২১ মে ২০২৬

দৈনন্দিন / দিবস

আন্তর্জাতিক চা দিবস

চা শিল্পের টেকসই উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে শাবিপ্রবির এফইটি বিভাগ

দেবকল্যাণ ধর বাপন

প্রকাশঃ ২১ মে, ২০২৬ ৩:৫১ অপরাহ্ন


সিলেটের পাহাড়ঘেরা সবুজ চা বাগান শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ বটে। প্রতিদিনের এক কাপ চায়ের পেছনে যেমন জড়িয়ে আছে লাখো শ্রমিকের ঘাম, তেমন গবেষকদের উদ্ভাবন আর একটি শিল্পকে টিকিয়ে রাখার নিরন্তর প্রচেষ্টা। জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চাপে যখন দেশের চা শিল্প নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত তৈরি করছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টি টেকনোলজি (এফইটি) বিভাগ।


আজ ২১ মে আন্তর্জাতিক চা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘Sustaining Tea, Supporting Communities’। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ঘোষিত এ দিবসের লক্ষ্য টেকসই চা উৎপাদন, শ্রমিক কল্যাণ, নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পরিবেশবান্ধব চাষাবাদের গুরুত্ব তুলে ধরা।

শাহপরান হলের পার্শ্ববর্তী টিলার ওপরের চা বাগানে শিক্ষার্থীরা

বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে চা শিল্পের অবদান দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশজুড়ে রয়েছে চা শিল্প। বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৭০টি চা বাগান, ২ হাজার ৫০০–এর বেশি ক্ষুদ্র চা চাষি এবং এক লাখের বেশি নিবন্ধিত শ্রমিক রয়েছেন। বছরে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ৯১ মিলিয়ন কেজি চা।


তবে এই শিল্প এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতাও বাড়ছে।


চা বিশেষজ্ঞ ও শাবিপ্রবির এফইটি বিভাগের অধ্যাপক ড. ইফতেখার আহমদ বলেন, বর্তমানে চা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে গবেষণা, প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদের বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে মানসম্পন্ন উৎপাদন, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে।


তিনি জানান, দেশে চা প্রযুক্তিভিত্তিক উচ্চশিক্ষার অন্যতম বিশেষায়িত বিভাগ এটি। ২০০৪-০৫ শিক্ষাবর্ষে ‘টি টেকনোলজি’ নামে যাত্রা শুরু হওয়া বিভাগটি পরে ‘ফুড অ্যান্ড টি টেকনোলজি’ হয়ে বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ ‘ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টি টেকনোলজি’ বিভাগে রূপ নিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে চা বাগানে পাতা পর্যবেক্ষণ করছেন এফইটি বিভাগের অধ্যাপক ড. ইফতেখার আহমদ

বিভাগটিতে চা উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্য প্রকৌশল, খাদ্য নিরাপত্তা, প্যাকেজিং ও গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণা পরিচালিত হয়। শিক্ষার্থীরা চা শিল্পের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের সুযোগও পান।


এদিকে ২০২২ সালে দেশে চা নিয়ে ব্যতিক্রমধর্মী এক গবেষণায় ‘টি-কোলা’ নামে স্বাস্থ্যসম্মত টি-কার্বোনেটেড ড্রিংকস তৈরি করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়–এর ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টি টেকনোলজি (এফইটি) বিভাগের একদল গবেষক। ‘ব্ল্যাক টি’ ও ‘গ্রিন টি’–এই দুই উপাদান ব্যবহার করে তৈরি করা হয় পানীয়টি। টি-কোলাতে চায়ের উপকারী উপাদান যেমন পলিফেনল, ক্যাফেইন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। সেনসরি অ্যানালাইসিস টেস্টেও ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়।


বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টি টেকনোলজি (এফএটি) বিভাগের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহপরান হলের পার্শ্ববর্তী মসজিদ সংলগ্ন টিলার ওপরে একটি চা বাগান রয়েছে। এটি স্থাপনে কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট। চা বাগানটি ২০১৭ সালের মে মাসে উদ্বোধন করা হয়। শুরুতে ২৫টি চা গাছের মাধ্যমে বাগানটি শুরু হলেও এখন এখানে প্রায় ১২ শ’ চা গাছ রয়েছে। এদের মধ্যে ১৭ প্রজাতির চা গাছ রয়েছে বাগানটিতে।


বাগানটি ওই বিভাগের শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য গবেষণাগার। এফইটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন গবেষণামূলক কাজের প্রাথমিক উপাদান মূলত এ বাগান থেকেই সংগ্রহ করা হয়। চারা রোপণ, গাছের পরিচর্যা, পাতা সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, পাতা থেকে চা তৈরি, গাছের রোগ নির্ণয় ও বিভিন্ন নিরীক্ষার জন্য এটি একটি অন্য রকম গবেষণা কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।


এফইটি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিভাগটির গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে চায়ের গুণগত মান উন্নয়ন, গ্রিন টি ও ভ্যালু অ্যাডেড টি উদ্ভাবন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং টেকসই উৎপাদন প্রযুক্তি। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি নিয়েও কাজ করছেন গবেষকরা।

চা গবেষনাগারে অধ্যাপক ড. ইফতেখার আহমদ

 শাবিপ্রবির এফইটি বিভাগ দেশের বিভিন্ন চা বাগান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে শিল্প–একাডেমিক সহযোগিতা বাড়ছে এবং বাস্তব সমস্যার বৈজ্ঞানিক সমাধান বেরিয়ে আসছে। নিয়মিত আয়োজন করা হচ্ছে সেমিনার, কর্মশালা ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং।


এফইটি বিভাগে চা গবেষণার সাথে জড়িত রয়েছে এমন কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি চায়ের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বিকল্প নেই। সেই লক্ষ্যেই গবেষণা, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে শাবিপ্রবির এফইটি বিভাগ। গবেষণা, তাদের আশা, প্রযুক্তি ও টেকসই উৎপাদনের সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের চা শিল্প আগামী দিনে আরও আধুনিক ও বিশ্বমানের শিল্পে পরিণত হবে।


শেয়ার করুনঃ

দৈনন্দিন থেকে আরো পড়ুন

আন্তর্জাতিক চা দিবস ২০২৬, শাবিপ্রবি, এফইটি, ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টি টেকনোলজি, টি-কোলা, চা গবেষণা, বাংলাদেশ চা শিল্প

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ