০৪ মে ২০২৬

দৈনন্দিন

প্রশাসনের হস্তক্ষেপে চিকিৎসা শুরু

দিনের বেশির ভাগ সময় গর্তে থাকে শিশু গোপাল

প্রতিনিধি, কুলাউড়া, মৌলভীবাজার

প্রকাশঃ ১৮ জুন, ২০২৫ ৫:৪০ অপরাহ্ন


স্বাভাবিকের চেয়ে ভিন্নভাবে জন্ম নেওয়া শিশু গোপাল সাওতালকে ঘিরে ছুঁয়ে যাওয়া এক গল্প এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে। তিন বছর ছয় মাস বয়সী এই শিশু এখনও দাঁড়াতে বা বসতে পারে না। ধারণা করা হচ্ছে, জন্ম থেকেই সে শারীরিক প্রতিবন্ধী।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার মুরইছড়া চা বাগানের বাসিন্দা সনচড়ি সাওতাল ও অনিল সাওতালের একমাত্র সন্তান গোপাল। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে না পারায় তাকে দেখভাল করতে মা সনচড়ি বাড়ির মেঝেতে একটি গোলাকার গর্ত তৈরি করেন। সেই গর্তে সন্তানকে দাঁড় করিয়ে খাওয়ান ও যত্ন করেন। না হলে সে শরীর ভাঁজ করে পড়ে থাকে। শিশুটির মাথা ও হাত যেন বাইরে থাকে, এমনভাবে গর্তটি তৈরি করা হয়েছে। ক্ষুধার সময় কান্না শুরু করলে সনচড়ি গোপালকে গর্তে বসিয়ে খাওয়ান। দিনের বেশির ভাগ সময়ই গোপাল কাটায় সেই গর্তে দাঁড়িয়ে।

অভাবের সংসারে গোপালের চিকিৎসা করানো সনচড়ি ও অনিলের পক্ষে সম্ভব ছিল না। মা বাড়ির কাজের ফাঁকে ছেলেকে দেখাশোনা করেন, বাবা অনিল সাওতাল চা বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন।

সনচড়ি জানান, শিশুটিকে একবার সিলেটের খাদিমনগরের একটি প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছিল। সেখানকার চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শিশুটিকে নিয়মিত ফিজিওথেরাপি দিতে হবে এটাই তার উন্নতির একমাত্র উপায়। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি বলেন, "আমার ছেলের কান্না আর কষ্ট কীভাবে সহ্য করব? তাই বুদ্ধি করে এই গর্ত করেছি, যাতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। সামর্থ্য থাকলে যন্ত্রপাতি কিনে দিতাম, শুনেছি এমন শিশুদের জন্য অনেক যন্ত্র থাকে।"

একমাত্র সন্তানকে সুস্থ করে তুলতে চান এই দম্পতি। তাঁরা চান, একদিন গোপাল নিজের পায়ে হাঁটতে শিখবে। কিন্তু বিনা চিকিৎসায় শিশুটি যেন থেকে না যায়, সে প্রত্যাশাই করছে স্থানীয় মানুষ।

গোপালকে নিয়ে একটি পোস্ট দেন কবি ও সাংবাদিক সঞ্জয় দেবনাথ। সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং নেটিজেনদের ব্যাপক সাড়া জাগায়। বিষয়টি নজরে আসে কুলাউড়া উপজেলা প্রশাসনের।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিউদ্দিন সরেজমিন গোপালের বাড়িতে যান। শিশুটির খোঁজখবর নেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাকে একটি সুবর্ণ নাগরিক কার্ড প্রদান করেন। ইউএনও বলেন, “বিষয়টি জানার পর দ্রুততার সঙ্গে শিশুটির জন্য প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড প্রস্তুত করে হস্তান্তর করেছি। পাশাপাশি পরিবারটির জন্য এক বছরের ভাতার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”

১৭ জুন গোপালকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুলাউড়া শহরে নেওয়া হয়। তাকে দেখেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাঈদ এনাম। পরীক্ষা–নিরীক্ষার পর তিনি জানান, গোপাল সেলিব্রাল পালসি (CP) রোগে আক্রান্ত। এটি বাংলাদেশে পরিচিত একটি স্নায়বিক সমস্যা, যা শিশুদের চলাফেরায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

চিকিৎসক বলেন, 'গোপালকে সুস্থ করে তুলতে হলে দীর্ঘমেয়াদি ফিজিওথেরাপি প্রয়োজন। পাশাপাশি এখনই গর্তের ব্যবহার বন্ধ করে তাকে ওয়াকার বা হুইলচেয়ারে অভ্যস্ত করতে হবে।'



শেয়ার করুনঃ

দৈনন্দিন থেকে আরো পড়ুন

গোপাল সাওতাল, সেলিব্রাল পালসি শিশু, মৌলভীবাজার প্রতিবন্ধী শিশু, কুলাউড়া শিশু চিকিৎসা, শিশু ফিজিওথেরাপি বাংলাদেশ,

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ