১৮ জুলাই ২০২৬

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ / প্রকৃতি

অপার সম্ভাবনা থাকলেও প্রত্যাশিত গতি নেই সিলেটের পর্যটনে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ১৭ জুলাই, ২০২৬ ৯:২৯ অপরাহ্ন


দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন অঞ্চল সিলেট। চা-বাগানের সবুজ সমারোহ, পাহাড়-টিলা, ঝরনা, নদী, হাওর এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। জাফলং, লালাখাল, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, বিছানাকান্দি, সাদাপাথর, হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে প্রতি বছর লাখো দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।

তবে এতো বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারছে না সিলেটের পর্যটন শিল্প। অবকাঠামোগত দুর্বলতা, যাতায়াত দুর্ভোগ, পরিবেশ দূষণ, নিরাপত্তার ঘাটতি, অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা এবং মানসম্মত সেবার সংকটে থমকে আছে এ খাতের বিকাশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব নয়।

পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, সিলেটের অনেক পর্যটনকেন্দ্রে পৌঁছানোর সড়ক এখনো সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। বেশ কয়েকটি স্থানে পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা, গণশৌচাগার, বিশ্রামাগার, তথ্যকেন্দ্র এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামোর অভাব রয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা। কয়েক বছর ধরে চলমান এ প্রকল্পের কারণে ভ্রমণপথে দুর্ভোগ এখন পর্যটকদের অন্যতম প্রধান অভিযোগ। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অনেক ভ্রমণপিপাসু সিলেট সফরের আগ্রহ হারাচ্ছেন।

এছাড়াও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে প্লাস্টিক, বোতল ও অন্যান্য বর্জ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার পাশাপাশি পাহাড় কাটা, নদী ও জলাশয় দূষণ, বনভূমি ধ্বংস এবং অপরিকল্পিত পাথর উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ড প্রাকৃতিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এতে পর্যটনের প্রধান আকর্ষণগুলোই ধীরে ধীরে হুমকির মুখে পড়ছে।

তাছাড়া পাহাড়ি এলাকা, নদী ও ঝরনাকেন্দ্রিক পর্যটনস্থানে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকলেও অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী, লাইফগার্ড, উদ্ধার সরঞ্জাম কিংবা জরুরি চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা নেই। সতর্কতামূলক সাইনবোর্ডের অভাবও রয়েছে।

অন্যদিকে সিলেট শহরে আন্তর্জাতিক মানের কয়েকটি হোটেল থাকলেও দূরবর্তী পর্যটন এলাকায় এখনও মানসম্মত আবাসন, পরিচ্ছন্ন খাবারের ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত গাইড এবং আধুনিক পর্যটনসেবার সংকট রয়ে গেছে।

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে পর্যটন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন হয়নি। অনেক পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটক নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ চলাচল এবং পরিবেশ সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। ফলে জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোতে বিশৃঙ্খলা ও পরিবেশগত চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

পর্যটন লেখক ও গবেষক মোহাম্মদ খতিবুর রহমান বলেন, অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের কারণে সিলেট দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন অঞ্চল। কিন্তু অবকাঠামোগত দুর্বলতা, পরিবেশ দূষণ, অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তার অভাব, মানসম্মত সেবার সংকট এবং পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণার ঘাটতির কারণে এ খাত তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারেনি।

তিনি বলেন, টেকসই পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, আধুনিক অবকাঠামো, দক্ষ জনবল গঠন এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের মাধ্যমে সিলেটকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, ‘আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণে কঠোর নজরদারি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, দক্ষ জনবল তৈরি এবং ডিজিটাল প্রচারণা বাড়ানোর বিকল্প নেই। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। কার্যকর টেকসই পর্যটন নীতিমালা বাস্তবায়ন করা গেলে সিলেট শুধু দেশের নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।’

সিলেট হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমাত নুরী জুয়েল বলেন, ‘সিলেটে পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন কমছে। বিশেষ করে কয়েকদিন অবস্থান করে ঘুরে দেখার পর্যটক খুবই কম। যাদের আর্থিক সামর্থ্য বেশি, বিমানে করে আসেন, তাদের সংখ্যাও সীমিত। বেশিরভাগ পর্যটক গাড়ি ভাড়া করে দিনে এসে দিনে ফিরে যান। এতে হোটেল ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পর্যটন ব্যবসায় আগের সেই সুদিন আর নেই।’

সিলেটের নবাগত জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘পর্যটন শুধু সিলেটের নয়, সারাদেশের অর্থনীতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। এই শিল্পের বিকাশে যেখানে ঘাটতি রয়েছে, সেসব বিষয়ে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তিনি জানান, ‘স্থানীয় মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের মাধ্যমেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে যাতায়াত ব্যবস্থার দুর্ভোগ কমাতে জেলা প্রশাসন কাজ করবে। এ বিষয়ে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।’


শেয়ার করুনঃ

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ থেকে আরো পড়ুন

সিলেট, পর্যটন, সাদাপাথর, চা-বাগান, দর্শনার্থী, প্রশাসন

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ