২৭ জুন ২০২৬

তথ্যপ্রযুক্তি-শিক্ষা / ক্যাম্পাস

গৌরবের ১৩৫ বছরে মুরারিচাঁদ কলেজ, র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষ দশে

শিক্ষা, ঐতিহ্য ও নেতৃত্বের ১৩৪ বছরের ইতিহাস বহন করছে এমসি কলেজ; সংকটে রয়েছে আসাম প্যাটার্নের শতবর্ষী ভবনগুলো।

মিফতা হাসান

প্রকাশঃ ২৭ জুন, ২০২৬ ১২:২৮ অপরাহ্ন


সিলেট তথা দেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ একটি অনন্য ঐতিহ্যের নাম। ১৮৯২ সালের ২৭ জুন যাত্রা শুরু করা এই প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজ ১৩৪ বছর পূর্ণ করে ১৩৫ বছরে পদার্পণ করেছে। দীর্ঘ এই সময়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসন, রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়া অসংখ্য কৃতি শিক্ষার্থীর জন্ম দিয়েছে ঐতিহ্যবাহী ওই প্রতিষ্ঠানটি।


সম্প্রতি সরকারি কলেজগুলোর শ্রেণিবিন্যাসে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে এমসি কলেজ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী দেশের ৭০৮টি সরকারি কলেজকে চার শ্রেণিতে ভাগ করা হলে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে স্থান পাওয়া ৮১টি কলেজের মধ্যে এমসি কলেজের অবস্থান অষ্টম।


তবে এই গৌরবের পাশাপাশি রয়েছে কিছু দীর্ঘদিনের সমস্যা। শতবর্ষী আসাম প্যাটার্নের ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলো সংরক্ষণের অনিশ্চয়তা এবং এক দশকের বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা কলেজ ক্যান্টিনের কারণে ভোগান্তি পোহাতে হয় কলেজটির প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থীকে। 


নলখাগড়ার ঘর থেকে থ্যাকারে টিলা


১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ঐতিহ্যবাহী এই কলেজটির গোড়াপত্তন হয়েছিল ১৮৮৬ সালে। তখন প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল ‘মুরারিচাঁদ উচ্চ বিদ্যালয়’। তৎকালীন রাজা গিরিশ চন্দ্র রায় তাঁর মাতামহ জমিদার মুরারিচাঁদ রায়ের স্মৃতি রক্ষার্থে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। 


শুরুতে সিলেট শহরের গোবিন্দচরণ পার্ক (বর্তমান হাসান মার্কেট) এলাকায় বাঁশ ও নলখাগড়া দিয়ে নির্মিত ঘরে এর শিক্ষা কার্যক্রম চলত। পরবর্তীতে রাজা গিরিশ চন্দ্র রায়ের উদ্যোগে মাত্র ১৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজ হিসেবে এমসি কলেজের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২৭ জুন, ১৮৯২ সালে।


১৯১২ সালে সরকারি কলেজ হিসেবে অধিভুক্ত হওয়ার পর ১৯২১ সালে তৎকালীন আসামের শিক্ষামন্ত্রী খান বাহাদুর সৈয়দ আব্দুল মজিদের উদ্যোগে কলেজটি প্রথম শ্রেণির কলেজে উন্নীত হয়। একই সময় টিলাগড়ের মনোরম থ্যাকারে টিলায় স্থানান্তর করা হয় ক্যাম্পাস। পরে ১৯২৫ সালে উদ্বোধন করা হয় প্রায় দেড়শ একর আয়তনের এই শতবর্ষী এমসি কলেজের।


এদিকে ১৯২৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় অসাধারণ ফলাফলের মাধ্যমে উপমহাদেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে কলেজটি।


প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থীর প্রাণকেন্দ্র


শুরুতে মাত্র ১৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা করা দেড়শত একরের এই প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে অধ্যয়ন করছেন ১১ হাজার ৮৮৬ জন শিক্ষার্থী। 


বর্তমানে কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে (একাদশ-দ্বাদশ) শিক্ষার্থী সংখ্যা ৬০০ জন। স্নাতক পাস কোর্সে (বি.এ) ৩ হাজার ৭৪০ জন, স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে (অনার্স) ৪ হাজার ৫০৬ জন এবং মাস্টার্স পর্যায়ে (প্রিলিমিনারি ও শেষপর্ব) প্রায় ৩ হাজার ৪০ জন শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছেন।


তাছাড়া বর্তমানে এমসি কলেজে ১০৮ জন শিক্ষক রয়েছেন। একইসঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ১৫১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিরলসভাবে কলেজের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন।


সরকারি কলেজে অষ্টম এমসি


সরকারি কলেজগুলোর মান, শিক্ষার্থীসংখ্যা ও প্রশাসনিক প্রয়োজন বিবেচনায় গত বছরের নভেম্বরে দেশের সব সরকারি কলেজকে চার ক্যাটাগরিতে বিভাজন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে ‘এ ক্যাটাগরিতে স্থান পাওয়া ৮১টি কলেজের মধ্যে অষ্টম স্থানে রয়েছে এমসি কলেজ। 


প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দেশে মোট সরকারি কলেজের সংখ্যা ৭০৮। এর মধ্যে ‘এ ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়েছে ৮১টি, ‘বি’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে ৭৪টি কলেজ, ‘সি’ক্যাটাগরিতে ৪৪৬টি কলেজ এবং ‘ডি’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে ১০৭টি সরকারি কলেজ।


ঝুঁকিতে আসাম প্যাটার্নের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য


সবুজ টিলা, লাল-সাদা পদ্মে ভরা পুকুর, পাখির কলতান আর নান্দনিক পরিবেশের জন্য এমসি কলেজকে অনেকেই সিলেটের সবচেয়ে সুন্দর শিক্ষাঙ্গন বলে মনে করেন। ক্যাম্পাসে রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার বইয়ের সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, পুরোনো আদলের শহীদ মিনার এবং দৃষ্টিনন্দন মসজিদ।


তবে এ কলেজের শতাব্দী প্রাচীন আসাম প্যাটার্নের ভবনগুলো এখন অনেকটাই অস্তিত্ব সংকটে। একদিকে যেমন নেই সংরক্ষণের উদ্যোগ, অন্যদিকে এ ভবনগুলো অপসারণ করে নতুন ভবন নির্মাণে আগ্রহের কারণে হুমকির সম্মুখীন এই প্রাচীন বিদ্যাপীঠের অনন্য ঐতিহ্য।


ঐতিহ্যবাহী এসকল ভবন সংরক্ষণের মাধ্যমে শতাব্দী প্রাচীন এ বিদ্যাপীঠের গৌরবকে সমুন্নত রাখতে দাবি জানিয়ে প্রাক্তন-বর্তমান শিক্ষার্থীদের নিয়ে জনমত গড়ে তুলতে ভূমিকা পালন করছে পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট।


এক দশক ধরে নেই ক্যান্টিন 


জাতীয় পর্যায়ে শীর্ষস্থানীয় কলেজের স্বীকৃতি পেলেও শিক্ষার্থীদের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে আছে ক্যান্টিন সংকট। কলেজের একমাত্র ছাত্র-ক্যান্টিনটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে।


কলেজ প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ২০১৪ সাল পর্যন্ত কলেজে ক্যান্টিনটি চালু ছিল। কিন্তু ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন) নেতারা বাকী খেয়ে বিল পরিশোধ না করায় ব্যবসা গুটিয়ে নেন ক্যান্টিনের ইজারাদার। এরপর আরও প্রায় ৪ বছর পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল ক্যান্টিনটি। ২০১৭ সালে ক্যান্টিনের পরিত্যক্ত ভবনটি ভেঙে সেই স্থানে ১০ তলা ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এরপর থেকে ক্যান্টিনের কোনো চিহ্নই নেই এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে।


এ অবস্থায় ক্যাম্পাসে থাকা ভ্রাম্যমাণ দোকানের ঝালমুড়ি, ফুচকা কিংবা বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবারই তাদের ভরসা। এসব খাবার অনেক ক্ষেত্রে ধুলোবালুর সংস্পর্শে থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে হয় তাদের। আবার অনেক সময় খাবারের জন্য ক্যাম্পাসের বাহিরে যেতে হয় বলে পাঠদানেও ব্যাঘাত ঘটে।


বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান তানিম বলেন, ‘এমসি কলেজে হাজারো শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। শুনেছি, আগে কলেজে ক্যান্টিন চালু ছিল, কিন্তু এখন নেই। ফলে ক্লাসের ফাঁকে ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তার অস্বাস্থ্যকর ঝালমুড়ি-ফুচকা খেয়ে প্রায়ই পেটের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তাই অবিলম্বে একটি পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত ক্যান্টিন স্থাপন করার জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি। এটি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য রক্ষা করবে এবং শিক্ষা পরিবেশকে আরও উন্নত করবে।’


দর্শন বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সুমন মালাকার শাওন জানান, কলেজে মানসম্মত ও স্বাস্থ্যকর খাবারের জন্য কোনো ক্যান্টিন নেই। ফলে প্রতিদিন ক্যাম্পাসে ঝালমুড়ি, ফুচকার মতো অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হয়, যা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

 

তিনি বলেন, ‘ক্যান্টিন থাকলে হয়তো কিছুটা হলেও ঘরোয়া পরিবেশে খাদ্য খাওয়া যেত। এতে কিছুটা হলেও স্বাস্থ্যকর খাবারের চাহিদা মিটতো। কিন্তু ক্যান্টিন না থাকায় তাও আর হয়ে উঠছে না।’


‘অনেক সময় বাইরে গিয়ে খাবার খেতে হলে নানা সমস্যা তৈরি হয়। বাইরে খাদ্যের পরিবেশ ও মান অনেক ক্ষেত্রেই ভালো নয়। এছাড়া বাইরে ধূমপানের মতো অস্বাস্থ্যকর ও বিরক্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এতে আমাদের শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নষ্ট হয়’— যোগ করেন সুমন।  


প্রশাসন যা বলছে


মুরারিচাঁদ কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ তোফায়েল আহাম্মদ বলেন, ‘মুরারিচাঁদ কলেজের ১৩৫ বছরের পথচলা আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। এই কলেজের শিক্ষার্থীরা দেশে-বিদেশে সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। অনেকে দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দেশের সেবায় নিয়োজিত আছে। পাশাপাশি সুস্থ ধারার রাজনীতিতেও আমাদের শিক্ষার্থীরা অবদান রেখে চলেছে। এই গৌরবের পতাকা যেন অক্ষুণ্ণ রাখতে পারি সেই লক্ষ্যে আমরা সবসময় কাজ করে যাচ্ছি।’ 


ক্যান্টিন চালুর বিষয়ে সিলেট ভয়েসকে তিনি বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানে কিছু নিয়মনীতি থাকে। সেই নিয়মনীতি অনুসরণ করেই আমরা পুনরায় কলেজে ক্যান্টিন স্থাপনের চেষ্টা করছি।’


শতবর্ষী আসাম প্যাটার্নের ভবনের বিষয়ে মোহাম্মদ তোফায়েল আহাম্মদ বলেন, ‘এই আসাম প্যাটার্নের ভবনগুলো আমাদের একটি অনন্য ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। তাই ভবনগুলোর মূল নকশা পুরোপুরি ঠিক রেখে, এগুলোকে কীভাবে পুনরায় সংস্কার ও ব্যবহারোপযোগী করা যায়, সেই লক্ষ্যে আমরা সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছি।’


শেয়ার করুনঃ

তথ্যপ্রযুক্তি-শিক্ষা থেকে আরো পড়ুন

মুরারিচাঁদ কলেজ, কলেজের ঐতিহ্য, উচ্চশিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলেজ র্যাঙ্কিং, সরকারি কলেজ

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ