গোয়াইঘাটে কাজ শেষ না হতেই কার্পেটিং উঠে গর্ত, প্রশ্নের মুখে সড়ক সংস্কার
সিলেটজুড়ে
প্রকাশঃ ৪ জুন, ২০২৬ ১২:১৯ অপরাহ্ন
ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই বিনন্দপুর গ্রামের একটি মাটির রান্নাঘরে শুরু হয় দিনের ব্যস্ততা। শুকনো কাঠে আগুন ধরানোর সঙ্গে সঙ্গে উঠতে থাকে ধোঁয়া। সেই ধোঁয়া পেরিয়ে যায় উঠান, ছুঁয়ে যায় পুকুরপাড়ের নারকেলগাছ, হারিয়ে যায় আকাশে।
দৃশ্যটি গ্রামের মানুষের কাছে বহু পুরোনো। প্রায় আট দশক ধরে একই রান্নাঘরের উনুনে আগুন জ্বলছে। সেই উনুনেই প্রতিদিন রান্না হয় প্রায় পঞ্চাশজন মানুষের খাবার। শুনতে অবাক লাগলেও তারা কোনো অতিথি নন, কোনো ধর্মীয় আয়োজন কিংবা উৎসবের সমাবেশও নয়। সবাই একই পরিবারের সদস্য। একসঙ্গে বসবাস, একসঙ্গে রান্না, একসঙ্গে খাওয়া—এই নিয়মেই কেটে যাচ্ছে তাদের জীবন।
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার পূর্ব জুড়ী ইউনিয়নের বিনন্দপুর গ্রামের রুদ্রপাল পরিবার আজও ধরে রেখেছে একান্নবর্তী পরিবারের সেই ঐতিহ্য, যা আধুনিক সমাজে ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। যখন চারপাশে ছোট পরিবারই স্বাভাবিক বাস্তবতা, তখন রুদ্রপাল পরিবারের গল্প যেন অন্য এক সময়ের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।
গ্রামের সরু পথ ধরে তাদের বাড়িতে পৌঁছালে প্রথমেই চোখে পড়ে একটি বড় পুকুর। চারপাশে ফলদ গাছ, ফুলের গাছ আর সবজির বাগান। কয়েকটি টিনের ঘরকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে একটি বড় উঠান। উঠানের এক পাশে খড়ের ছাউনি দেওয়া মাটির রান্নাঘর। পরিবারের সবাইয়ের খাবার তৈরি হয় এখানেই।
স্থানীয়দের কাছে পরিবারটি শুধু একটি পরিবার নয়, এক ধরনের বিস্ময়ও।
পূর্ব জুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “আমাদের এলাকায় এমন পরিবার আর নেই বললেই চলে। সুযোগ পেলেই আমি তাদের বাড়িতে যাই। এত মানুষ একসঙ্গে মিলেমিশে থাকছে—এটা সত্যিই গর্বের বিষয়।”
রুদ্রপাল পরিবারের ইতিহাস শুরু হয়েছিল বর্তমান বাংলাদেশের বাইরে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলায়।
পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ভীম রুদ্রপাল ব্রিটিশ আমলে জীবিকার সন্ধানে তৎকালীন পূর্ববাংলায় চলে আসেন। তিনি ধামাই চা বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে দেশভাগের আগে বিনন্দপুর পাহাড় এলাকায় অল্প দামে কিছু জমি কিনে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলেন। চা বাগানের চাকরি ছেড়ে নতুন জীবনের যে ভিত্তি তিনি তৈরি করেছিলেন, তার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে আজকের এই বৃহৎ পরিবার।
ভীম রুদ্রপাল, তার দুই ছেলে মুরারি ও কেশব—তিন প্রজন্মের সেই পুরোনো অভিভাবকেরা এখন আর বেঁচে নেই। তবে তাদের রেখে যাওয়া পারিবারিক বন্ধন অটুট আছে। মুরারি ও কেশবের নয় ছেলে ছিলেন। আজ সেই নয় ভাইয়ের পরিবার, তাদের সন্তান-সন্ততি এবং নাতি-নাতনিরা একই ছাদের নিচে বসবাস করছেন।
পরিবারের বর্তমান কর্তা পলাশ রুদ্রপাল। বয়স প্রায় ৬০ বছর। পরিবারের আয়-ব্যয়, জমিজমা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তার কাঁধে। পলাশ রুদ্রপাল বলেন, “ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি সবাই একসঙ্গে আছি। এখনও একই রান্নাঘরে রান্না হয়, সবাই একসঙ্গে খাই। আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা কখনও মনে হয়নি।”
সংসার বড় হলেও কাজের বণ্টন রয়েছে সুস্পষ্টভাবে।
পরিবারের বড় বধূ নীলিমা রুদ্রপাল জানান, প্রতিদিন তিন পালায় রান্না হয়। পরিবারের সদস্যরা নিজেদের দায়িত্ব ভাগ করে নেন। ফলে এত বড় সংসারেও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় না। তিনি বলেন, “সবাই যার যার কাজ করে। একে অন্যকে সহযোগিতা করে। তাই বড় কোনো সমস্যা হয় না।”
পরিবারের প্রবীণ সদস্য সোহাগী রুদ্রপাল, যিনি মুরারি রুদ্রপালের স্ত্রী, তার জীবনের বড় প্রাপ্তি এই পারিবারিক ঐক্য। “ছেলে, বউমা, নাতি-নাতনিদের নিয়ে ভালো আছি। চাই সবাই যেন সবসময় এভাবেই একসঙ্গে থাকে,” বলেন তিনি।
এত বড় পরিবারকে একসঙ্গে ধরে রাখার পেছনে রয়েছে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তিও।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ভীম রুদ্রপালের কেনা ছোট্ট জমি এখন প্রায় ১০০ বিঘায় বিস্তৃত। বছরে আউশ ও আমন ধানের চাষ হয়। উৎপাদন হয় ৩০০ থেকে ৪০০ মণ ধান। সেই ধানেই সারা বছরের চালের চাহিদা পূরণ হয়ে যায়।
শুধু ধান নয়, রয়েছে পাঁচটি মাছের খামার, মৌসুমি সবজির ক্ষেত, ফলের বাগান এবং ৫০ থেকে ৬০টি নারকেলগাছ। পরিবারের প্রয়োজন মিটিয়ে অতিরিক্ত উৎপাদিত ফসল বাজারে বিক্রি করা হয়। সেই অর্থ জমা হয় যৌথ তহবিলে।
পলাশ রুদ্রপাল বলেন, “মাছ, সবজি, মশলাসহ অনেক কিছুই বাইরে থেকে কিনতে হয় না। যা বাড়তি থাকে, তা বিক্রি করেই সংসারের অনেক খরচ চলে।”
পরিবারের সদস্যরা শুধু কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল নন। নয় ভাইয়ের মধ্যে একজন শিক্ষক, একজন বেসরকারি চাকরিজীবী, একজন গ্রাম্য পশুচিকিৎসক এবং একজন বিদেশে কর্মরত। অন্যরা কৃষিকাজ ও পারিবারিক সম্পদ দেখভাল করেন।
স্থানীয় দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অশোক রঞ্জন রুদ্রপাল মনে করেন, এই পরিবার বর্তমান সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
তার ভাষায়, “একটি পরিবার যখন একসঙ্গে থাকে, তখন সদস্যরা পরস্পরের কাছ থেকে শক্তি পায়। নতুন প্রজন্ম সম্মান, সহমর্মিতা আর সহযোগিতার শিক্ষা লাভ করে। রুদ্রপাল পরিবার সেই মূল্যবোধেরই উদাহরণ।”
সময়ের সঙ্গে সমাজ বদলেছে। বদলেছে পারিবারিক কাঠামোও। যৌথ পরিবারের জায়গা নিয়েছে ছোট ছোট পরিবার। কিন্তু বিনন্দপুরের রুদ্রপাল পরিবার যেন সেই পরিবর্তনের স্রোতে গা ভাসায়নি। আজও একই উঠানে শিশুদের খেলাধুলা, একই রান্নাঘরে ধোঁয়া ওঠা, একই টেবিলে বসে খাবার খাওয়া—সবকিছু মিলিয়ে পরিবারটি বহন করে চলেছে কয়েক প্রজন্মের উত্তরাধিকার।
সন্ধ্যা নামলে মাটির রান্নাঘরের চুলায় আবার আগুন জ্বলে ওঠে। ধোঁয়া ধীরে ধীরে ভেসে যায় আকাশের দিকে। সেই ধোঁয়ার সঙ্গে যেন মিশে থাকে আশি বছরের এক গল্প—একটি চুলা, পঞ্চাশটি মুখ আর ভাঙতে না-পারা এক সংসারের গল্প।
রুদ্রপাল পরিবার, বিনন্দপুর জুড়ী, একান্নবর্তী পরিবার বাংলাদেশ, যৌথ পরিবার গল্প,