এক বছরে সুনামগঞ্জে লিগ্যাল এইডের সুফলভোগী বেড়েছে চার গুণের বেশি
অপরাধ-বিচার
প্রকাশঃ ২১ আগস্ট, ২০২৬ ১:৩৩ অপরাহ্ন
সুনামগঞ্জে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে বিরোধ নিষ্পত্তির সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১১ গুণ, আর মোট সুফলভোগীর সংখ্যা বেড়েছে চার গুণের বেশি।
জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ের তুলনামূলক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে ২০১টি বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছিল। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২০৮টিতে, অর্থাৎ এক বছরে বিরোধ নিষ্পত্তি বেড়েছে ২ হাজার ৭টি, শতকরা হিসাবে যা প্রায় ৯৯৯ শতাংশ।
জেলা লিগ্যাল এইড অফিস সূত্রে জানা গেছে, লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ কার্যকর হওয়ার পর নির্দিষ্ট শ্রেণির বিরোধে বাধ্যতামূলক প্রাক-মামলা মধ্যস্থতা বা প্রি-কেস মিডিয়েশন চালু হওয়ার পরই এ কার্যক্রমে গতি এসেছে। মামলা আদালতে গড়ানোর আগেই বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হওয়ায় একদিকে সাধারণ মানুষের সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমছে, অন্যদিকে আদালতের ওপর মামলার চাপ কমানোরও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রি-কেস আবেদনের সংখ্যা ছিল ২৮৫টি, যা ২০২৬ সালের একই সময়ে বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৮০৮টিতে—অর্থাৎ প্রায় ১০ গুণ বৃদ্ধি। একই সময়ে প্রি-কেস মীমাংসার সংখ্যাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে, ৯৪টি থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৫৪টি।
এসব মীমাংসার মাধ্যমে ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ২ লাখ ৬৩ হাজার ৮৬৩ টাকা আদায় হয়েছিল, যা ২০২৬ সালের একই সময়ে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ লাখ ৮৮ হাজার টাকায়। এ ছাড়া ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে পোস্ট-কেস মীমাংসার মাধ্যমে আরও ৪৩টি বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে, যেখানে ২০২৫ সালের একই সময়ে পোস্ট-কেস মীমাংসায় কোনো নিষ্পত্তি ছিল না।
লিগ্যাল এইডের অন্যান্য কার্যক্রমেও অগ্রগতি দেখা গেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে আইনগত সহায়তা গ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ২২৯ জন, ২০২৬ সালের একই সময়ে যা বেড়ে হয়েছে ৯০৫ জন। একইভাবে আইনি পরামর্শ গ্রহণকারীর সংখ্যা ৮৬১ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৫৫ জনে। সব মিলিয়ে মোট সুফলভোগীর সংখ্যা ৬৮৭ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে হয়েছে ২ হাজার ৯৮২ জন।
সচেতনতামূলক কার্যক্রমেও ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে চারটি সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান হলেও ২০২৬ সালের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯টিতে। এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাও ১০৭ থেকে বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৮৫ জন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সুনামগঞ্জের ভৌগোলিক বাস্তবতায় লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির এই অগ্রগতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য বারবার আদালতে যাতায়াত করা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। মামলা দায়েরের আগেই মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষের সময় ও অর্থ দুটিই সাশ্রয় হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে দুস্থ, দরিদ্র ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল ব্যক্তিদের বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা, আইনি পরামর্শ এবং বিরোধ নিষ্পত্তির সেবা দেওয়া হয়। জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার ব্যবস্থাপনায় যোগ্য ব্যক্তিদের বিভিন্ন মামলায় আইনজীবী নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়। এ ছাড়া মামলা দায়েরের আগে কিংবা মামলা চলমান অবস্থায় পক্ষগুলোর সম্মতির ভিত্তিতে মধ্যস্থতা ও আপস-মীমাংসার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে জমি-জমা, সম্পত্তি, পাওনা টাকা, চুক্তিসহ বিভিন্ন দেওয়ানি বিরোধে যোগ্য ব্যক্তিদের আইনগত সহায়তা দেওয়া হয়। আর্থিকভাবে অসচ্ছল আসামি বা ভুক্তভোগী যোগ্য হলে ফৌজদারি মামলাতেও আইনজীবী নিয়োগসহ সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, দেনমোহর, ভরণপোষণ, সন্তানের অভিভাবকত্বসহ পারিবারিক বিরোধ; নারী ও শিশু-সংক্রান্ত মামলা; মালিকানা, দখল, উত্তরাধিকারসহ জমি ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধেও আইনগত পরামর্শ ও সহায়তা পাওয়া যায়। কারাগারে থাকা আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও আইনগত সহায়তার যোগ্য ব্যক্তিদের জন্যও আইনজীবী নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে।
গেল বৃহস্পতিবার সকালে বিচারপ্রার্থী রাফিনা বিবি বলেন, দীর্ঘদিনের বিরোধ লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই সমাধান হয়েছে। এজন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।
বিচারপ্রার্থী সজল মিয়া বলেন, আমি একজন গরিব মানুষ। অনেক খোঁজখবর নিয়ে ও চিন্তাভাবনা করে জায়গা-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের জন্য লিগ্যাল এইডে আবেদন করি। পরে বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে সমাধান হয়েছে। দরিদ্র হয়েও লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে সঠিক বিচার পেয়েছি।
লিগ্যাল এইডের জুনিয়র স্পেশাল মেডিয়েটর আইনজীবী নূর আলম বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসহায় ও দরিদ্র মানুষ লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে বিভিন্ন ধরনের আইনগত সেবা পাচ্ছেন। প্রতিটি মানুষের কাছে সহজ পদ্ধতিতে, বিনামূল্যে ও স্বল্প সময়ে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দিতে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি।
সুনামগঞ্জের লিগ্যাল এইডের স্পেশাল মেডিয়েটর অ্যাডভোকেট আব্দুল হক বলেন, লিগ্যাল এইডের আইন সহায়তা কেন্দ্রে অসহায় ও হয়রানির শিকার মানুষ এসে ভালো সেবা পাচ্ছেন। একজন বিচারক ত্যাগ ও নিষ্ঠার মাধ্যমে সেবা প্রদানের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।
সুনামগঞ্জ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার সিনিয়র সিভিল জজ মো. জুনাইদ বলেন, প্রাক-মামলা মধ্যস্থতার মাধ্যমে আদালতে মামলা দায়েরের আগেই অনেক বিরোধ নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে। এতে একদিকে নাগরিকের ভোগান্তি ও ব্যয় কমছে, অন্যদিকে আদালতের ওপর নতুন মামলার চাপও কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।" তিনি আরও বলেন, "পক্ষগুলোর সম্মতিতে সম্পাদিত মীমাংসাপত্র আইন অনুযায়ী কার্যকর ও বলবৎযোগ্য হওয়ায় এডিআর ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাও ধীরে ধীরে বাড়ছে।
উল্লেখ্য, সুনামগঞ্জ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের কার্যক্রম বর্তমানে চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। আইনগত সহায়তা কিংবা বিরোধ নিষ্পত্তির প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের নিকটস্থ লিগ্যাল এইড অফিসে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
লিগ্যাল এইড, বিরোধ নিষ্পত্তি, আইনি সহায়তা, আইনি পরামর্শ, সুনামগঞ্জ আদালত, সুফলভোগী