২১ মে ২০২৬

ইতিহাস-ঐতিহ্য / ইতিহাস

‘মুল্লুকে চলো’ আন্দোলনের ১০৫ বছর: স্বপ্ন, প্রতারণা ও রক্তে লেখা চা-শ্রমিকের ইতিহাস

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ২০ মে, ২০২৬ ৫:৪২ অপরাহ্ন

ছবিঃ ছবি: সংগৃহিত

বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের মধ্যে সিলেট অঞ্চল এক অনন্য অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। উত্তর–পূর্বাঞ্চলের টিলাভূমি ও ঢালু পাহাড়ি ভূমি একদিকে যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার, অন্যদিকে তেমনি শত বছরের চা-শিল্পের জন্মভূমি। এই ভূমিতেই গড়ে উঠেছে উপনিবেশিক অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ খাত—চা-বাগান। আর এই শিল্পের আড়ালে রয়ে গেছে এক দীর্ঘ শোষণ, বঞ্চনা ও প্রতিরোধের ইতিহাস, যার সবচেয়ে বেদনাবিধুর অধ্যায় ‘মুল্লুকে চলো’ আন্দোলন।


চা প্রথমে চীনে জনপ্রিয়তা লাভ করে। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপে চায়ের প্রধান উৎস ছিল চীন। কিন্তু পরবর্তীতে চীন-জাপান যুদ্ধসহ নানা কারণে চায়ের সরবরাহ ব্যাহত হলে ইউরোপে এর সংকট দেখা দেয় এবং দাম বেড়ে যায়। বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করে ব্রিটিশরা।


১৮৩৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে চা উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাইয়ে একটি কমিশন গঠন করে। দীর্ঘ গবেষণার পর তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছায়—ভারতের আবহাওয়া ও মাটি চা চাষের জন্য উপযোগী। এর ধারাবাহিকতায় ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়ায় বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয়। এভাবেই শুরু হয় সিলেট অঞ্চলে চা শিল্পের যাত্রা, যা পরবর্তীতে উপনিবেশিক অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি হয়ে ওঠে।


চা উৎপাদন শুধু জমি বা পুঁজির বিষয় ছিল না; এর কেন্দ্রবিন্দু ছিল শ্রম। কিন্তু স্থানীয় জনগণ দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশে কঠোর পরিশ্রমে আগ্রহী না হওয়ায় ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো সস্তা শ্রমিক সংগ্রহে দালাল চক্র গড়ে তোলে।


বিহার, উড়িষ্যা, মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশসহ ভারতের বিভিন্ন দরিদ্র অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষকে “উন্নত জীবনের” প্রতিশ্রুতি দিয়ে আনা হয় সিলেট ও আসামের চা-বাগানে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। 


চা-বাগানে শ্রমিকদের পরিচয় হয় ‘কুলি’ নামে। তিন বছরের চুক্তিভিত্তিক এই শ্রমব্যবস্থা কার্যত তাদের এক ধরনের দাসত্বের জীবনে আবদ্ধ করে। অমানবিক পরিশ্রম, অল্প খাদ্য, চিকিৎসাহীনতা এবং শারীরিক নির্যাতন ছিল তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা।


ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮৬৩ থেকে ১৮৬৬ সালের মধ্যে প্রায় ৮৫ হাজার শ্রমিক আনা হয়, যার মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক অনাহার, রোগ ও দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারান।


এই দীর্ঘ বঞ্চনা ও নির্যাতনের মধ্যেই শ্রমিকদের মধ্যে জন্ম নেয় ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা—নিজ জন্মভূমি, অর্থাৎ ‘মুল্লুকে’ ফেরার স্বপ্ন। এই স্বপ্ন থেকেই গড়ে ওঠে ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমিক আন্দোলন—‘মুল্লুকে চলো’।


 ১৯২০–২১ সালের প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলন ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। এর প্রভাব চা-শ্রমিকদের মধ্যেও পড়ে। তারা ধীরে ধীরে সংগঠিত হতে শুরু করে।


১৯২১ সালের মে মাসে চরগোলা অঞ্চলের আনিপুর চা-বাগান থেকে প্রথম প্রায় ৭৫০ জন শ্রমিক পরিবারসহ বাগান ত্যাগ করেন। এটিই ইতিহাসে ‘চরগোলা এক্সোডাস’ নামে পরিচিত। এরপর আশপাশের ১৯টি বাগান থেকে হাজার হাজার শ্রমিক এই আন্দোলনে যোগ দেন।


 ব্রিটিশ প্রশাসনের হিসাবে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক এবং স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার শ্রমিক নিজ দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।


চা-বাগান ছেড়ে বেরিয়ে পড়া এই শ্রমিকদের কোনো স্পষ্ট গন্তব্য ছিল না। তারা জানতেন শুধু একটি পথ—চাঁদপুর, সেখান থেকে স্টিমারে করে কলকাতা হয়ে নিজ দেশে ফেরা যাবে।


দীর্ঘ পথ হাঁটার সময় খাদ্যাভাব, অসুস্থতা ও ক্লান্তিতে বহু নারী, শিশু ও বৃদ্ধ প্রাণ হারান। তবুও কাফেলা থেমে থাকেনি।


তারা জকিগঞ্জ, সিলেট, কুলাউড়া, শমশেরনগর, শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন স্টেশন অতিক্রম করে চাঁদপুরে পৌঁছান। সেখানে গিয়ে তারা বিপুল সংখ্যায় জড়ো হন।


চাঁদপুরে প্রথমদিকে শ্রমিকদের স্টিমারে উঠতে সহায়তা করা হয়। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ব্রিটিশ মালিকপক্ষের চাপে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেয়।


 ১৯২১ সালের ১৯–২০ মে চাঁদপুর স্টেশন ও ঘাট এলাকায় সশস্ত্র বাহিনী শ্রমিকদের ওপর হামলা চালায়। স্টিমারের পাটাতন সরিয়ে দেওয়ায় বহু নারী-শিশু মেঘনায় পড়ে প্রাণ হারান।


পরদিন রেলস্টেশন এলাকায় ঘুমন্ত শ্রমিকদের ওপর বেয়নেট ও গুলিবর্ষণ চালানো হয়। হাজার হাজার শ্রমিক নিহত হন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। লাশ গুম ও নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এই হত্যাকাণ্ড চা-শ্রমিক ইতিহাসে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত।


চাঁদপুর হত্যাকাণ্ডের পর সমগ্র অঞ্চলে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ২৪ মে থেকে আসাম–বেঙ্গল রেলওয়ে শ্রমিকরা ধর্মঘট শুরু করেন। প্রায় আড়াই মাস এই ধর্মঘট চলতে থাকে। স্টিমার শ্রমিকরাও আন্দোলনে যোগ দেন। 


এই শ্রমিক আন্দোলনের চাপের মুখে ব্রিটিশ প্রশাসন ও বাগান মালিকরা আলোচনায় বসতে বাধ্য হন। কিছু শ্রমিককে ফিরিয়ে আনা হয় চা-বাগানে, অনেকে আবার ফিরে যান নিজ দেশে।


‘মুল্লুকে চলো’ আন্দোলন চা-শিল্পের ইতিহাসে শুধু একটি শ্রমিক বিদ্রোহ নয়, বরং উপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে এক বৃহৎ প্রতিরোধের প্রতীক। এই আন্দোলন চা-শ্রমিকদের জীবনে কিছু পরিবর্তন আনলেও তাদের মৌলিক বঞ্চনার প্রশ্ন পুরোপুরি সমাধান হয়নি।


আজও চা-বাগান শ্রমিকরা মজুরি, ভূমির অধিকার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার অভিযোগ তোলেন। প্রতি বছর ২০ মে তারা দিনটি ‘চা-শ্রমিক হত্যা দিবস’ হিসেবে স্মরণ করেন।


চা-শ্রমিক সংগঠন সূত্রে জানা যায়, চা-শ্রমিক দিবস উপলক্ষে আজ বুধবার দেশের বিভিন্ন চা-বাগানে স্থায়ী-অস্থায়ী শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা করছেন চা-শ্রমিকেরা। 


এদিকে বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ফেডারেশন শ্রমিক দিবস উপলক্ষে চা-শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে দৈনিক মজুরি বাড়ানো, স্থায়ী আবাসনের পাশাপাশি চা শ্রমিকদের বংশ পরম্পরায় বসবাস করা ভূমির মালিকানা বা স্থায়ী বন্দোবস্ত প্রদান, শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য বাগানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান ও ২০ মে রাষ্ট্রীয়ভাবে চা-শ্রমিকদের সবেতন ছুটিসহ ‘চা–শ্রমিক অধিকার দিবস’ ঘোষণাসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আসছে।


শেয়ার করুনঃ

ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে আরো পড়ুন

চা-শ্রমিক, মুল্লুকে চলো আন্দোলন, সিলেট চা বাগান, চা শিল্পের ইতিহাস, ব্রিটিশ শাসন চা বাগান

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ