উল্টো রথ টানার মাধ্যমে সম্পন্ন হলো রথযাত্রা উৎসব
ধর্ম
প্রকাশঃ ২৪ জুলাই, ২০২৬ ৮:৩৭ অপরাহ্ন
উল্টো রথ টানার মধ্য দিয়ে আজ শুক্রবার (২৪ জুলাই) সিলেটে সমাপ্ত হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা। গত ১৬ জুলাই শুরু হওয়া ৯ দিনব্যাপী এই মহোৎসবের সমাপনী দিনে নগরীর বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হয় বর্ণাঢ্য কর্মসূচি।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, জগন্নাথ দেব হলেন জগতের অধীশ্বর জগত অর্থ বিশ্ব আর নাথ অর্থ ঈশ্বর। তার অনুগ্রহ লাভে মুক্তি মেলে জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে। এই বিশ্বাস থেকেই রথের ওপর জগন্নাথ দেবের প্রতিমা স্থাপন করে রথযাত্রা পালন করা হয়। সনাতনী রীতি অনুসারে প্রতিবছর চন্দ্র আষাঢ়ের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে এই রথযাত্রা শুরু হয়, যার সূচনা হয়েছিল পুরীর জগন্নাথ মন্দির থেকে।
ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে সিলেট নগরের রিকাবীবাজারস্থ রথযাত্রা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের উল্টো রথযাত্রা, যেখানে সমবেত হন হাজারো ভক্ত-অনুরাগী। গত ১৬ জুলাই সিলেটের ২৫টি দেবালয় ও মন্দির থেকে রথ নিয়ে এই প্রাঙ্গণেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম রথযাত্রা মহোৎসব। সমাপনী দিনেও এই প্রাঙ্গণে সম্পন্ন হয় শ্রীশ্রী জগন্নাথদেব, বলদেব ও সুভদ্রা মহারানীর পূজা, আরতী, হরিনাম সংকীর্তন, মহাপ্রসাদ বিতরণ, হরিলুট ও ভক্তিমূলক সঙ্গীতসহ নানা আচার।
সিলেট দেবালয় রথযাত্রা উদযাপন কমিটির সহ-ধর্মীয় সম্পাদক প্রহল্লাদ সিংহের নেতৃত্বে অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় গীত গোবিন্দ থেকে দশাবতার পাঠ, কীর্তন ও আরতী।
রিকাবীবাজারের রথযাত্রা প্রাঙ্গণের ব্যবস্থাপনায় প্রতি বছরের মতো এবারও দায়িত্ব পালন করে সিলেট দেবালয় রথযাত্রা উদযাপন কমিটি, সহযোগিতায় ছিল সিলেট সিটি করপোরেশন। মহোৎসব নির্বিঘ্ন করতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়, যার আওতায় প্রতিটি রথ মন্দির থেকে আনা-নেওয়া করা হয়।
এবারের রথযাত্রায় অংশ নেয় সিলেটের ২৫টি মন্দির ও দেবালয় শ্রীশ্রী কৃষ্ণ বলরাম জিউর আখড়া (লামাবাজার), শ্রীশ্রী জগন্নাথ জিউর মন্দির (আম্বরখানা), শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণ জগবন্ধু বিগ্রহ মন্দির (শিবগঞ্জ), শ্রীশ্রী নৃসিংহ জিউর দেবতা (কালীঘাট), শ্রীশ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু জিউর মন্দির (রাজবাড়ী, মির্জাজাঙ্গাল), শ্রীশ্রী জগন্নাথ জিউর আখড়া (নয়াবাজার), আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ-ইসকন (যুগলটিলা), শ্রীশ্রী জগন্নাথ মন্দির (নরসিংটিলা), শ্রীশ্রী জগন্নাথ জিউর আখড়া (কালীঘাট), শ্রীশ্রী মহাপ্রভু মন্দির (নরসিংটিলা), লালাদিঘিরপাড় মণিপুরীপাড়া মহাপ্রভুর মন্দির, শ্রীশ্রী মহাপ্রভু মন্দির (সাগরদিঘিরপাড়), শ্রীশ্রী গোপীনাথ জিউর আখড়া (মাছিমপুর), শ্রীশ্রী জগন্নাথ মন্দির (বড়বাজার), শ্রীশ্রী জগন্নাথ জিউর আখড়া (সুবিদবাজার), শ্রীশ্রী মহাপ্রভু জিউর আখড়া (লামাবাজার), শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণ মন্দির (দক্ষিণ কাছ), শ্রীশ্রী জগন্নাথ জিউর আখড়া (জিন্দাবাজার), শ্রীশ্রী ব্রজনাথ জিউর মন্দির (শিবগঞ্জ), নিম্বার্ক আশ্রম (মির্জাজাঙ্গাল), সিলেট দেবালয় রথযাত্রা উদযাপন কমিটি ও শ্রীশ্রী মহাপ্রভু আখড়া (পনিটুলা), শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দ মন্দির (বহর নোয়াগাঁও), শ্রীশ্রী রাধামাধব জিউর মন্দির-ইসকন (কৃষ্ণপুর, গোটাটিকর) এবং শ্রীশ্রী মহাপ্রভুর আখড়া (আখালিয়া, নতুন বাজার)।
এদিকে নগরীর অন্যতম আয়োজক আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) সিলেটের উদ্যোগেও একই দিনে পালিত হয় উল্টো রথযাত্রা মহোৎসব। সকাল থেকে হরিনাম সংকীর্তন, বিশ্বশান্তি কামনায় অগ্নিহোত্র যজ্ঞ, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আলোচনা সভা, ভাগবত কথা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও শ্রীমদ্ভাগবত গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে অনুষ্ঠানমালা। বিকেল ৩টায় ইসকন সিলেট মন্দিরে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভার সূচনা হয় ভগবদ্গীতার শ্লোকপাঠের মাধ্যমে, যা পরিবেশন করেন ইসকন পরিচালিত ভক্তিবেদান্ত ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষার্থীরা।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ইসকন বাংলাদেশের সহ-সভাপতি ও ইসকন সিলেট মন্দিরের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ ভক্তি অদ্বৈত নবদ্বীপ স্বামী মহারাজ। তিনি বলেন, সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের চর্চা অত্যন্ত প্রয়োজন। আমরা সকলের কল্যাণ, বিশ্বশান্তি ও মানবতার মঙ্গল কামনা করি।
আলোচনা সভা শেষে বিকেল ৪টায় শ্রীশ্রী জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা মহারানীকে বহনকারী তিনটি সুসজ্জিত রথ নিয়ে বের হয় শোভাযাত্রা, যা রিকাবীবাজার, চৌহাট্টা, জিন্দাবাজার, কোর্ট পয়েন্ট, তালতলা, মির্জাজাঙ্গাল ও লামাবাজার প্রদক্ষিণ করে পুনরায় ফিরে আসে মন্দিরে। মৃদঙ্গ, করতাল, ঘণ্টা, উলুধ্বনি ও হরিধ্বনিতে মুখর এই শোভাযাত্রায় অংশ নেন হাজার হাজার নারী-পুরুষ, শিশু, তরুণ ও প্রবীণ ভক্ত।
রথযাত্রা মহোৎসব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য সিলেট দেবালয় রথযাত্রা উদযাপন কমিটির সভাপতি এল প্রশান্ত সিংহ ও সাধারণ সম্পাদক নৃপেন্দ্র সিংহ এক যৌথ বিবৃতিতে সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান। তারা বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রাণের এই উৎসব সফল ও সার্থক করার জন্য সিলেটের সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, সিলেট সিটি করপোরেশন, বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন, সামাজিক সংগঠনসহ সিলেটের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতায় সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সম্প্রীতির নগর সিলেটে এর যথার্থতা আবারও শতভাগ প্রমাণিত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে।
সিলেট, রথযাত্রা, সনাতন, মহোৎসব