০৭ জুলাই ২০২৬

ইতিহাস-ঐতিহ্য / ঐতিহ্য

দেড় শতকের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন হাজারো কারিগর

হাওরে জীবনের ভরসা গড়ে ওঠে সুনামগঞ্জের মাইজবাড়িতে

প্রতিনিধি, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ৬ জুলাই, ২০২৬ ১২:১১ অপরাহ্ন

ছবিঃ নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত কারিগরেরা

হাতুড়ির ছন্দময় শব্দে মুখর পুরো এলাকা। কোথাও করাতে কাঠ চেরা হচ্ছে, কোথাও আগুনের তাপে কাঠ বাঁকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও দক্ষ হাতে পেরেক বসিয়ে কাঠের টুকরোগুলোকে জোড়া লাগিয়ে তৈরি হচ্ছে একটি নৌকা। সকাল গড়াতেই এমন কর্মব্যস্ততায় প্রাণ ফিরে পায় সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মাইজবাড়ি গ্রাম।


বর্ষা এলেই হাওরাঞ্চল পরিণত হয় অথৈ জলরাশিতে। তখন নৌকাই হয়ে ওঠে মানুষের চলাচল, জীবিকা ও দৈনন্দিন জীবনের একমাত্র ভরসা। আর সেই ভরসার নৌকাগুলোই বছরের পর বছর তৈরি হচ্ছে মাইজবাড়িতে। দেড় শতকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য আজও ধরে রেখেছেন গ্রামের কয়েক হাজার কারিগর।


সুনামগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের মাইজবাড়ি এখন পরিচিত ‘নৌকা তৈরির গ্রাম’ হিসেবে। স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, প্রায় ১৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে বংশপরম্পরায় নৌকা তৈরির কাজ চলছে। বর্তমানে তিন হাজারের বেশি মানুষের প্রধান জীবিকা এই শিল্প।


গ্রামটিতে তৈরি হয় বারকি, খিলুয়া, ডিঙিসহ নানা ধরনের নৌকা। সুনামগঞ্জের চাহিদা মিটিয়ে এসব নৌকা যায় সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।


স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, হাওরাঞ্চলের প্রায় ৭ থেকে ৯ লাখ মানুষের যাতায়াত ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন নৌকা। তাই বর্ষা যত ঘনিয়ে আসে, ততই ব্যস্ত হয়ে ওঠেন মাইজবাড়ির কারিগররা। বছরে প্রায় ২০ থেকে ২২ কোটি টাকার নৌকা বিক্রি হয় এই গ্রাম থেকে। নৌকার ধরন ও আকার অনুযায়ী প্রতিটির দাম ১২ হাজার টাকা থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত।


একটি নৌকায় পেরেক বসানোর ফাঁকে কথা হয় কারিগর হাফিজ উদ্দিনের সঙ্গে। প্রায় ৩০ বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত তিনি। বললেন, ‘গত কয়েক দিন ধরে প্রচণ্ড গরম। তবু কাজ থামানোর সুযোগ নেই। হাতে বেশ কয়েকটি অর্ডার রয়েছে। এই কাজ করেই সংসার চালাই। কিন্তু আগের মতো লাভ এখন আর থাকে না।’


পাশেই কাজ করছিলেন আরেক কারিগর জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি বলেন, ‘সারা বছরই নৌকা বানাই। তবে বর্ষার আগে কাজের চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। তখন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। এই কাজের আয়েই আমাদের সংসার চলে।’

সুনামগঞ্জের মাইজবাড়িতে নৌকা তৈরি করে তা বিক্রির জন্য রেখে দিয়েছেন কারিগরেরা

নৌকা কিনতে তাহিরপুর উপজেলা থেকে এসেছেন আমজাদ আলী। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাড়ি হাওরের মধ্যে। বর্ষায় নৌকা ছাড়া কোথাও যাওয়া যায় না। বাজার করা, বাচ্চাদের স্কুল-কলেজে নেওয়া, রোগী হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া—সবকিছুই নৌকার ওপর নির্ভরশীল। আগের নৌকাটি নষ্ট হয়ে গেছে, তাই নতুনটি কিনতে এসেছি। মাইজবাড়ির নৌকার মান ভালো বলেই এখানে আসা।’


তবে ঐতিহ্যের এই শিল্প এখন নানা সংকটে। আগে স্থানীয়ভাবে নৌকা তৈরির কাঠ পাওয়া গেলেও এখন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কাঠ আনতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে পুঁজির অভাবে অনেক কারিগর মহাজনের অর্থে কাজ করেন। ফলে নৌকা বিক্রির লাভের বড় অংশ চলে যায় মহাজনের হাতে।


নৌকা ব্যবসায়ী সুলেমান মিয়া বলেন, ‘আগে আশপাশ থেকেই কাঠ পাওয়া যেত। এখন দূর-দূরান্ত থেকে আনতে হয়। কাঠের দাম বেড়েছে, শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে। কিন্তু সেই হারে নৌকার দাম বাড়ানো যায় না। তাই পরিশ্রমের তুলনায় লাভ খুবই কম।’


আরেক ব্যবসায়ী আবু বক্কুরের দাবি, সহজ শর্তে সরকারি ঋণ ও আর্থিক সহায়তা পেলে এই শিল্পকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে টিকিয়ে রাখা যাবে বহু বছরের ঐতিহ্য।


মাইজবাড়ির নৌকা শিল্পের উন্নয়নে ইতিমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ বিসিকের উপব্যবস্থাপক এম এন এম আসিফ। তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের আওতায় মাইজবাড়ির নৌকা শিল্পের উন্নয়নে বিসিক কাজ করছে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে কারিগরদের ক্ষুদ্র ঋণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের জন্য আবেদন করলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও দেওয়া হবে।


বর্ষার পানি নামবে, হাওরের রূপ বদলাবে। কিন্তু মাইজবাড়ির কারিগরদের হাতের তৈরি নৌকা হয়তো আরও বহু বছর হাওরের মানুষের জীবন ও জীবিকার গল্প বয়ে নিয়ে চলবে। সেই সঙ্গে টিকিয়ে রাখবে বাংলার এক প্রাচীন কারুশিল্পের ঐতিহ্য।


শেয়ার করুনঃ

ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে আরো পড়ুন

সুনামগঞ্জের মাইজবাড়ি , মাইজবাড়ি নৌকা গ্রাম, নৌকা তৈরির গ্রাম , সুনামগঞ্জ নৌকা শিল্প, হাওরের নৌকা , কাঠের নৌকা, নৌকা কারিগর, হাওরাঞ্চলের জীবন , ঐতিহ্যবাহী নৌকা , বাংলাদেশের নৌকা শিল্প

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ