারগুলোর মধ্যে একটি। সিলেট নগরীর চাঁদনিঘাট এলাকায় কিনব্রিজের উত্তরপাড়ে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা আলী আমজদের ঘড়িঘর। কিনব্রিজ হয়ে নগরীর প্রবেশমুখ এটি অবস্থিত। ১৮৭৪ সালে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ার পৃথিম পাশার জমিদার নবাব আলী আহমদ খানের উদ্যোগে ঘড়িটি স্থাপন করা হয়। ঘড়িটি আড়াই ফুট ডায়ামিটারের। এর কাঁটা দুই ফুট লম্বা। লোহার খুঁটির ওপর ঢেউটিন দিয়ে আবৃত সুউচ্চ গম্বুজ আকৃতির ঘড়িটি সিলেটের ঐতিহ্য।
সমালোচকদের অভিযোগ, জুলাই স্মৃতিফলক ঘড়িঘরের আসল স্থাপত্যশৈলী আড়াল করে দিচ্ছে। তাঁদের মতে, শহীদদের স্মরণে স্মৃতিফলক নির্মাণ মহৎ উদ্যোগ হলেও সেটি অন্য কোনো উন্মুক্ত স্থানে করা যেত।
পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি আবদুল করিম চৌধুরী কিম লিখেন, আলী আমজাদের ঘড়ি একটি পরিবারের দান। এই ঘড়ি সিলেটের ঐতিহ্যের স্মারক। সেই ঘড়ি ঘরের সীমানার মধ্যে কীসের স্থাপনা তৈরি হচ্ছে? এই স্থাপনা নির্মাণের ফলে এই ঐতিহ্যের সৌন্দর্য্য শুধু বিনষ্ট হবে না, সিলেটের এই ‘সিটি আইকন’-এর স্থাপত্য শৈলী গুরুত্ব হারাবে। আমার ধারণা সদ্য সাবেক জেলা প্রশাসক এই ঐতিহ্য বিনষ্টের অন্যতম পরিকল্পনাকারী। উনার পরিকল্পনায় এখানে ‘জুলাই শহীদ স্মরণে’ নির্মিত হচ্ছে শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ। যদি তাই হয়, তাহলে রিকাবীবাজারে কাজী নজরুল ইসলাম অডিটোরিয়ামের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে নির্মাণ করা স্থাপনাটি কেন নির্মাণ করা হয়েছে? গত রোববার এই ঘড়ি ঘরের পাশে সাদাপাথরের লুটপাটের প্রতিবাদে একটি মানববন্ধন কর্মসূচী পালিত হয়। এই সময়ে এই নির্মাণকাজ আমাদের চোখে পড়ে। আমরা খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করি-এখানে কি হচ্ছে? কোন সদুত্তর পাওয়া যায়নি। যাইহোক ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যারা শহীদ হয়েছেন সরকার যদি তাঁদের স্মরণে কিছু নির্মাণ করতে চায় তবে তা কোনভাবেই সিলেটের এই শতবর্ষী ঐতিহ্যের অখন্ডতা বিনষ্ট করে কিছু নির্মান হতে পারেনা। আমরা অন্যত্র এই নির্মাণ স্থানান্তরের দাবী জানাই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঘড়িঘরের তোপখানা অভিমুখী সড়কের পাশে স্মৃতিফলকের নির্মাণকাজ চলছে। এর বেশির ভাগই শেষ হয়ে গেছে।
জানা গেছে, শহীদ মো. পাবেল আহমদ কামরুল ও পঙ্কজ কুমার করকে স্মরণে ঘড়িঘরের সামনে এই ফলক নির্মাণ করা হচ্ছে। একই উদ্যোগে কোর্টপয়েন্টে সাংবাদিক আবু তাহের মো. তুরাব এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুদ্র সেনের স্মরণে আরও দুটি ফলক স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ফলক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ আট হাজার টাকা।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে সিলেট সিটি করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার সিলেট ভয়েসকে বলেন, কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঘটনাস্থলের পাশেই ফলক নির্মিত হচ্ছে। এখানে নিরাপত্তা ও পথচারীদের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। ঘড়িঘরের সৌন্দর্য রক্ষায় ফলকের সঙ্গে ঘড়িঘরও নতুনভাবে রং করা হব।”
তবে শহরের সাংস্কৃতিকর্মী ও ইতিহাসপ্রেমীরা বলছেন, সিলেটের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ঘড়িঘরের মূল সৌন্দর্য নষ্ট না করেই শহীদদের স্মৃতিকে সম্মান জানানো যেত। ফেসবুকে সম্মিলিত নাট্য পরিষদের প্রধান পরিচালক শামসুল বাসিত শেরো লিখেছেন, শহীদদের স্মৃতিরক্ষার উদ্যোগ প্রশংসনীয়, কিন্তু আরেকটু সংবেদনশীল হওয়া উচিত ছিল।
বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক কর্মী ও চিকিৎসক ডা. জহির অচিনপুরী ফেইসবুকে লিখেন, আবহমানকালের সিলেটী ঐতিহ্য রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। এটা নিয়ে রাজনীতি না করি।
সাংস্কৃতিক নাজিকুল ইসলাম ভূঁঞার লিখেন, সিলেটকে দেশ-বিদেশে খুব সহজে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্যে সুরমা নদীর পাড়ে আলী আমজাদের ঘড়ি ঘরটি আইকনিক নিদর্শন হিসেবে অত্যন্ত সুপরিচিত। দেশ বিদেশের নানা পর্যটক এখানে আসেন নিয়মিত এটি দেখতে। কিন্তু গতকাল গিয়ে দেখি অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে চলেছে। এই ঐতিহাসিক দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার সীমানা প্রাচীরের ভেতরেই কি একটা অদ্ভুত কিসিমের স্থাপনা গড়ে উঠছে। খবর নিয়ে জানতে পারলাম এটি নাকি জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ। শোনে খুব আশ্চর্য হলাম এই ভেবে গোটা শহরে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ করার কি আর কোন জায়গা কর্তৃপক্ষ খুঁজে পায়নি?
ফেসবুকে নবাব আলী আমজদের পৌপুত্র নবাব আলী হাসিব খান লিখেন, ‘আলী আমজদের ঘড়ি শুধু আমার পরিবারের জন্যই নয়, সিলেটের প্রতিটি মানুষের কাছে এক অসীম ঐতিহ্যের প্রতীক। এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা সিলেটবাসীর চেতনাকে প্রভাবিত করে আসছে যুগ যুগ ধরে। এই ঘড়িটি আমাদের শহরের এক পরিচিত এবং প্রিয় চিহ্ন, যা সিলেটের এক অনন্য ঐতিহ্য এবং গৌরবের প্রতীক। তাই, এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাকে ধ্বংস করে কিছু নতুন নির্মাণ করার পক্ষে আমরা নই। আমাদের কর্তব্য হলো এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা অক্ষুন্ণ রাখা। এই কাজ বন্ধ করে অন্য জায়গায় করার দাবি জানাচ্ছি না হয় আমরা কঠোর আন্দোলনের ডাক দিব।’
এদিকে এ ঘটনায় সোমবার (২৫ আগস্ট) সিলেটের নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে সিলেটের ল্যান্ডমার্ক খ্যাত দেড় শতাব্দীর প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী আলী আমজাদের ঘড়িঘরের অখণ্ডতা রক্ষার নাগরিক আহবান সম্বলিত যৌথ স্মারকলিপি প্রদান করেছে তিনটি নাগরিক সংগঠন। পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট সিলেট, ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) সিলেট ও সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলনের পক্ষ থেকে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
আলী আমজাদ, ঘড়ি, জুলাই স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প, স্মৃতিফলক