সিলেটের উন্নয়নে পর্যটন-যোগাযোগ খাতে বরাদ্দের সুষ্ঠু বণ্টন চান ব্যবসায়ীরা
রাজনীতি
প্রকাশঃ ১৩ জুন, ২০২৬ ১০:১৭ অপরাহ্ন
দেশের অন্যতম পর্যটননির্ভর অঞ্চল সিলেটে পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নকে ঘিরে বাজেট নিয়ে ছিল অনেক প্রত্যাশা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত এই বাজেটকে স্বাগত জানালেও যোগাযোগ ও পর্যটন খাতে বরাদ্দের স্বল্পতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সুস্পষ্ট উদ্যোগের অভাব এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বিদ্যমান সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন সিলেটের ব্যবসায়ীরা।
এদিকে বাজেটে কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও সিলেটের সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্প, চা খাত ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধানের প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায়নি।
সিলেটের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে পর্যটন, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই বলে মত প্রকাশ করেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে সিলেটের উন্নয়নে বাজেটে যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে সেটার সুষ্ঠু বণ্টন চান তারা।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিলেটের যোগাযোগ খাতের উন্নয়নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সিলেট বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক লজিস্টিক হাবে উন্নীত করার পরিকল্পনা, যা আমদানি-রপ্তানি ও কার্গো পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। পাশাপাশি দেশের সব জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার উদ্যোগের ফলে সিলেটের রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোর চারলেনে উন্নীতকরণ, এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সিলেটের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ আরও উন্নত হবে। নৌপথ উন্নয়ন ও বন্দর সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগও সিলেট অঞ্চলের বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
একই সঙ্গে বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতি ও পর্যটন খাতের বিকাশে প্রাথমিকভাবে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সবমিলিয়ে সিলেটের উন্নয়নে বাজেটে অনেক পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। তবে সিলেটের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমান বাজেট একটি ‘আশাবাদী বাজেট’। তবে এটি এখনও পুরোপুরি বাস্তবমুখী হয়ে উঠতে পারেনি। অবশ্য বাজেটে যেটা বরাদ্দ করা হয়েছে, সেটার পূর্ণ প্রতিফলনও যদি ঘটে তাহলে সিলেটে ব্যবসা বাণিজ্যের কিছুটা পরিবর্তন ঘটবে বলে জানান তারা।
ব্যবসায়ীরা জানান, শুধু বরাদ্দ ঘোষণা করলেই হবে না, বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, বরাদ্দের অন্তত অর্ধেকও যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে তা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এদিকে চা শিল্পের সুরক্ষায় সীমান্ত দিয়ে চোরাইপথে ভারতীয় চা প্রবেশ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, জটিল কর ও ভ্যাট ব্যবস্থা, চাঁদাবাজি এবং নিরাপত্তাহীনতার মতো সমস্যাগুলোও ব্যবসা সম্প্রসারণের বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন তারা।
ব্যবসায়ীদের মতে, পর্যটন খাতের আধুনিকায়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে সিলেট দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। তবে এর জন্য বাজেট ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদ বলেন, ‘বর্তমান বাজেট একটি আশাবাদী বাজেট। তবে এটি এখনও পুরোপুরি বাস্তবমুখী হয়ে উঠতে পারেনি।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র তিন মাস হওয়ায় তাদের কাছ থেকে এখনই একটি পরিপক্ব বাজেট প্রত্যাশা করা কঠিন। সরকারের পরিকল্পনার সুফল পেতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।’
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে ফালাহ উদ্দিন বলেন, ‘শিক্ষিত জনগোষ্ঠী আইনকানুন মেনে চলেন। এটা আমাদের জন্য সুখবর।’
তবে পর্যটন খাতে বরাদ্দকৃত ৩০০ কোটি টাকা শুধুমাত্র সিলেটের মতো সম্ভাবনাময় অঞ্চলের জন্যও কম। আর সারাদেশের তুলনায় এটি খুবই অপ্রতুল। ভঙ্গুর অর্থনীতির এই সময়ে ৩০০ কোটি টাকা দিয়ে পর্যটন শিল্পকে শুধুমাত্র দাঁড় করানো যাবে। এই শিল্পের টেকসই উন্নয়নে হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন, এমনটাই মনে করছেন ওই ব্যবসায়ী।
ফালাহ উদ্দিন বলেন, ‘পর্যটনের উন্নয়নের মূল শর্ত হলো সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথের উন্নয়ন এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’ একই সঙ্গে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী নীতিমালা প্রণয়নেরও দাবি জানান তিনি।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি খন্দকার শিপার আহমদ বলেন, ‘সিলেটে বড় কোনো শিল্পকারখানা না থাকায় পর্যটনই এ অঞ্চলের প্রধান শিল্প। তাই এ খাতের উন্নয়নে আরও বেশি বরাদ্দ ও বিনিয়োগ প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘বাজেটে কম বরাদ্দ হলেও তা দ্রুত ও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রশাসনিক ও মন্ত্রী পর্যায়ের কঠোর তদারকি ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘যোগাযোগ ব্যবস্থায় সিলেট এখন অনেক পিছিয়ে। যোগাযোগ খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না হলে উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।’ এছাড়া ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সীমাবদ্ধতা এবং উচ্চ বিমান ভাড়া প্রবাসীদের দেশে আসা ও বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আব্দুল জলিল বলেন, ‘প্রতি বছরই পর্যটন খাতে কিছু বরাদ্দ দেওয়া হয়, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।’ পর্যটননির্ভর অর্থনীতির অঞ্চল হিসেবে সিলেটের জন্য আরও বড় আকারের বরাদ্দ প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
সিলেট বাজেট, পর্যটন খাত, যোগাযোগ অবকাঠামো, সিলেট চেম্বার, ব্যবসায়ীদের দাবি