১৩ জুলাই ২০২৬

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ / দুর্যোগ

খোয়াই নদীর ভাঙনের নেপথ্যে ‘অবৈধভাবে বালু উত্তোলন’, দুর্ভোগে ৩০ গ্রামের মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ১২ জুলাই, ২০২৬ ১০:৫৩ অপরাহ্ন


হবিগঞ্জের সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় নদী ভাঙনে অন্তত ৩০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন ওই এলাকার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। এ পরিস্থিতে বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, খোয়াই নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন এবং নদীগর্ভ থেকে মাটি কাটার কারণেই বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

তাদের অভিযোগ, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে বাঁধ ভেঙে দ্রুত বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে চরম দুর্ভোগের পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন আশেপাশের অন্তত ৩০ গ্রামের মানুষ। এ অবস্থায় বালুখেকোদের বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান বানবাসীরা। 

সরেজমিনে দেখা যায়, সদর উপজেলার লস্করপুর, লামাতাসি ও পইল ইউনিয়নের অন্তত পাঁচ শতাধিক বাড়িঘরে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। গ্রামীণ সড়ক, কৃষিজমি ও নিম্নাঞ্চল ডুবে গেছে । এতে দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা। বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্কদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন । 

এদিকে বন্যার পানিতে অধিকাংশ নলকূপ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ খাবার পানি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেককে দূর-দূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় বানভাসি মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও খাদ্য সংকট। শুধু এতেই শেষ নয়, এর সঙ্গে রয়েছে শিশুখাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটও।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টায় খোয়াই নদীর কালিগঞ্জ এলাকায় নদী রক্ষাবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নোয়াবাদ, চরহামুয়া, সুঘর, বনগাও, নতুন বাজার, বালিহাটা, কালীগঞ্জ, যাদবপুর, বিষ্ণরামপুর, দক্ষিনচর, রামনগর ও বনদক্ষিন, শিয়াল দাড়িয়া, মশাজান, আব্দাবখাই, সুলতানশী, কটিয়াতি, শিবপাশা, শরীফপুর এলাকাসহ অন্তত ৩০টি গ্রাম পানিতে ডুবে যায়। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। 

এদিকে পানি বাড়ায় নিম্নাঞ্চলে থাকা মানুষরা দ্রুত উচু বসতভিটা বা আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে আশ্রয় নেন বলে জানা যায়। ফলে দুর্ভোগ কিছুটা কমলেও বাড়িঘড়ে না ফিরতে পারায় পুরোপুরিভাবে সংকট এখনও কাটেনি বলেও জানান তারা। 

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চরহামুয়া-কালিগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর তীররক্ষা বাঁধের কাছ থেকে অবৈধভাবে ক্রামগত মাটি ও বালু উত্তোলনের কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গুটি কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি বালু মাটি উত্তোলন করলেও এখন এর মাশুল দিতে হচ্ছে লাখো জনসাধারণকে। বন্যার পানিতে মাছের ঘের, ফসলি জমি ও সবজি ক্ষেতসহ নানা পণ্যের কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। 

ভুক্তভোগী আব্দুস সালাম বলেন, বালু খেকোদের জন্যেই এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ এখন চরম ভোগান্তিতে আছে। বন্যার পানিতে তার মাছের ঘের, সবজি ক্ষেতসহ অন্যান্য আসবাব পত্রের প্রায় ৩০ লাখ টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। 

মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার ঘরে কোমর সমান পানি। এখন আশ্রয় কেন্দ্রে থাকতে হচ্ছে আমাদের পরিবারের সদস্যদের। ঘর থেকে কোন জিনিসপত্র বাহির করতে পারিনি। বন্যা আমাদের সব কিছু নষ্ট করে ফেলেছে।’ বালু খেকোদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। 

ইমান আলী বলেন, ‘হঠাৎ করে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে আমরা ভাবতেও পারিনি। বাড়ি ঘরে এখন শুধু পানি আর পানি। সবদিকে পানি থাকলেও আমরা বর্তমানে বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য ভুগছি।’ মতিউর রহমান নামের আরেকজন বলেন, ‘বন্যার পানিতে আমার সবজি ক্ষেত ও ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। এখন আমি নিরুপায়। সরকার যদি আমাদের সহায়তা করে তা হলে পরিবার পরিজন নিয়ে কোন রকম চলতে পারব।’ 

স্থানীয়রা জানান, খোয়াই নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, নদী শাসন এবং স্থায়ীভাবে তীর সংরক্ষণের কার্যকর উদ্যোগ না নিলে প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগে পড়তে হবে তাদের। এ অবস্থায় কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানান তারা। 

লস্করপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান উজ্জ্বল মিয়া জানান, এমন বন্যা এই এলাকায় আর দেখেননি। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ত্রাণ বিতরণ শুরু করেছে প্রশাসন এবং ৮টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু রাখা হয়েছে। বালু উত্তোলকারিদের জন্যেই এই ভয়াবহ পরিস্থিতি। 

অন্যদিকে নিন্মাঞ্চলে এখন প্লাবিত থাকলেও বর্তমানে ফুসে উঠা খোয়াই নদীর পানি অনেকটাই কমেছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এ অবস্থায় বন্যা কবলিত এলাকা থেকে ধীরে ধীরে পানি নামছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, ‘ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে যারা আশ্রয় নিয়েছেন জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দ্রুত ভাঙনের স্থানে বাঁধ নির্মাণ করা হবে।’

জাতীয় সংসদের হুইপ ও হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব জি কে গউছ বলেন, ‘অনেকেই অভিযোগ করেছেন বালু উত্তোলনর ফলে বাঁধ ভেঙেছে। খোয়াই নদী থেকে বালু উত্তোলন করার জন্য ইজারা দেয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। যারা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করেছে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নিবে।’


শেয়ার করুনঃ

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ থেকে আরো পড়ুন

হবিগঞ্জ, বন্যা, খোয়াই নদী, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, ক্ষয়ক্ষতি

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ